খৃষ্টের জন্মের আগেই গ্ৰীক নাট্যকার সোফোক্লিস বলেছিলেন যে, ভালো লক্ষ্য হাসিল করতে গিয়ে অন্যায়ের আশ্রয় নেওয়া অন্যায় নয়। রোম্যান কবি ওভিদও। বলেছিলেন কমবেশি একই কথা। এ রকমের দুজন বিখ্যাত লোক বলা সত্ত্বেও, লক্ষ্য লাভের জন্যে যে-কোনো পন্থার আশ্রয় নেওয়া যুক্তিযুক্ত অথবা নৈতিক–এ কথা অনেকেই মানতে পারেননি। বস্তুত, এ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে। কোন জিনিশটা ভালো, কোন জিনিশটা মন্দ, তার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। যা চোরের কাছে ভালো, সেটা গৃহস্থের কাছে খারাপ। গরু, মরলে শকুনের জন্যে সেটা ভালো হয় বটে, তবে গরু অথবা গরুর মালিকের জন্যে সেটা আদৌ সুখবর নয়। কাজেই কোনটা ভালো, কোনটা ভালো নয়, সেই কটতর্কের মধ্যে না-গিয়েও কেবল লক্ষ্য এবং পন্থা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
বেশির ভাগ ধর্ম এবং নৈতিকতা অনুযায়ী লক্ষ্য ভালো হলেও অন্যায্য পন্থা গ্রহণের নীতিকে সমর্থন করা হয় না। মহাভারতের গল্প দিয়ে এর একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। দ্রোণাচাৰ্যকে সরাতে না-পারলে পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ জয়ের কোনো উপায় ছিলো না। কৃষ্ণ জানতেন, দ্রোণাচার্যকে যদি বলা হয় যে, তাঁর পুত্ৰ অশ্বথামা নিহত হয়েছেন, তা হলে তিনি যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াবেন। কৃষ্ণের বুদ্ধিতে পাণ্ডবরা তাই মিথ্যের আশ্রয় নিয়েই চীৎকার করে বললেন “অশ্বথামা হত”। দ্ৰোণাচার্য বললেন যে, এ কথা তিনি বিশ্বাস করবেন যুধিষ্ঠির বললে। কিন্তু সত্যবাদী যুধিষ্ঠির এই মিথ্যে বলতে রাজি ছিলেন না। তাই অশ্বখামা নামে ইন্দ্ৰবৰ্মার যেহাতিটি ছিলো, সেটি মেরে ফেলা হয়। তখন যুধিষ্ঠির চীৎকার করে বললেন, “অশ্বথামা হত।” তারপর গলা নামিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, “… ইতি গজ।”— পুরো বাক্যটা দাঁড়ালো–অশ্বখামা হত ইতি গজ–অশ্বথামা নামে হাতি নিহত হয়েছে। দ্রোণাচার্য “ইতি গজ” শুনতে পাননি। যাতে শুনতে না-পান, তার জন্যেই যুধিষ্ঠির নিম্নকণ্ঠে ইতি গজ বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি যা বলেছিলেন, তা সত্য; কিন্তু পুরো সত্য নয়। এবং সেই অর্ধসত্য দ্ৰোণাচার্যের মৃত্যুর কারণ হয়। যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্য সফল করার জন্যেই যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে এই অর্ধসত্য বালানো হয়েছিলো। আর, এই অর্ধসত্য বলার জন্যে তাঁকে নরকে থাকতে না-হলেও মৃত্যুর পর নরক দর্শন করতে হয়েছিলো।
এ গল্প থেকে যা বোঝানো হচ্ছে, তা হলো ভালো কাজে সাফল্য লাভ করার জন্যেও খারাপ কাজ করা যাবে না। করলে তার জন্যে শাস্তি হবে। সুতরাং লক্ষ্য যতোই মহৎ হোক না কেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে অন্যায়কে সমর্থন করা যায় না–অন্তত নৈতিকতার বিচারে।
কিন্তু নীতিবাদ যা-ই বলুক না কেন, মতবাদ এবং আদর্শবাদে বিশ্বাসী লোকেরা নীতির কথা মানেন না। তাদের কাছে নীতি অথবা মানুষের চেয়ে মত এবং সে মতের বাস্তবায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কথা হলো: মারি অরি পারি যে কৌশলে! দরকার হলে ছলে, বলে, কলে, কৌশলে, ন্যায্য, অন্যায্য যে-কোনো উপায়ে তারা চান তাদের মতবাদকে বাস্তবায়িত করতে। অনেক দার্শনিকই তাই ভালো উদ্দেশ্যের জন্যে যেটা কম খারাপ সেটাকে গ্ৰহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি। ধরা যাক, সন্ত্রাসবাদীরা একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে একটা নগরীর আকাশে এসেছে। তারা এই বিমানের ধাক্কায় একটা উচু ভবন ধ্বংস করতে চাইছে। বিমানে আছেন শতাধিক যাত্রী। আর উচু ভবনটি ধ্বংস করলে মারা যাবেন হাজার হাজার লোক এবং প্রভূত ক্ষতি হবে ঐ নগরীর। এটা ঠেকানোর একটা উপায় হলো ভবনের ওপর ধাক্কা দেওয়ার আগেই ঐ বিমানটিকে ধ্বংস করা। অনেক দার্শনিকের কাছে এই বিমানটি ধ্বংস করা যুক্তিযুক্ত। কারণ, তার ফলে কম লোকের জীবন হানি হবে। কিন্তু নৈতিকতার দিক দিয়ে এটা কি সমর্থন যোগ্য? নীতিবাগীশদের মতে, এটা অনৈতিক কারণ ঐ শতাধিক নিরপরাধ যাত্রীরও বাঁচার অধিকার আছে। ছিনতাইকারীদের হাতে তারা মারা যেতে পারেন–মারা যাবেন এটা প্ৰায় নিশ্চিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা ভবনে আঘাত করবে। কিনা অথবা আঘাত করতে পারবে কিনা, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন কি, আঘাত করলেও কোনো অলৌকিক কারণে কোনো কোনো যাত্রী হয়তো বেঁচেও যেতে পারেন। সুতরাং বাস্তবের যুক্তিতে যাই হোক, অন্তত তত্ত্বের যুক্তিতে বিমানটি ধ্বংস করা অনৈতিক ব্যাপার।
অপর পক্ষে, উপযোগিতাবাদে বিশ্বাসী দার্শনিকরা এই নৈতিকতাকে অস্বীকার করেন। তাদের মতে, সমষ্টির স্বার্থে ব্যক্তিকে বিসর্জন দেওয়া অন্যায় নয়। বেশি। মানুষের কল্যাণের জন্যে অল্প সংখ্যক মানুষের অমঙ্গল হলেও তাদের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য। ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিকরা মনে করেছিলেন যে, বৃহত্তর জনগণের উপকারের জন্যে কিছু লোকের রক্তপাত ঘটানো কিছু অন্যায় নয়। ফরাসি বিপ্লব কেন, সব বিপ্লবের পেছনেই কাজ করে এই আদর্শ, এই যুক্তি। এমন কি, ধর্মযুদ্ধ অথবা ধর্মীয় বিপ্লবের পেছনেও।
কার্ল মার্কস ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে। কেবল ব্যাখ্যা নয়, তিনি ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ তৈরি হবে। তাঁর বিশ্লেষণ মেনে নিয়ে বামপন্থী রাজনীতির সূত্রপাত। সেই রাজনীতিতে প্রথম সফলতা আসে রাশিয়ায়। বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট শাসন-ব্যবস্থা। তারপর সেই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে এবং তাকে সম্প্রসারিত করে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে চলতে থাকে। এই নীতির প্রয়োগ। সে নীতির সামনে ব্যক্তি অথবা ব্যক্তির স্বাৰ্থ বিবেচনার যোগ্য নয়। সমষ্টিই একমাত্র বিবেচ্য। তা ছাড়া, সব ক্ষমতারই ভেতরেই থাকে বিকৃতির বীজ। যে-ক্ষমতা যতো নিরঙ্কুশ সেই ক্ষমতা ততো প্রবলভাবে বিকার লাভ করে। সেই বিকৃতি ক্যান্সারের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ক্ষমতার প্রতিটি কোষে। স্তালিন অংশত নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার লোভে, অংশত দল ও কমিউনিজমের শ্ৰীবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণ নিয়েছিলেন। একমাত্র ইউক্রেনেই ১৯২৯-৩০ সালে পনেরো লাখ লোককে নাখাইয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। সাইবেরিয়ার শ্রম-শিবিরে পাঠিয়ে ছিলেন। লাখ লাখ লোক। কিন্তু তাতে স্তালিন অথবা কমিউনিস্ট কর্মীরা কিছুমাত্র বিবেকের দংশন অনুভব করেননি। কারণ, কোটি কোটি প্লোলেটারিয়েটের রাজত্ব স্থাপনই তাদের লক্ষ্য ছিলো। তাদের মতে, তার জন্যে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানিও যুক্তিযুক্ত।
