কারণের কথায় পরে আসি। তার আগে ইতিহাসের দিকে এক ঝলক তাকানো যাক। বেদ-উপনিষদ আবৃত্তি করতে হবে সংস্কৃত ভাষায় এবং তা করতে পারবেন একমাত্র ব্ৰাহ্মণরা–এই ছিলো হিন্দুধর্মের বিধান। তাই ধর্মগ্রন্থ দেশীয় ভাষায় শুনলে অথবা শোনালে তার শাস্তি হিশেবে নির্ধারিত হলো রৌরব নরকে গমন। অর্থাৎ ধৰ্মচর্চা করবেন ব্ৰাহ্মণরা, অন্যরা কেবল তাদের ব্যাখ্যা এবং অমৃতবাণী শুনেই ভক্তিতে গদগদ হয়ে তাদের অষ্টাঙ্গে প্ৰণাম করবেন। তাদের দক্ষিণা দেবেন। গৌতম বুদ্ধ এটা মানতে পারেননি। তিনি তাই ধৰ্ম প্রচার করেছিলেন মুখের ভাষা পালিতে। এভাবে তার ধর্ম আলাদা হয়ে গেলো বৈদিক ধর্ম থেকে।
খৃস্টধর্মের সে অর্থে কোনো প্রেরিত গ্ৰন্থ নেই। তবে যিশু খৃষ্টের বাণী তাঁর শিষ্যরা প্রচার করেছিলেন হিব্রু ভাষায়। কিন্তু কালে কালে খৃস্টধর্মের ভাষা হিশেবে দাঁড়িয়ে গেলো ল্যাটিন। কারণ, রোমে অবস্থিত পোপ হলেন খৃস্টধর্মের প্রধান নেতা। পােপরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ল্যাটিন ভাষায় খৃস্টধর্ম প্রচার করেছেন। তার ফলে সে ধর্ম দূরে সরে যায়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। ধর্ম প্রাত্যহিক জীবনের আচরিত বস্তু না-হয়ে পরিণত হয় একটা দুর্বোধ্য রহস্যে। ধর্মচৰ্চার অধিকার এবং ব্যবসা সীমিত থাকলো পুরুতদের মধ্যে। মার্টিন লুথার সেটা ভাঙতে চেষ্টা করলেন। তিনি প্রথমেই বাইবেলের অনুবাদ করলেন সাধারণ মানুষের ভাষায়। তিনি রহস্য উন্মোচন করে বাইবেলের বক্তব্য তুলে ধরলেন। সাধারণ মানুষের কাছে। ফলে ফতোয়া দিয়ে পোপ তাঁকে বহিষ্কার করলেন খৃস্টধর্মের আওতা থেকে। মধ্যযুগের বাঙালি কবি সৈয়দ সুলতান ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন বাংলা ভাষায়, এবং এটা অনেকে ভালো চোখে দেখেননি। তাঁর রচনা থেকে জানা যায় যে, তাকে অনেকে কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন, যদিও তিনি ধর্মের বাণী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যেই বাংলায় ধর্মের কথা লিখেছিলেন।
সারা পৃথিবীর মুসলমানরা মনে করেন যে, তাদের ধর্মীয় ভাষা হলো আরবি। পৃথিবীর যেখানেই তাঁরা বাস করেন না কেন, তাঁরা ধর্ম পালন করেন আরবি ভাষায়, বেশির ভাগই না-বুঝে। যেখানটায় হয়তো বলা হয়েছে কোন কোন মহিলাকে বিবাহ করা যাবে না–না-বুঝে সে কথা শুনেই হয়তো ধর্মভীরু মোমিন ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন। অথচ ধর্মগ্রন্থের মূল বিধান তাঁদের কাছে রয়ে যায় অজানা। অনেক সময়ে তাই কুসংস্কারকেও তাঁরা গণ্য করেন ধর্ম বলে।
মোট কথা, কোনো বিশেষ ভাষাকে পবিত্র বলে বিবেচনা না-করে সাধারণ মানুষের ভাষায় যদি ধর্মের বাণী প্রচার করা হয়, তা হলে চোরে না-শুনলেও, সাধারণ ভক্ত শুনতে এবং খানিকটা বুঝতে পারবেন। এমন কি, সে বাণী থেকে কিছু শিক্ষা হয়তো বাস্তব জীবনে গ্রহণও করতে পারেন। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান এ যদি তারা সত্যি বিশ্বাস করেন, তা হলে, সেই ঈশ্বর নিশ্চয় সব ভাষাই বুঝতে পারবেন। তা হলে এই সত্য আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, কোনো ভাষা পবিত্র অথবা অপবিত্র নয়–সব ভাষাই আসলে কেবল ভাব প্রকাশের বাহন।
(যুগান্তর, ২০০৬)
১১. শহীদের অপমৃত্যু
সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ :
একজন রাজাকার (সুশান্তি বৰ্ষিত হোক তাহার উপর!)–
নামজাদা এক রাজাকার
অপঘাতে হয়েছেন, আহা রে, শহীদ…
সত্যি সত্যি এখন প্রতিদিন যে-হারে শহীদ হচ্ছে সবাই, তাতে উপরের খবরটা হঠাৎ একদিন ছাপা হলে অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না (এমন ঢালাওভাবে শহীদ কথাটা সম্প্রতি ব্যবহৃত হচ্ছে যে, এর তাৎপর্য তো নয়ই, কোনো অর্থই বাকি আছে কিনা, বলা শক্ত। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে শব্দটা অর্থবহ ছিলো, এখন কেবল অর্থহীন নয়, রীতিমতো দুর্বিষহ।
ইহুদী এবং খৃষ্টান ধর্মে মার্টায়ার কথাটার অর্থ গোড়াতে ছিলো সাক্ষী–নিজের ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করার বদলে যে নিজের মৃত্যু অথবা হত্যা প্রত্যক্ষ করে অর্থাৎ তার সাক্ষী হয়, সে হলো মার্টায়ার ইসলাম ধর্মে শহীদ কথাটা এসেছে এই ধারণা থেকেই। এবং প্রথমে এর অর্থ সাক্ষীই ছিলো–নিজের বিশ্বাসের জন্যে যে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে মেনে নয়। অপর পক্ষে, হাদিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার আদেশে ধর্মযুদ্ধে যে নিহত হয়, সে-ই হলো শহীদ। মহাযান বৌদ্ধধর্মে বোধিসত্ত্ব কথাটার সঙ্গেও শহীদের ধারণার খানিকটা যোগ রয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মে শহীদের ধারণা নেই। বাংলা ভাষাতেও না।
দোভাষী ইসলামী পুঁথি, বিশেষ করে মহররমের কাহিনী নিয়ে রচিত পুঁথির মাধ্যমে শহীদ শব্দটা প্রথম বারের মতো বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ে। একটি পুঁথির নামই যেমন শহীদে কারবালা। কিন্তু মূলধারার মুদ্রিত বাংলা সাহিত্যে শহীদ শব্দের ব্যবহার বিশ শতকের আগে হয়েছিলো কিনা, আমার জানা নেই। তবে ১৯০৫ সালে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁর রচনায় এ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। তার বছর পনেরো/ষোলো পরে নজরুল ইসলামও এ শব্দ ব্যবহার করেন তার রচনায় এভাবে বাংলা ভাষায় ভীরু ভীরু পায়ে এ শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকলেও, এখন কারণ্যে-অকারণে শহীদ কথাটার যথেচ্ছ প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে কথাটার মাহাত্ম্য এবং ধার একেবারে ক্ষয়ে গেছে। এমন কি, লোপ পেয়েছে বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না।
১৮৬৬ সালে কানাইলাল শীল বাংলা ভাষার অন্যতম পুরোনো অভিধান— শব্দার্থ রত্নমালায় এ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেননি। তিনি সম্ভবত শোনেনওনি। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত রামকমল বিদ্যালঙ্কারের সচিত্ৰ প্ৰকৃতিবাদ অভিধানেও এ শব্দটা নেই। এমন কি, ১৯১৩ সালে প্রকাশিত যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির শব্দকোষেও শহীদ শব্দটি অনুপস্থিত। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত সুবল মিত্রের অভিধানেও।
