একাত্তর সালে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ওপর যেপাশবিক অত্যাচার করেছিলো, তার পেছনে কেবল জাতীয়তাবাদ কাজ করেনি। ধর্মীয় উৎসাহও সেই জাতীয়তাবাদী ধারণাকে উস্কে দিয়েছিলো। সেই ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ছিলো বলেই পাকিস্তানের বর্বর সৈন্যরা বিনা দ্বিধায় লাখ লাখ নারীর সতীত্ব হানি করতে পেরেছিলো। অমন লুটপাট করতে পেরেছিলো। এই সৈন্যদের স্থানীয় দালালরাও এই ধর্মীয় জোশে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলো। সৈন্য এবং তাদের দোসররা যে বাড়াবাড়ি করেছিলো, তার অনেকটাই করেছিলো ধর্ম রক্ষা এবং বিধমী বিনাশের মাধ্যমে পুণ্য লাভের প্রেরণা থেকে। সেই মিথ্যে পুণ্যের ধারণা তাদের বিবেক এবং বিবেচনাকে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দিয়েছিলো।
বস্তুত, ধর্মের নামে ধর্মান্ধরা যা করে, বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তা সত্যি সত্যি ধর্মের জন্যে নয়; বরং করে ধর্মের নামে ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি লাভের উদ্দেশে। মার্কিন, জার্মান, ব্রিটিশ, ফরাসি অথবা জাপানী সাম্রাজ্যবাদ। যেমন মানুষের মৌল অধিকার হরণ করেছে অথবা এখনো করছে, তেমনি ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদও একই রকমে মনুষ্যত্ব এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের মতো যুগে যুগে বৌদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ, হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ, খৃষ্টান সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসলামী সাম্রাজ্যবাদও অসংখ্য মানুষের রক্তে রাঙা হয়েছে। তবে বৌদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ এবং হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ ইতিহাসে পরিণত হলেও খৃষ্ট এবং ইসলামী সাম্রাজ্যবাদ এখনো প্রবল স্রোতে বহমান। বিশেষ করে পেট্রোডলারের জোরে এবং মধ্যপ্রাচ্যে হতাশাজনক ইহুদী আধিপত্য থাকার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী সাম্রাজ্যবাদের নামে সহিংসতার একটা প্ৰবল ধারা গোটা মানবতাকেই হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের সমান্তরালভাবে আর-একটি স্রোতও বহমান বিভিন্ন জায়গায়। সেটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করে না; বরং সক্রিয় থাকে দেশের মধ্যেই। কিন্তু এই মতবাদও মানবাধিকার খর্ব করে। মানুষের মুক্ত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে। এমন কি, এর নামে সংখ্যালঘু জনগণ এবং মুক্তবুদ্ধিতে বিশ্বাসী উদারনৈতিক লোকেদের ওপরও অবাধে অত্যাচার চালানো হয়। এর সঙ্গে নীতিবোধের কোনো যোগ থাকে না। বরং ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই মতবাদে বিশ্বাসীরা লাভবান হতে চান। এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে অধর্মের পন্থা অনুসরণ করতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করেন না। ইহুদী র্যাবাইরা, এভানজ্যালিক্যাল খৃস্টানরা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যরা, আল কাইদা এবং তালেবান সদস্য–সব শিয়ালের একই রী। সবাই মনে করেন, ধর্মের লক্ষ্য হাসিল করতে অধর্মের পন্থা অবলম্বন করলে সেটা অন্যায় নয়। এই বিবেকবর্জিত ধারণা সৃষ্টি হওয়ার ফলে গোটা মানবতাই আজ হুমকির সম্মুখীন। আজ তাই নতুন করে ভাবা দরকার লক্ষ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, না। পন্থা।
(যুগান্তর, ডিসেম্বর ২০০৬)
১৭. আধুনিকতা
চল্লিশোত্তীর্ণ খালাম্মাকে দেখলেন হাল ফ্যাশানের শাড়ি-ব্লাউজ পরা / চোখে সান-গ্লাস / শরীরের কোনো কোনো অংশ একটু বেশি বের-করা / উঁচু হিল-ওয়ালা জুতো পরে খট খট করে করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলেন। আপনার বন্ধুরা তাকে বলতে পারেন— “আধুনিকা।” বলতে পারেন তাঁর সহকর্মীরাও। এমন কি, আড়ালে আপনিও তাদের দলে যোগ দিতে পারেন। খালাম্মার চেয়ে কম বয়সী, ধরা যাক, মধ্য-তিরিশের কোনো মহিলাকেও একটু সাহসী পোশাক পরলে আধুনিকা বলে আপনি হয়তো টিটকারি দিতে পারেন। মোট কথা, নতুন ঢঙের পোশাক পরতে দেখলে, অথবা সবাই সাধারণত যা করে না, তেমন কিছু করতে দেখলে আমরা তাকে অনেক সময় বলি “অমুক আধুনিক, মডার্ন।” বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এ বিশেষণটা বোধ হয় আরও বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু এ হলো আধুনিক কথাটার অপব্যবহার।
তা হলে আধুনিক মানে কী? আধুনিক মানে কি কেবল সাম্প্রতিক? বৰ্তমানে যা ঘটছে, সেটাই কি আধুনিক? ধরা যাক, হাল ফ্যাশানের বোরকা পরলে, অথবা নতুন ডিজাইনের পাগড়ি কিংবা রামাবলী পরলে তাঁকে কি আপনি বলবেন আধুনিক? ধরে নিচ্ছি, বলবেন না। কারণ, নতুন ফ্যাশানের পোশাক পরলেও এই ব্যক্তির যেমনটি প্রকাশ পাচ্ছে, সে মনটি রীতিমতো প্রাচীনপন্থী, রক্ষণশীল। বস্তুত, বাজারে এক-একটা সময়ে নতুন ফ্যাশানের হুজুগ দেখা দেয়। মার্কেট ফোর্স কাজ করে তার পেছনে। কিন্তু সেটা আধুনিকতা নয়। কোনো উপকরণ ব্যবহার করে কেউ আধুনিক হতে পারে না। অথবা আধুনিক কালে কারো জন্ম হলেও সে আধুনিক মানুষ, তা প্রমাণিত হয় না।
জসীমউদ্দীনের জন্ম জীবনানন্দের চেয়ে কয়েক বছর পরে। অর্থাৎ জন্মতারিখের নিরিখে জীবনানন্দের তুলনায় জসীমউদ্দীন আধুনিক। কিন্তু এটা কেউ স্বীকার করে না। জীবনানন্দ কেবল তাঁর জীবদ্দশায় আধুনিক বলে বিবেচিত হননি। আজও তিনি আধুনিক। অপর পক্ষে, জসীমউদ্দীন সেই যে খেতাব পেলেন পল্লীকবির, এখনো তা ঘুচে যায়নি। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষা-ছন্দ-চিত্ৰকল্পসহ তাঁর কবিতার আঙ্গিক, সর্বোপরি, তাঁর রস ও রুচি তিনি নিয়েছিলেন পলী বাংলা থেকে। সে কারণে আধুনিক কবি জীবনানন্দের তুলনায় পাঁচ বছর পরে জন্ম নিলেও তিনি আধুনিক উপাধি পেলেন না।
