ইসলাম ধর্মের সঙ্গে তুলনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, খৃস্টধর্ম প্রসার লাভ করে তুলনামূলকভাবে আধুনিক কালে। পীর-দরবেশরা নানা দেশে গিয়ে ধর্মপ্রচার করে পুণ্য লাভ করতে চেষ্টা করেছেন। সেসব দেশে ইসলামী রাজত্ব স্থাপনের জন্যে তারা অপেক্ষা করেননি। অপর পক্ষে, ইউরোপীয় খৃষ্টান মিশনারিরা নানা দেশে গেছেন। প্রধানত সেসব দেশে সামরিক বিজয়ের পর। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ইত্যাদি ইউরোপীয় দেশ উপনিবেশন স্থাপনের কাজ শুরু করার পর মিশনারিরা যান এসব দেশে ধর্ম প্রচার করতে। ভারতবর্ষে যেমন পর্তুগীজ ব্যবসায়ীদের পেছনে পেছনে আসেন জেসুইট মিশনারিরা। ইংরেজদের পেছনে আসেন অ্যাংলিকান, ব্যাপটিস্ট, রোম্যান ক্যাথলিক এবং স্কটিশ মিশনারিরা। মিশনারিদের অত্যুৎসাহী প্রচারের মাধ্যমে খৃস্টধর্ম আফ্রিকা, এশিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ অ্যামেরিকায় দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বস্তুত, খৃস্টধর্মের আক্রমণে বহু জায়গায় সেখানকার আদি ধর্ম পুরোপুরি লোপ পায়। আধুনিক আফ্রিকায় যেমন প্রাচীন ধর্মগুলোর জায়গা দখল করেছে। খৃষ্ট আর ইসলাম ধর্ম।
পৃথিবীতে খৃষ্ট ধর্ম এখন সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। সে তুলনায় ইসলাম ধর্ম কেবল দ্বিতীয় নয়, অনেকটা পেছনে থেকে দ্বিতীয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যে-শক্তির যোগাযোগ কল্পনা করা হয়, খৃষ্ট ধর্মের তুলনায় ইসলামে তা অনেক বেশি। কারণ, খৃস্টানদের বিশ্বাস ধর্ম এবং রাষ্ট্র আলাদা। অপর পক্ষে, ইসলামের মতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত আছে ঈশ্বরে। আবুল মওদুদী পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রের তুলনা করে বলেছেন যে, পশ্চিমা গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে মানুষের হাতে, কিন্তু ইসলামী বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আছে ঈশ্বরের হাতে। মানুষ হলো ঈশ্বরের প্রতিনিধি। পশ্চিমা গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন করে মানুষ, কিন্তু ইসলামে আইন হলো রসুলের মাধ্যমে পাওয়া আল্লাহর বিধান।
বিশ্বের তাবৎ মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিয়ে সবাইকে আল্লাহর আইনের অধীনে আনার কাজকে মনে করা হয় পবিত্র দায়িত্ব হিশেবে এবং সে কারণে জেহাদ ইসলামের একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ইসলামের লক্ষ্য হলো চূড়ান্ত শান্তি স্থাপন করা–দরকার হলে তার জন্যে রক্তপাতও অবৈধ নয়। কমিউনিজমকে ইসলাম অত্যন্ত ঘূণা করে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কমিউনিজমের সঙ্গে ইসলামের এখানে একটা মিল রয়েছে। কমিউনিজম এবং ইসলাম উভয়ই বলে যে, পরিশেষে সর্বাঙ্গীণ শান্তি আসবে এবং তার জন্যে অশান্তির অর্থাৎ যুদ্ধের / বিপ্লবের আশ্রয় নিতে হতে পারে।
এই যে-ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের নীতি, মনে করার কারণ নেই যে, এখন তা কেবল মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বস্তুত, কমবেশি সব ধর্মের মধ্যেই তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমন কি, হিন্দুদের মধ্যেও গত দু দশকে একটা জঙ্গীবাদী এবং প্রসারণবাদী মনোভাব দেখা দিয়েছে। ভারতে বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা শিবসেনার শ্ৰীবৃদ্ধি থেকে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়। তেমনি পুনরুত্থান লক্ষ্য করা যায় খৃস্টানদের মধ্যে। গত কয়েক দশক ধরে অত্যুৎসাহী মার্কিন খৃস্টানরা রাজনীতিতে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ করে আছেন এভ্যানজেলিকাল এবং নব্যরক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো। মার্কিন সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব এভ্যানজেলিকাল অ্যালায়েন্সও গঠিত হয়েছে। এই এভ্যানজেলিকাল খৃষ্টানরা ধর্ম প্রচারের ছদ্মবেশে সম্প্রসারণ ও আধিপত্যবাদ প্রচার করছেন। এ ছাড়া, এঁরা দেশপ্রেমকেও ধর্মের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। তবে তাঁরা নতুন নতুন পরিভাষার ছদ্মবেশে নিজেদের আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখতে চেষ্টা করেন। চেষ্টা করেন তাদের মতবাদের একটা মননশীল এবং গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে।
খৃষ্টীয় এবং ইসলামী সাম্রাজ্যবাদ বস্তুত বিশ্বব্যাপী এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে এসেছে গোড়া থেকেই। সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্যে সম্রাটরা যেমন ন্যায়-অন্যায় সব রকমের পন্থা নেন, ধর্মীয় সাম্রাজ্য বিস্তারেও তেমনি সব রকমের পন্থা নেওয়া হয়। তার জন্যে দরকার হলে রক্তপাতেও আপত্তি নেই। কারণ ধর্মীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে পরিণামে মানুষের কল্যাণ হবে–এই যুক্তিতে ধর্মীয় নেতারা যেকোনো পন্থাকে ন্যায্য বলে বিবেচনা করেন।
এই ধর্মীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের পরস্পরবিরোধী স্বাৰ্থ থেকেই মধ্যযুগে খৃস্টান এবং মুসলমানদের ধর্মযুদ্ধ হয়েছে। এমন কি, ইদানীং কালে দেশের সীমানাকে অতিক্রম করে ধর্মকে আন্তর্জাতিক সীমানায় নিয়ে যাওয়ার বিশ্বাস এবং বাসনা–খৃষ্ট এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের ধর্মের দিকে টানার বাসনাও এদের মধ্যে প্রবল। প্যান ইসলামী চেতনার কথা অনেক আগে থেকেই চালু আছে, কিন্তু প্যান খৃষ্টীয় চেতনার কথা চালু না-থাকলেও আসলে প্রবল স্রোতে এ চেতনাও বহমান। বিশেষ করে সপ্তদশ / অষ্টাদশ শতাব্দীতে উপনিবেশ স্থাপনের সময় থেকে। যেখানে যেখানে ইংরেজ, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং জার্মান উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছে, খৃস্টান মিশনারিরাও সেসব জায়গায় গেছেন এবং ধর্ম প্রচার করেছেন। এভাবে আফ্রিকায় যেসব ধর্ম প্রচলিত ছিলো ইসলাম এবং খৃষ্ট ধর্মের আগ্রাসনের ফলে সেসব ধর্ম প্রায় লোপ পেয়েছে।
