(যুগান্তর, ২০০৬)
১৩. ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ
সাম্রাজ্য বললেই মনে হয়। একজন প্রতাপশালী সম্রাট এবং তাঁর শাসনভুক্ত একটা বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের কথা। যেমন, সম্রাট অশোক–যার সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিলো হিমালয় থেকে সিংহল পর্যন্ত। যেমন, আলেক্সান্ডার–যার সাম্রাজ্য ছিলো আরও বড়ো–পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আরম্ভ করে ভারতবর্ষ পর্যন্ত। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটেন, স্পেন এবং ফ্রান্সও উপনিবেশ স্থাপন করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলে ছিলো। ইংরেজ সাম্রাজ্য ছিলো এতোই বিস্তীর্ণ যে, সেখানে নাকি সূর্যস্ত হতো না কখনো। এই সাম্রাজ্য বিস্তারের আদর্শ বা মতবাদকে বলে: সাম্রাজ্যবাদ। সাম্প্রতিক কালে দেশ জয় করে সাম্রাজ্য স্থাপন করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাই বলে সাম্রাজ্যবাদ লোপ পায়নি। বরং তা দেখা দিয়েছে ভিন্ন পোশাকে।
এই নব্য-সাম্রাজ্যবাদের দু-একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। প্রথম মহাযুদ্ধের পর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন স্থাপিত হয়। তারপর যে-বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়, তাকে বলা যেতে পারে একটি কমিউনিষ্ট সাম্রাজ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেই এই সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিলো সমগ্র পূর্ব ইউরোপে। এমন কি, খানিকটা ভিন্ন চেহারায় চীনেও। অ্যামেরিকার কোনো কোনো অঞ্চলেও। কমিউনিস্ট দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সম্পর্ক গঠিত হয়। স্থাপিত হয় সামরিক জোেটও। কমিউনিষ্ট মতাদর্শের নামে অন্য অনেক দেশকেও নিজেদের কোলে টেনে নিতে চেষ্টা করে এই সাম্রাজ্য। তার জন্যে প্রয়োজনবোধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করেনি। এই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্যেই তৈরি করেছিলো ছোটো-বড়ো হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা।
উল্টো দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিশাল পুঁজিবাদী সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য দিয়ে এবং কখনো কখনো তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে তাদের নিজেদের দলে রাখে। ইউরোপীয় দেশগুলোর যেসব উপনিবেশ ছিলো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে সেসবকে স্বাধীনতা দিতে তারা বাধ্য হলো ঠিকই, কিন্তু তারপরও নানাভাবে তাদের ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখলো। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ। সামরিক যোগাযোগও। এই যোগাযোগকে জোরদার করার জন্যে তারা গড়ে তোলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। যেমন কমনওয়েলথ, যেমন নেটো। এই সাম্রাজ্যের কয়েকটি রাষ্ট্রই লক্ষকোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি করে পারমাণবিক মারণাস্ত্ৰ।
১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় কমিউনিষ্ট সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। অর্থনৈতিক শক্তি হিশেবে রাশিয়ার যে-পরিচয় ছিলো, তাও ঘুচে যায় পুরোপুরি। অবশিষ্ট থাকে কেবল কয়েক হাজার পারমাণবিক বোমা। নতুন পরিপ্রেক্ষিতে পরাশক্তিদের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই টিকে থাকলো একমাত্র পরাশক্তি হিশেবে। এই অবস্থায় জর্জ বুশ (সিনিয়র) নতুন বিশ্ব বিন্যাসের ঘোষণা দেন। এই নতুন ওয়ার্ল্ড অডার আসলে খাটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
এভাবে এ শতাব্দীতে একটি কমিউনিস্ট এবং একটি পুঁজিবাদী সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়। কিন্তু তার বাইরে নতুন আর-একটি সাম্রাজ্যও জোরালো হয়ে ওঠে যার ভিত্তি অর্থনীতি নয়, এমন কি, আপাতদৃষ্টিতে ইহলৌকিকতাও নয়। এর ভিত্তি হলো ধর্ম। ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ কিছু নতুন নয়। অতীত কাল থেকেই প্রধান ধর্মগুলোকে কেন্দ্ৰ করে তা গড়ে ওঠে, যদিও রেনেসন্স-পরবর্তী কালে, বিশেষ করে শিল্পবিপ্লবের পর তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। যা লক্ষণীয় তা হলো: ইদানীং নতুন করে তার প্রবল প্রকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র। একে বলতে পারি নব্য ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে খৃস্টান এবং ইসলাম ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনা পৃথিবীর বহু অঞ্চলেই দানা বাঁধতে থাকে। তারপর কতোগুলো রাজনৈতিক ঘটনাকে ঘিরে শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে তা রীতিমতো সাম্রাজ্যবাদী চেহারা নেয়।
এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো মধ্যপ্ৰাচ্য সমস্যা। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে পেট্রোলের দাম বাড়তে আরম্ভ করে। বিশেষ করে এর দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পায় বহু গুণ ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর যুদ্ধের পর। এর ফলে বিশেষ লাভবান হয় সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, কাতার ইত্যাদি কতোগুলো ইসলামী দেশ। তারা এই পেট্রোলের কাচ টাকা দিয়ে নিজেদের দেশে প্রভূত উন্নয়ন কাৰ্য করতে সমর্থ হয়। এসব দেশে দেখা দেয় দ্রুত নগরায়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। সেই সঙ্গে এরা গড়ে তুলতে চেষ্টা করলো আধুনিক ফৌজী বাহিনী। শিক্ষার দিক দিয়ে এরা ছিলো খুবই পিছিয়ে। সেদিকেও নজর দিলো তারা। সবচেয়ে বড়ো কথা, নতুন বিত্ত লাভের ফলে এই দেশগুলো মুরুবি সাজার চেষ্টা করলো। যেহেতু এই দেশগুলোর পরস্পর-বিরোধী স্বাৰ্থ থাকলেও একটা অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় ছিলো সে জন্যে এরা যে-মুরুবিয়ানা শুরু করলো, তা শুরু করলো ইসলামের নামে। এভাবে তারা গড়ে তুললো একটা ইসলামী সাম্রাজ্য। এবং তারা এই সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার সক্রিয় প্রয়াস চালাতে আরম্ভ করলো। এক কথায় এটা হলো: ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ।
