পশ্চিমা দেশগুলো প্ৰযুক্তি এবং বিজ্ঞানের দিক দিয়ে উন্নত হলেও, পেট্রোল ছাড়া তারা আচল। সুতরাং তারা মধ্যপ্রাচ্যের এই অনুন্নত দেশগুলোকে হাতে রাখার জন্যে নানা রকমের উপায় অবলম্বন করতে আরম্ভ করলো। তারা বাড়িয়ে দিলো আপাতদ্বন্ধুত্বের হাত। যেমন, সৌদী আরব হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ মিত্র। তবে লিবিয়া, ইরাক অথবা ইরানের মতো কোনো দেশ অবাধ্য হলে তাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বাগে আনার জন্যেও ব্যবস্থা গ্ৰহণ করলো পশ্চিমা দেশগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এবং বিশেষ করে ব্রিটেনের সহযোগিতায় যে-ইরাক অভিযান চালানো হয়, তার পেছনে কেবল মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্দেশ্য ছিলো। না। ছিলো পেট্রোল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতিও।
কারো হাতে টাকা এলে সে যেমন ধীরে ধীরে প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আর্থিক অবস্থা রাতারাতি উন্নত হওয়ায় তারাও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে প্রভাবশালী হতে চেষ্টা করলো–শিক্ষা-সহ বহু ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও। তবে জাতিসঙ্ঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ তারা নিতে পারলো না। অথবা পশ্চিমা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তারা পারলো না কোনো ছাপ ফেলতে। এই হতাশা থেকেই তখন তারা মুসলমান-প্রধান দেশগুলোর দিকে হাত বাড়ালো। এভাবে একাধিক সংস্থা গড়ে উঠলো ইসলামী দেশগুলোর। আর এসব সংস্থার নেতা হলো তেলের টাকা যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি ছিলো, সেই দেশগুলো। তেল ছাড়া, আরও একটা অস্ত্র তাদের হাতে ছিলো, সেটা ইসলাম ধর্মের নাম। তেলের জন্যে পুঁজি লাগে, তেল উত্তোলনের জন্যে লাগে প্ৰযুক্তি এবং পরিশ্রম। অপর পক্ষে, বিনা পুঁজিতে রবারবা ব্যবসা করা যায় ধর্মের নাম দিয়ে। কারণ, ধাৰ্মিক হলে যে-পুরস্কার পাওয়া যাবে, সেটা অবিলম্বে অথবা নগদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতের জন্যে ফেলে রাখা যায়। এবং স্বৰ্গ এবং স্বৰ্গীয় অন্সরা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি ঠিক মতো পালন করা হলো কিনা, তাও যাচাই করে দেখার কোনো উপায় থাকে না।
মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মের এই এন্তার পুঁজি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করার সুযোগ পেলো সৌদী আরব। কারণ ইসলাম ধর্মের সূত্রপাত সেখান থেকে এবং মুসলমানদের পবিত্র তীর্থ মক্কা-মদিনাও সেখানে। সৌদী আরবকেই গোটা বিশ্বে দেখা হয় ইসলাম ধর্মের রক্ষক হিশেবে। এভাবে নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হলো: যাকে বলতে পারি ইসলামের ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ। এই বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ নেতা সৌদী আরব হলেও, ইরান, ইরাক, কাতার, লিবিয়া ইত্যাদি দেশও দ্বিতীয় সারির নেতা হলো। এদের বিশাল পুঁজি থেকে ছিটে-ফোঁটা দিয়ে এরা দরিদ্র দেশগুলোতে তেল যতোটা পাঠালো, তার থেকে বেশি পাঠালো ধৰ্ম প্রচারক দল। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যে-ইসলাম দরিদ্র দেশগুলোতে মধ্যযুগে প্রচলিত হয়েছিলো, তা ধ্বংস করে এরা পুরোনো ইসলাম প্রচারের ব্যবস্থা করলো। এভাবে সামান্য মূলধন দিয়েই ইসলামী সাম্রাজ্যবাদ ছড়িয়ে পড়লো ইন্দোনেশিয়া থেকে মরোক্কো পর্যন্ত। এমন কি, তার বাইরে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এতে অনুকুল হাওয়া দিয়েছিলো। বিশেষ করে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনীদের সমস্যা এতে ইন্ধন জোগায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ইসরাইল যে-দখলদারি এবং ভয়ঙ্কর রাষ্ট্ৰীয় সন্ত্রাস চালাতে থাকে তা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে। আফগানিস্তান এবং ইরাকের সমস্যাও তাতে সহায়তা দেয়। এই মুসলমানী জাতীয়তাবাদ দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ইসলামী ভ্ৰাতৃত্বের জন্ম দেয়। বস্তুত, এভাবে একটা প্রবল ইসলামী জাতীয়তাবোধ দানা নাবাধলে মৌলবাদী ইসলাম অথবা আল কাইদার জঙ্গীবাদ অতো দ্রুত অথবা অমন ব্যাপক সমর্থন লাভ করতো না।
ধর্মের নামে এই যে ভূখণ্ড জয় করা এবং সেখানে ধর্মের বাণী পৌঁছে দেওয়াএটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রাচীন কাল থেকেই ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ গড়ে উঠেছিলো। বেদের বাণী নিয়ে আর্যরা এসেছিলেন ভারতবর্ষে খৃষ্টর জন্মেরও অনেক আগে। অনার্যদের কেবল পরাজিত নয়, প্রায় বিনাশ করেছিলেন তারা। গৌতম বুদ্ধ তাঁর ধর্ম প্রচারের পর সে ধর্মও ভারতবর্ষের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছিলো নানা দিকে। বিশেষ করে সম্রাট অশোক রক্তস্রোত বইয়ে দিয়ে নিজের আসন পোক্ত করার পর বৌদ্ধধর্ম প্রসারের জন্যে প্রচারক পাঠিয়েছিলেন উত্তরে, দক্ষিণে, পুবে, পশ্চিমে। ফলে ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্ম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত পেঁৗছে গিয়েছিলো। আর পশ্চিমে আফগানিস্তান পর্যন্ত এ ধর্মের রীতিমতো শ্ৰীবৃদ্ধি হয়েছিলো। এমন কি, তারও পশ্চিমে।
ইসলাম ধর্ম সম্পর্কেও এ কথা বলা যায়। এই ধর্মের প্রবর্তক কেবল শান্তির ধর্ম প্রচার করেননি, সেই সঙ্গে তাঁর ধর্মের বাণী পার্শ্ববতী দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন, অনেক সময় তরবারি দিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর তিরিশ বছরের মধ্যে সিরিয়া, লেবানন, পারস্য, জর্দান, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকা ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। আরও পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেন হয়ে ইউরোপে প্ৰবেশ করে। এর পর ইসলাম প্রচারিত হয় ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষেরও পুবে। এভাবে যে-ইসলামী বিশ্ব গঠিত হয়, বিস্তৃতির দিক দিয়ে একমাত্র খৃস্টান বিশ্বের সঙ্গেই তার তুলনা চলে।
