শহীদ শব্দ দিয়ে যে-চরম আত্মবিসর্জনের কথা বোঝানো যায়, যে-আবেগের জন্ম দেওয়া যায়, কোনো বাংলা শব্দ দিয়ে তা যায় না 79সুতরাং ভাষা আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের এই বিশেষণ দিয়ে চিহ্নিত করার যুক্তি বোঝা যায়। কিন্তু এ শব্দ তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর। যারা এই যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে হানাদার বাহিনী অথবা তাদের দালালদের হাতে নিহত হন, তারা ধর্মের জন্যে না-হলেও দেশের জন্যে প্ৰাণ দিয়েছিলেন। সেদিক দিয়ে তাদের শহীদ বললে কথাটার পুরোপুরি অপব্যবহার করা হয়। কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। অথবা যারা বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস বজায় রাখতে গিয়ে স্বেচ্ছায় অথবা বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাসের দরুন অনিচ্ছায় প্ৰাণ বিসর্জন করেছিলেন, তাদেরও শহীদ বলা হয়তো গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যারা পাইকারী হত্যাকাণ্ডে সাধারণভাবে নিহত হনু, তাদের শহীদ বলা যায় কেমন করে। বস্তুত, পাইকারী হারে এভাবে সবাইকে শহীদ আখ্যা দেওয়ার ফলে শহীদ কথাটা ৭২ সাল থেকে খানিকটা মূল্য হারিয়ে ফেলে–পশ্চিমবঙ্গের মতোই। কিন্তু পুরোপুরি নয়। পুরোপুরি যে নয়, সেটা বোঝা যায় শেখ মুজিবের দৃষ্টান্ত থেকে।
শেখ মুজিব ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা— এখন জাতীয়তাবাদীরা (আসলে ভিন-জাতীয়তাবাদীরা) তাতে যা-ই বলুন না কেন। তাঁরই আহবানে সমগ্ৰ জাতি স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করেছিলো— কোনো সেপাই বা সেনাপতির আহবানে নয়। কিন্তু সেই শেখ মুজিব যখন সেনাবাহিনীর উচ্চপদে নিয়োজিত কয়েকজন বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় এবং কয়েকজন নিম্নপদস্থ সদস্যের সক্রিয় চেষ্টায় নিহত হলেন, তখন জাতির জনক হওয়া সত্ত্বেও শহীদ পদবী তাঁর ভাগ্যে জুটলো না।
এমন কি, তার বছর ছয়েক পরে যখন জিয়াউর রহমান তার সহকর্মীদের হাতে নিহত হলেন, তখনো তিনি সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হতে পারলেন না। কিন্তু কয়েক বছর পরে তাঁর নাম ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ফয়দা লোটার কথা ভেবে বেশ হিশেবে-নিকেশ করে তার দলের নেতারা তাকে এই অন্যায্য উপাধি দেন বলছি এ জন্যে যে, সত্যি সত্যি তিনি ধর্মের জন্যে স্বেচ্ছায় প্ৰাণ দেননি) দেশের জন্যেও নয়। তিনি যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাকেও সেরাতুল মুস্তাকিম তো দূরের কথা, ঠিক সহজ সরল পথ বলা যায় না (তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। সেনাবাহিনীর ভেতরকার ক্ষমতার দ্বন্দুের কারণে। নিহতও হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর অন্তৰ্দ্ধন্দু থেকে। নিহত হওয়ার আগেই তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর বিরুদ্ধে তেইশটি ব্যৰ্থ সামরিক অভু্যখান হয়েছিলো। তাই তাঁকে কিভাবে শহীদ জিয়া বলা যায়, অথবা হাফ-আরবি ভাষা দিয়ে গৌরব আরোপ করে তাঁর মৃত্যুদিবসকে শাহাদাত বরণের দিন বলা যায়–বাংলাভাষী একজন মানুষ হিশেবে সেটা আমার মাথায় আসে না) তা-ও তিনি দেশের জন্যে ৭১-এ লড়াই করেছিলেন। বীর উত্তম উপাধি পেয়েছিলেন স্বাধীনতা-যুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্যে। সুতরাং ন্যায়ত না-হলেও তাঁকে না-হয় শহীদই বলাই হলো।
কিন্তু ৮০-র দশক থেকে এ শব্দটা উল্কার গতিতে যেভাবে নিজের চরিত্র হারালো, তা দেখে শব্দটার দুর্ভাগ্যের কথাই মনে হয়। দেখে দুঃখ হয় যে, বেচারা “শহীদ” এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে অকালে শাহাদত বরণ করলো!
এখন যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার প্রকাশ্য সংগ্রামে অংশ নিচ্ছে, তারা তো বটেই, এমন কি, দালাল, আলবদর, পাড়ার মাস্তান, সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজ-সহ যে-কোনো লোক অন্যের হাতে নিহত হলে কবর দেওয়ার আগেই শহীদ হয়ে যায়। বাস-চাপা পড়ে মারা গেলেও শহীদ হয় সম্ভবত। আর, রাজাকার নিহত হলে আর রক্ষা নেই–অমনি তার সাগরেদরা তাকে শহীদ আখ্যা দেয়। শুনেছি, অনেক রাজাকার নাকি সরকারী মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছে। কোনো ফ্ৰী অথবা ঘুসন্টুস দিয়ে মরার আগেই একটা অগ্রিম শহীদের সার্টিফিকেট জোটানোর ব্যবস্থাও কালে কালে হবে কিনা, সেটা এখন বিবেচনার বিষয়। তা হলে একটা সার্টিফিকেট অনেকে জুটিয়ে রাখবেন। (আমি নই–বাপরে! অপঘাতে মরার সামান্যতম। ইচ্ছে আমার নেই।
যেভাবে মরে ভূত হয়ে গেছে, তাতে মনে হয় না। “শহীদ”কে আর বাঁচানো যাবে। তবে একটা ভরসা দিগন্তে দেখা দিয়েছে। তাবলিগীদের চেষ্টায় সাম্প্রতিক কালে খোদা তার শুদ্ধ আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহ-য় পরিণত হয়েছেন। পয়গম্বর রসুলে পরিণত হয়েছেন। তা ছাড়া, ক্রমবর্ধমান মাত্রায় আরবি শব্দ সৌদী উচ্চারণে এবং সঠিক অর্থে ব্যবহার করার প্রবণতাও দেখা দিয়েছে। সাত জন্মে যা দেখিনি, রাতারাতি বাদশা মিয়া, গনি মিয়া ইবনে আলি হোসেন কিংবা ইবনে কালু মিয়ায় পরিণত হচ্ছেন। মোট কথা, প্রচলিত বহু বাংলা শব্দকে হটিয়ে দিয়ে অনেকেই কুফুরি জবান বাংলার সংস্কার করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছেন। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ বা গোপনে। ইদানীং বামপন্থী (আসলে পাকিস্তানপন্থী) কোনো কোনো লেখকের জবান থেকে সংস্কারের এই খোশবু পাচ্ছি। শহীদের অপমৃত্যুর কথাটা এই সংস্কারবাদীদের নজরে আনলে হয়। তাঁরা তা হলে হয়তো একটা ফতোয়া দিয়ে মৃত শহীদকে ফের জীবন দিতে পারেন।
(যুগান্তর, ২০০৬)
১২. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত
আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের আইনটা বেশ শক্ত। যে-দেশে নানা ধর্মের লোক বাস করেন, সে দেশে শক্ত থাকাই উচিত। কারণ প্রত্যেকেরই নিজনিজ মত অনুসারে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা আছে। সেই অধিকারে বঞ্চিত করলে, মৌলিক অধিকারেই আঘাত করা হয়। সুতরাং এ আইন অবশ্যই থাকা দরকার। এবং তা যথাযথভাবে পালন করাও দরকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: যে-দেশে একাধিক ধর্ম আছে, সে দেশে বাস্তবে এ আইন কিভাবে প্রয়োগ করা হবে? কী ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। ধৰ্ম আর ধর্মীয় অনুভূতির?
