এ শব্দটি প্রথমবারের মতো অভিধানের অন্তর্ভুক্ত হয় সম্ভবত ১৯১৬ সালেজ্ঞানেন্দ্ৰনাথ দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে। এ শব্দের সঙ্গে তিনি রোকেয়ার মতিচুর থেকে দৃষ্টান্তও দেন। ১৯৩০-এর দশকে সংকলিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান–বঙ্গীয় শব্দ কোষেও আছে। এ শব্দটা। কিন্তু তাতে এর অর্থ–যথার্থভাবেই— দেওয়া আছে: ধর্মের কারণে নিহত মুসলমান। ১৯৩৮ সালে আশুতোষ দেব তাঁর নূতন বাঙ্গালা অভিধানে শহীদ কথাটাই নয়, সেই সঙ্গে শাহাদাৎ কথাটাও অন্তর্ভুক্ত করেন। এবং শাহাদাৎ শব্দের সঠিক অর্থ দিয়েছেন: সাক্ষ্য।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা আশুতোষ দেব এই শব্দের সঠিক সংজ্ঞা দিলেও, তার আগেই কাজী নজরুল ইসলাম এ শব্দের অপব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯২২ সালের অগস্ট মাসে ধূমকেতু পত্রিকার ষষ্ঠ সংখ্যায় ক্ষুদিরাম বসুর একটি ছবি ছাপিয়েছিলেন। তিনি। ছবির জন্যে ছবি। তার সঙ্গে কোনো খবর, নিবন্ধ অথবা কবিতা ছিলো না। কেবল লেখা ছিলো “বাঙলার প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম”। নজরুলের উদ্দেশ্য ছিলো যারা দেশের জন্যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, ছবির মধ্য দিয়ে তাদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা এবং অন্যদের তা দিয়ে অনুপ্রাণিত করা। এর আগে কোনো অমুসলমানকে কেউ শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছেন বলে আমার জানা নেই। এমন কি, ধর্মযুদ্ধ ছাড়া অন্য কারণে নিহত কোনো ব্যক্তিকেও শহীদ বলে তাঁর ওপর গৌরব আরোপ করার দৃষ্টান্ত অজ্ঞাত সূতা সত্ত্বেও নজরুলের হাতে ক্ষুদিরাম শহীদ হয়ে যান। মুসলমান নজরুল ইসলামের হাতেই নয়, হিন্দু লেখকদের হাতেও ক্ষুদিরাম পরে এই বিশেষণে সম্মানিত হয়েছিলেন। যেমন, ঈশানচন্দ্র মহাপাত্ৰ ক্ষুদিরামের যে-জীবনী লিখেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন শহীদ ক্ষুদিরাম। কমলা দাশগুপ্তও ভারতকোষে ক্ষুদিরামের কথা লিখতে গিয়ে তাকে শহীদ আখ্যায়িত করেন।
মোট কথা, নজরুল ইসলাম নতুন অভিধায় শহীদ কথাটা ব্যবহার করার পর থেকে এ শব্দের মূল অর্থ পাল্টে যেতে থাকে। এর ব্যবহারও বৃদ্ধি পায় ক্রমবর্ধমান মাত্রায়। সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনে তখন যারা প্ৰাণ দিচ্ছিলেন, তার ত্যাগকে গৌরবান্বিত করার জন্যে শহীদ কথাটাকে বিশেষ উপযোগী মনে হয় তখনকার লেখকদের। সন্ত্রাসবাদীরাও এই ঐহিত্য বজায় রাখেন। এমন কি, তার পরে কমিউনিস্টরাও। বাংলা ভাষায় এর কোনো প্রতিশব্দ না-থাকায় হিন্দু লেখকরাও তাই এ শব্দটি অকাতরে ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন।
তবে এ শব্দটি পূর্ব বাংলায় বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর। আর পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকে বামপন্থীদের কল্যাণে ) ভাষা আন্দোলনের সময়ে একুশে এবং বাইশে ফেব্রুয়ারি যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, (বেশির ভাগই নিজেদের অনিচ্ছায়), তাদের সবাইকে শহীদ আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। কোনো একজন তাদের এই বিশেষণ দেননি— সবার মুখে মুখেই ধীরে ধীরে তারা শহীদে পরিণত হন। এই ঘটনা নিয়ে একেবারে প্রথম দিকে মাহবুব আলম অথবা আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতো যারা কবিতা অথবা গান লিখেছিলেন, তাঁরা এ শব্দটি তখনই ব্যবহার করেননি। কিন্তু পরে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
আসলে, ভাষা আন্দোলন যে-তৃতীব্ৰ ভাবাবেগের জন্ম দিয়েছিলো, সেই ভাবাবেগের পরিপ্রেক্ষিতেই তখনকার লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং সংস্কৃতিসেবীরা নিহতদের “শহীদ” শব্দ দিয়ে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন–যদিও এই নিহত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই আন্দোলনে যোগ দেননি, স্বেচ্ছায় প্রাণ বিসর্জন তো দূরের কথা। আমার ধারণা, শহীদ শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রথম দিকে খানিকটা দ্বিধা ছিলো। এই দ্বিধাটা এসেছিলো আরবি-ফারসির সঙ্গে বাংলার বিবাদ থেকে। সে জন্যেই দেখতে পাই প্রথম দিকের শ্লোগানে জিন্দাবাদ নাবলে, বলা হতো অমর হোক। অসম্ভব নয় যে, বাংলা ভাষার কারণে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের আরবি ভাষায় শহীদ বলা হবে কিনা, তা নিয়ে খানিকটা সংশয় দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু যেহেতু এই আত্মত্যাগ বোঝানোর জন্যে বাংলায় কোনো জুৎসই শব্দ ছিলো না, সে জন্যে অল্পকালের মধ্যেই এটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
পশ্চিম বাংলায় যখন কমিউনিস্ট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ষাটের দশকে, তখন সেখানেও এই শব্দ ব্যহৃত হতে থাকে। তারা যেমন নামের আগে বিদেশী কমরেড শব্দ দিয়ে নিজেদের চিহ্নিত করতেন, তেমনি এই আন্দোলনের জন্যে যারা প্ৰাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগকে গৌরাবান্বিত করার জন্যে বিদেশী শব্দ শহীদের স্মরণাপন্ন হন। এর ব্যবহার এতো বৃদ্ধি পায় যে, একবার এক সম্ভাব্য আততায়ীর হামলায় জ্যোতি বসু এক হাতের কড়ে আঙুলে আঘাত পেলে পত্রিকায় লেখা হয়েছিলো হাফ-শহীদ জ্যোতি বসু।
অপর পক্ষে, ভাষা আন্দোলনের পরেও বাংলাদেশের একাধিক রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে এবং ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত তাতে নিহতও হয়েছেন অনেকে। কিন্তু তাদের সবাইকে শহীদ আখ্যা দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ শহীদ উপাধি পেয়েছিলেন। যেমন, অধ্যাপক শামসুজ্জোহা এবং আসাদ। এদের দুজনের মৃত্যুই তখনকার রাজনৈতিক আন্দোলনকে দারুণ উস্কে দিয়ে। সে জন্যে, তাদের আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি জানানো হয়েছিলো শহীদ বলে। কিন্তু শহীদ দিবস বললে তখন একুশে ফেব্রুয়ারিকেই বোঝাতো। শহীদ মিনার বললেও একটি মিনারকেই বোঝাতো। প্রথম দিকে শহীদ কথাটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত না-হওয়ার একটা পরোক্ষ প্ৰমাণ তখনকার ইংরেজি পত্রিকাগুলো। এতে তাদের ইংরেজিতে বলা হতো: মার্টায়ার। শহীদ দিবসকে বলা হতো: মার্টায়ার্স ডে। মোট কথা, শহীদ কথাটা তখনো বাংলাদেশের ইংরেজি পত্রিকায় চালু হয়নি।
