বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের নাম এখনো বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। এই দেশে কেউ নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সংস্কৃতিবান বলে দাবি করতে চাইলে তাঁকে রবীন্দ্রনাথের নাম নিতেই নয়। ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনে তার গান গাইতেই হয়। এমন কি, ক্রমবর্ধমান মাত্রায় মৌলবাদী চরিত্রের শাসন প্রবর্তিত হলেও, পাকিস্তানী আমলের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের আসন আগের তুলনায় শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে জন্যেই ধর্মীয় রাজনীতির কাছে যতোই পণবন্দী হোক, সরকার এখন আর রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারছে না। বরং একজন ফৌজী-রাষ্ট্রপতি সরকারী উদ্যোগে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যারোমিটারের মতো। ঘন অন্ধয়ারে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন যতো জোরদার হয়, তাঁর নামের পারদ ততো ওপরে উঠতে থাকে। আর অনুকূল পরিবেশে দেশের প্রতিবাদী আন্দোলন যতো নিস্তেজ হয়, রবীন্দ্রনাথ ততোই পাঠ্যপুস্তকের দিকে সরে যেতে থাকেন।*
————-
* আমার রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
(স্টেসটম্যান, রবীন্দ্রজয়ন্তী, ২০০৫)
১৯. কেন রবীন্দ্রনাথ?
কোনো দিন আমি ‘কবিগুরু’ অথবা ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ লিখিনি। বলিওনি। যারা লেখেন অথবা বলেন তাদের আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের অতিভক্ত–এমন কি, কাউকে কাউকে মনে হয় রবীন্দ্রপূজারী। আমার ধারণা: এই অতিভক্তির ফলে সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখতে পাইনি অথবা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। মানুষ রবীন্দ্রনাথ—‘যাহারে কাঁপায় স্তুতিনিন্দার জ্বরে’— সেই মানুষ রবীন্দ্রনাথ আমাদের আড়ালে থেকে গেছেন। তাঁর জায়গায় দেখা দিয়েছেন। একজন অতিমানব অথবা উপদেবতা। তাঁর রচনার আমরা তাই কদৰ্থ না-হলেও ভুল অৰ্থ করি। তা ছাড়া, তাঁর সৃষ্টির ওপরে ভিত্তি করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে না-গিয়ে বরং তাকে কেন্দ্র করেই বারবার ঘুরপাক খেতে থাকি। এক কালে কথায় বলতো: কানু ছাড়া গীত নেই। আধুনিক বঙ্গে কৃষ্ণের জায়গা দখল করেছেন রবীন্দ্রনাথ। কখনো কখনো মনে হতে পারে: রবীন্দ্রনাথ ছাড়া গীত নেই।
কালিদাসের কালে তিনি জন্ম নেননি ঠিকই, কিন্তু তিনিও যথেষ্ট পুরোনো! জন্মেছিলেন এখন থেকে প্রায় দেড় শো বছর আগে। তারপর কবে তিনি বিগত হয়ে গেছেন!! বস্তুত, তার ভাষায় এখন নতুন কবি–নতুন কবিরা— আমাদের ঘরে গান করছেন। তারপরও তাকে নিয়ে নাম-কীৰ্তন করার প্রয়োজন আছে কি? ধর্মের বেলায় দেখা যায়: মানুষ একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকে। সেখান থেকে আর সামনে যেতে পারে না। অন্ধবিশ্বাস স্বচ্ছদৃষ্টিকে আবৃত করে। রবীন্দ্রনাথ তেমন একটা অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছেন বলে আশঙ্কা হয়। তা ছাড়া, অনেক সময় মনে হয়: তিনি নতুনদের আগমনের সব পথ রোধ করে আছেন। বাঙালি মুসলমানরা দীর্ঘদিন তাকে “নিজেদের লোক’ বলে গণ্য করতেন না। কিন্তু মুসলমান-প্রধান বাংলাদেশেও রবীন্দ্রচর্চা এখন অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোট কথা, নানা দিক থেকেই মনে হতে পারে: আর কতো রবীন্দ্রনাথ! এখনো কি তিনি প্রাসঙ্গিক?
এক কথায় এর উত্তর বোধ হয় দেওয়া যায় না। মরেই হারিয়ে যান বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু সবাই নন। আকাশে লক্ষ-কোটি তারা দিনের আলোতে হারিয়ে যায়। অপর পক্ষে, আকাশ থেকে সরে গেলেও মেরুমণ্ডলে সূর্য প্রায় সারা রাত আলো দেয়। সে জন্যেই ৬৫ বছর আগে বিদায় নিলেও বাংলার আকাশ থেকে রবির আলো নিভে যায়নি। আমরা এখনো বাস করছি তারই বলয়ে।
এর কারণ দুটি। প্রথমত তাঁর সর্বব্যাপী প্ৰতিভার জন্যে, দ্বিতীয়ত এখন তাঁর অবদান আজও নিঃশেষিত হয়নি বলে। তিনি ছিলেন বিশ্বের এক বিরল প্ৰতিভা। বিশেষ করে বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করলে তার মতো প্ৰতিভা ইতিহাসে নজিরবিহীন। শেক্সপীয়র নাট্যকার এবং কবি ছিলেন, সুরকার ছিলেন না। মোৎসার্ট সুরকার ছিলেন, কিন্তু উপন্যাস লেখেননি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি শিল্পী এবং বিজ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু সুরকার ছিলেন না। নিউটন বিজ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু কবি ছিলেন না। ভ্যান গখ। ছবি এঁকেছেন, কিন্তু গান রচনা করেননি। মনে রাখা দরকার যে, কবি হিশেবে পরিচিত হলেও রবীন্দ্ৰনাথ কেবল কবি ছিলেন না। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন গীতিকার-সুরকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্প-লেখক এবং প্রবন্ধ-লেখক। যদি এখানেই শেষ হতো, তা হলেও তাকে কেবল সাহিত্যিক পরিচয় দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যেতো। কিন্তু তাঁর আরও পরিচয় ছিলো। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, ভাষাতাত্ত্বিক, পর্যটক, অভিনেতা, গায়ক এবং পল্লীপুনর্গঠক। বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্ৰকে তিনি বিচিত্র এবং বর্ণাঢ্য অলঙ্কারে সাজিয়ে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি দিয়ে। কিন্তু তাই বলে তাঁকে পূজো করার কারণ নেই। তিনি ফেরেশতা ছিলেন না–তারও ছিলো অনেক সীমাবদ্ধতা। সবচেয়ে বড়ো কথা, তিনি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি হলেও, আজকের বিশ্বে যে-সব জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার সমাধানের দাওয়াই দিয়ে যেতে পারেননি। ধর্মপ্রচারকদের উপদশেকে চিরকালীন বিবেচনা করা যেমন ভ্ৰান্ত, রবীন্দ্রনাথের বাণী মহান হলেও, মনে রাখা দরকার—তার ওপরও কালের ছাপ রয়েছে।
