মাও সে তুংও ছিলেন একই নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু তার চেয়ে অনেক উৎসাহী এবং কট্টর বিশ্বাসী ছিলেন পল পট। তিনি যতো কম সময়ের মধ্যে যতো বেশি লোক মেরেছিলেন তাতে মানুষ মারার দৌড়ে তিনি স্তালিন এবং মাওকে অনায়াসে হারিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির কাছের এবং সাম্প্রতিক কালের কমিউনিস্টরাও ছোটো ছোটো স্তালিন, মাও, পল পট। এরা কেউ কেউ বেশি সাফল্য লাভ করেছেন। বেশি সাফল্য লাভ করে ইতিহাসে কারো চোখে খ্যাত, কারো চোখে কুখ্যাত হয়েছেন। তার অর্থ বেশি সংখ্যক মানুষের ভালো করতে গিয়ে মার্কসপাহীরা অনেক লোকের ক্ষতি, এমন কি, প্রাণহানি করছেন। নীতিবাদীদের চোখে এটা গ্রহণযোগ্য না-হলেও উপযোগিতাবাদীদের চোখে এটাই করণীয়।
মার্কসবাদীদের মতো হিটলারও এক ধরনের মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনিও তাঁর জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে ষাট লাখ ইহুদী আর জিপসিকে মেরেছিলেন। তুর্কীরা তাদের জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না-খাইয়ে মেরেছিলেন আর্মেনিয়ানদের। নিজেদের জাতীয় স্বার্থে জাপানীরা লাখ লাখ লোককে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন কোরিয়ায়, চীনে, মাথুরিয়ায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। জাপানীরা এখন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন ক্ষমতায় সমগ্র বিশ্বে প্রথম সারিতে আছেন। গণহত্যা এবং নিৰ্যাতনেও তারা নানা বৈচিত্ৰ্য এবং উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়ে প্রথম সারিতে ছিলেন।
পশ্চিমা বিশ্বে ব্যক্তির স্বাৰ্থকে সবচেয়ে মূল্যবান মনে করা হয়। তা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর আণবিক বোমা ফেলতেও দ্বিধাবোধ করেনি। আণবিক বোমার ফলাফল সম্পর্কে ভালো করেই জানতো যুক্তরাষ্ট্র, তবু দ্বিধা করেনি। এমন কি, তিন দশক ধরে নিজেদের মতবাদ এবং স্বার্থের খাতিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে লাখ লাখ লোক মারতে এবং অথবা তাদের ওপর নির্যাতন করতেও কিছুমাত্ৰ পিছুপা হয়নি।
সম্প্রতি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো, ধরা যাক, ইরাকে যে-অভিযান চালিয়েছে তার ফলে হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছেন এবং নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার লোকের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। যে-অত্যাচারের কাহিনী প্ৰকাশিত হওয়ায় বুশের মতো সাম্রাজ্যবাদী মতবাদে বিশ্বাসী লোকও লজ্জিত হয়েছেন। সাদাম হোসেনের একনায়কত্ব থেকে রক্ষা করে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে যো-পন্থা বেছে নেওয়া হয়েছে, তাকে কি সমর্থন করা যায়?
এমনি, আরও একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে। পশ্চিমা দেশে সাম্প্রতিক কালে পশুদের অধিকার নিয়ে অনেক লোক আন্দোলন করছেন। গবেষণাগারে পশুদের ওপর ওষুধ পরীক্ষা করার ফলে পশুদের কষ্ট হয় এবং অনেক পশুর প্রাণ যায়। আন্দোলনকারীরা এই অসহায় পশুদের হয়ে লড়াই করছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটা নৈতিকতার কথা ঠিকই। কিন্তু এর জন্যে তাঁরা অনেক সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছেন। এমন কি, মানুষের প্রাণও নিয়েছেন। পশুদের ক্লেশ নিবারণ করার লক্ষ্য অর্জনের জন্যে তারা যে-সহিংসতার পন্থা বেছে নিয়েছেন, তাকে সমর্থন করা যায় কি?
উপযোগিতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, মার্কসবাদ–সব “বাদের”ই মূল কথা তার লক্ষ্য হাসিল করা, ব্যক্তি অথবা মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা নয়। কেবল তাই নয়, সেই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে যে-কোনো পন্থা অবলম্বনকে এই মতবাদীরা অন্যায় বা অনৈতিক বলে মনে করেন না। কিন্তু এই পন্থার শিকার হন যারা, বলা বাহুল্য, তারা একে মেনে নিতে পারেন না। বরং এর সমালোচনা করেন। তাঁরা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে-সব তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ চলে, তা এক পক্ষের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, বিরোধীদের দৃষ্টিতে তা দুস্কৃতি। ফিলিস্তিনীরা ইসরাইলের দখলদারি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে-বোমাবাজি অথবা হত্যা এবং সন্ত্রাস চালাচ্ছেন, তাকে তারা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ বলে বিবেচনা করেন। এমন কি, অনেকে তাকে ধর্মযুদ্ধ বলেও বিশ্বাস করেন। অনেকে সেই যুদ্ধে স্বেচ্ছায় জীবন দিয়ে ধন্য হতে চান এবং তার মাধ্যমে পুণ্য অর্জন করতে চান। কিন্তু তারা যখন ইসরাইলী সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়া অন্য কিছুর ওপর আক্রমণ করেন অথবা নিরপরাধ লোককে হত্যা করেন, তখন তাকে নীতিবাগীশ বা মানবাধিকারবাদীরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারনে না।
এমন কি, প্ৰায় সব লোকই যাকে মনে করেন। ঐশ্বরিক, পবিত্র এবং অবশ্য পালনীয়, সেই ধর্ম রক্ষার উদ্দেশ্যে অথবা ধর্মের নামে উৎসাহী ধাৰ্মিক কমীরা অধৰ্ম করতে বিবেকের দংশন অনুভব করেন না। যেমন, ধরা যাক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খৃস্টান মৌলবাদীদের একাংশ ধর্মীয় কারণে গর্ভপাতকে এতো অন্যায় বলে মনে করেন যে, গর্ভপাত করান যে-ডাক্তাররা, তাদের কয়েকজনকে তাঁরা খুন করেছেন। বা ধরা যাক, ভারতে রামমন্দির নির্মাণ করার নামে শত শত মুসলমান হত্যা করতে দ্বিধা করেননি হিন্দু ধর্মের উৎসাহী কর্মীরা। সেই রামমন্দিরের শতশত মাইল দূরের বাংলাদেশেও হিন্দুদের মারতে অথবা তাদের নারীদের ধর্ষণ করতে দ্বিধা করেননি কিছু মুসলমান। এ রকমের আর-একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো: ইসলামী জাতীয়তাবাদের নামে উড়োজাহাজ দিয়ে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস করার ঘটনা। নিরপরাধ ও অসহায় যাত্রীদের নিয়ে নিজেরা মরতে অথবা টুইন টাওয়ারের নিরপরাধ হাজার হাজার লোককে মারতে দ্বিধা করেননি আল-কাইদার ইসলামী সন্ত্রাসীরা। কেবল দ্বিধা করেননি বললে মিথ্যে বলা হয়। এঁরা মনে করেন, এটা ধর্মের নামে যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে নিহত হলে তা অতীব পুণ্যের ব্যাপার। এমন পুণ্য যে, মরার পরই সশরীরে স্বৰ্গ এবং স্বর্গের অন্সরা লাভ করবেন তারা।
