ধর্ম প্রচারে খৃস্টান এবং মুসলমানরা সাম্প্রতিক কালে কিছু ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। খৃস্টানরা পরকালের লোভ দেখানো ছাড়াও, অর্থবল ব্যবহার করেছেন ব্যাপকভাবে। দরিদ্রদের খাদ্য, শিক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বিশেষভাবে আফ্রিকা এবং এশিয়ায় তাঁরা ধর্ম প্রচার করতে চেষ্টা করেছেন। অপর পক্ষে, অতি সাম্প্রতিক কালে মুসলমানরা প্রধানত পরকালের ভয় এবং লোভ দেখিয়েই ধর্ম প্রচার করেন। স্বর্গের সুখ এবং নরকের যন্ত্রণা ইসলাম ধর্মে যেমন অতি উজ্জ্বলভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, খৃস্টধর্মে তেমনভাবে করা হয়নি।
ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের প্রতিপত্তি বিস্তারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছেন। এটা তারা করেন প্রধানত দুভাবে–প্রচারে এবং সন্ত্রাসে। প্রচারের ক্ষেত্রে খৃষ্টানরাই প্রযুক্তিগত জ্ঞানের কারণে এগিয়ে আছেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এভ্যানজেলিক্যাল খৃস্টানরা প্রচারের কাজে অডিও-ভিজুয়াল প্রযুক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার করেন। কিন্তু মুসলমানরাও খুব পিছিয়ে নেই। তাঁরা টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং পত্রপত্রিকা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। প্রচার ছাড়া, নিজেদের মতবাদ বিস্তারের জন্যে উগ্ৰবাদী খৃস্টান এবং জঙ্গী মুসলমানরা ব্যবহার করেন মারণাস্ত্ৰ। উগ্ৰবাদী খৃস্টানরা কোথাও কোথাও হত্যা এবং সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছেন–যেমন, গর্ভপাতবিরোধী গোষ্ঠী। কিন্তু এ ব্যাপারে জঙ্গী জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা অনেক এগিয়ে আছেন। তাঁরা সন্ত্রাসের কাজে অত্যাধুনিক বিস্ফোরক এবং স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্ৰ–সবই ব্যবহার করছেন। উড়ো জাহাজ দিয়ে টুইন টাওয়ারের মতো বিশাল ভবন ধ্বংস করার দৃষ্টান্তও তাঁরা স্থাপন করেছেন। এমন কি, এই সন্ত্রাসীরা নিম্নশ্রেণীর পারমাণবিক বোমাও জোগাড় করার চেষ্টা করছেন বলে মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। তালিবানদের মতো তারা আফিমের টাকা দিয়েও এসব মারণাস্ত্ৰ সংগ্রহে দ্বিধা করেন না। কারণ, তারা মনে করেন যে, তাদের মহৎ উদ্দেশ্য সফল করার জন্যে তারা অন্যায় পন্থা বেছে নিলেও সেটা অন্যায় নয়।
বস্তুত, খারাপ লোকেদের হাতে পড়লে ধর্ম মারাত্মক অন্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। কারণ অত্যুৎসাহী ধর্মকরা ধর্মকে ব্যবহার করে ঐশী শক্তির নামে। কিন্তু এর ফলে এ থেকে দেখা দিতে পারে সহিংসতা এবং ধর্মািন্ধতা। আজকের অ্যামেরিকায় তাই ঘটছে। বুশের সমর্থন নিয়ে অ্যামেরিকার মুক্ত এবং কল্যাণধৰ্মী চিন্তাধারা বিপন্ন হচ্ছে। ডানপন্থীরা চেষ্টা করছে ক্ষমতায় এসে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের। তার জন্যে হাজার-হাজার নিরীহ লোকের প্রাণহানিতেও তাদের অনীহা নেই। এই ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকারও খর্ব করার চেষ্টা হচ্ছে। যেমন, আয়কর কমিয়ে ধনীদের আরও ধনী করছে বুশ-প্ৰশাসন। কিন্তু তার ফলে ব্যয় কমাতে হচ্ছে কল্যাণমূলক কাজের। এভাবে দরিদ্রদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন গণতন্ত্র এখন বস্তুত ধনীরা আত্মসাৎ করেছে। ন্যায়নীতি এবং সাম্যের বদলে পুঁজিবাদী চিন্তাধারাই পরিপুষ্টি লাভ করছে এবং এতে ধর্মের নাম পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইসলাম এবং নব্য-হিন্দুত্বের আক্রমণে দক্ষিণ এশিয়ায়ও যুক্তিবাদ, উদারতা এবং মুক্তচিন্তাকে দারুণ বিপন্ন হতে দেখি। বিশেষ করে হতাশ হতে হয় যখন দেখি পেট্রোডলারের ছড়াছড়ি হলেও দরিদ্রদের অবস্থা উন্নতিতে কোনো প্ৰয়াস নেই; আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের কোনো উদ্যোগ নেই; কিন্তু আছে এন্তার মাদরাসা স্থাপনের কার্যক্রম। এসব মাদরাসা আসলে বিনা পয়সায় প্রাচীনপন্থী শিক্ষা দিয়ে অগ্রযাত্রার পথ চিরতরে রুদ্ধ করার সংগঠিত এবং সুকল্পিত প্ৰয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। একটা প্রজন্মকে উন্নতির পথ থেকে সরিয়ে রাখার এই প্ৰযত্নকে প্রশংসা করা যায় না। সেই সঙ্গে সমগ্ৰ দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় প্রতিপত্তির নামে মানুষে মানুষে ঘূণা এবং অবিশ্বাসকে যেভাবে পদ্ধতিগতভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, তাতে যে-কোনো উদারপন্থী লোক বিচলিত হবেন। মোট কথা, সাম্রাজ্যবাদ–তা সে যে-নামেই প্রসার লাভ করুক না কেন–তাকে মানবতা এবং প্রগতির পরিপন্থী বলেই বিবেচনা করতে হয়।
(যুগান্তর, ২০০৬)
১৪. ধর্ম ও আধুনিকতা
সব আইনের মধ্যেই সময়ের একটা ছাপ থাকে। কারণ, একটা আইন তৈরি হয় একটা বিশেষ সময়ে, বিশেষ পরিবেশে, বিশেষ প্রয়োজনের খাতিরে। তারপর সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনের যদি সংশোধন না-হয়, তা হলে সে আইনে সময়ের মড়চে ধরে। জীবন থেকে তা পিছিয়ে পড়ে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা প্রয়োজন মেটায় না এবং তা মেনে চলাও শক্ত হয়। এমন কি, তা মেনে চললে উন্নতির পথে সেটা বাধা হয়ে দেখা দেয়। এক সময়ে দেশ চলতো রাজার ইচ্ছেয়। তিনি ইচ্ছে করলেই কাউকে শূলে চড়াতে পারতেন। কিন্তু এখন দেশ চলে বেশির ভাগ মানুষের ইচ্ছেয়। বিচার চলে আদালতে–বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী। সত্যযুগের আইন দিয়ে এখন আর কলি কালের পৃথিবী চলতে পারে না।
আনুষ্ঠানিক ধর্ম হচ্ছে কতোগুলো আইনের একটা সংগ্ৰহ। সে আইন বিধাতা প্রণয়ন করেছেন, নাকি মানুষ–এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হতে পারে। সে বিতর্কের কোনো মীমাংসাও না-হতে পারে। কিন্তু সে আইন যে একটা বিশেষ সময়ে প্রণীত–এটা ঐতিহাসিক সত্য এবং এর মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই। আর-একটা সত্য হলো, ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে আর যুগে যুগে মানুষ যেভাবে ধর্ম পালন করে, তা হুবহু এক রকম নয়। তত্ত্ব এবং বাস্তবে পার্থক্য তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তত্ত্ব এবং বাস্তবের এই দূরত্ব বাড়তে থাকে। তখন সমাজ ধর্মের খানিকটা সংস্কার করে নেয়। যেমন, ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী চারটে পর্যন্ত বিয়ে করার বিধান আছে। কিন্তু ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে যে-পারিবারিক আইন প্রণীত হয়, তাতে একাধিক বিয়ে করার ব্যবস্থাটা নিরুৎসাহিত হয়েছে। বিশেষ অবস্থায় প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই এখন দ্বিতীয় বার বিয়ে করা যায়।
