১৮৫৬ সালে–ডারউইন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাইরে থেকে জীবজন্তুদের চেহারা যতোটা ভিন্ন রকমের দেখায়, তাদের দেহের মূল কাঠামো অতোটা ভিন্ন নয়। গোড়ায় এই কাঠামো ছিলো কমবেশি একই রকমের। তারপর কোটি কোটি বছর ধরে ধীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা এখন নানা রকম প্ৰজাতি এবং জীবজন্তুতে পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের শরীরের মূল কাঠামো বিশ্লেষণ করলে এখনো সেই সাদৃশ্য খানিকটা চোখে পড়ে। চারটি একেবারে ভিন্ন ধরনের জন্তু দিয়ে একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে–মাছ, পাখি, মানুষ এবং ঘোড়া। তাদের চেহারা, ফলাফেরা এবং জীবনযাত্রার মধ্যে কোনো মিল নেই। মাছের হাত-পা নেই এবং তারা বাস করে পানিতে। পাখিরও হাত নেই এবং তারা উড়তে পারে। মানুষ চলে দুপায়ে। আর ঘোড়ার আছে চারটি পা–হাত নেই। কিন্তু এদের কঙ্কালগুলো পাশাপাশি রাখলে এদের দেহের মৌলিক কাঠামোতে একটা অত্যাশ্চর্য মিল লক্ষ্য করা যাবে। মাথা, গলা, বুক, পেট, পা ইত্যাদিতে।
বিবর্তনবাদীদের যুক্তি হলো: কোটি কোটি বছর ধরে মাছ পানিতে বাস করায় তার পায়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, তাই তাদের পা নেই। কিন্তু শরীরের যেখানটাতে পা থাকার কথা ছিলো, সেখানে এখনো রয়ে আছে পায়ের দুটি চিহ্ন। পাখিরা উড়ে বেড়ায় বলে তাদের মানুষের মতো ছোটো হাত থাকলে চলে না। সে জন্যে তাদের হাত দুটোই বড়ো পাখায় পরিণত হয়েছে। মানুষ দু পায়ে চলে বলে তার হাত দুটো ঘোড়ার সামনের পা দুটোর মতো নয়। ঘোড়ার মতো তার লেজেরও দরকার নেই। তাই তার লেজটা খসে পড়েছে। কিন্তু যেখানে লেজ থাকার কথা ছিলো, সেখানে এখনো লেজের গোড়াটা রয়ে গেছে। (তা ছাড়া, লেজ না-থাকলেও মাঝেমধ্যে একএকটা কারণে মনুষ্যত্ব ঘুচে গিয়ে তার অদৃশ্য লেজটা বেরিয়ে পড়ে।)
ডারউইনের মতে, আদিম অবস্থায় জন্তু-জানোয়ারের সূচনা হয়েছিলো এক অথবা একাধিক কোষ দিয়ে। তারপর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা বর্তমান শারীরিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। মানুষের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, এখন মানুষ দু পায়ে চলাফেরা করলেও, সুদূর অতীতে তা করতো না। তখন তারা চলতো চার হাত-পায়ে। সেই পর্যায়ের মানুষকে বলা হয় হোমো ইরেক্টাস। তারপর এখন থেকে প্রায় দু লাখ বছর আগে তারা পরিণত হয় হোমো সেপাইনসে। সেই হোমো সেপাইনস-ই আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ।
বানরও কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের বানরে পরিণত হয়েছে। তার অর্থ অবশ্য দাঁড়ায় এই যে, নর এবং বানরের মধ্যে চেহারার মিল থাকলেও তারা এক জন্তু নয়। বানর থেকে নরের উদ্ভব হয়নি। এমনি কি, শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাং ওটাংকে ঢালাওভাবে বানর বলা হলেও তারাও এক প্রজাতির জন্তু নয়। বানরের যেমন নানা রকমের প্রজাতি আছে, অতীতে মানুষেরও তেমনি একাধিক প্রজাতি ছিলো। যেমন, নিয়্যান্ডারটাল মানুষ পঞ্চাশ হাজার বছর আগেও বেঁচে ছিলো। তারপর মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে তারা তাদের আলাদা অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। হবিট নামের খুদে মানুষও ছিলো মানুষেরই আর-একটি প্রজাতি। পঁচিশ হাজার বছর আগেও তারা জীবিত ছিলো।
বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, শাস্ত্রে কিন্তু মানুষের জন্ম হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে— তা বলা হয়নি। বস্তৃত, ধর্মগুরুরা বলেছেন, সবই ঈশ্বরের সৃষ্টি। কেউ বা বলেছেন, ঈশ্বর বললেন, হও! অমনি হয়ে গেলো। কেউ বলেছেন, ঈশ্বর তাবৎ সৃষ্টি শেষ করলেন সপ্তাহ খানেকের মধ্যে। কেউ বললেন, ঈশ্বর এক বারেই নিখুঁত মানুষ এবং অন্য জন্তুদের সৃষ্টি করে পৃথিবীতে ফেলে দিলেন। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড এবং আধুনিক জীবজন্তুদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের এখন যেমন দেখা যায় হুবহু সেই চেহারায়। বিবর্তনের ধারণা ধর্মশাস্ত্রে নেই। শাস্ত্ৰমতে বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডেরও বিবর্তন হচ্ছে না— যদিও হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এখনো বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড সম্প্রসারিত হচ্ছে প্ৰচণ্ড গতিতে।
শাস্ত্রে এমনও বলা হয়েছে যে, সব জীবজন্তুই সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের ভোগে লাগবে বলে। কুতর্কিকরা অবশ্য কিছুই এ কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে চান না। তারা বলেন, এ কথা সত্য হলে, মানুষের জন্মের কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসরের জন্ম হলো কেন? অথবা আজও যদি ডাইনোসর থাকতো, তা হলে তারা মানুষের কোন কাজে লাগতো? হাল আমলের মশা, মাছি, ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস এসবই বা কোন কাজে লাগে? শান্ত্রকারেরা এর ব্যাখ্যা দেননি। সে জন্যে অবিশ্বাসীদের মনে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়।
সত্যি বলতে কি, শাস্ত্রে সৃষ্টিরহস্যের যে-ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, বিজ্ঞান দিয়ে তা সমর্থন করা যায় না। ঐতিহাসিক প্রমাণও তার উল্টোটাই বলে। যেমন, শাস্ত্র অনুযায়ী মানুষের বয়স বড়েজোর দশ হাজার বছর। অথচ মানুষের তৈরি যেসব হাতিয়ার পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে, এমন কি, গুহার ভেতরে মানুষের আঁকা যেসব চিত্র পাওয়া গেছে, তার বয়স দশ হাজার বছরের অনেক বেশি। তাদের কোনো কোনো হাতিয়ার কয়েক লাখ বছরের পুরোনো।
প্রশ্ন করতে পারেন, এতো কাল পরে হঠাৎ বিবর্তনবাদ এবং সৃষ্টিতত্ত্বের বিতর্কের কথা তুলছি কেন? তুলছি, বিজ্ঞানের প্রমাণ অগ্রাহ্য করে চার দিকে পেছনের দিকে যাওয়ার যে-উন্মত্ত প্ৰয়াস দেখা যাচ্ছে, তা দেখে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাস্কা, আর্জেন্টিনা থেকে ভুলাডিভষ্টক পর্যন্ত সর্বত্র এক দল মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘড়ির কাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রবল হুজুগ। ধর্মগুরুরা বিজ্ঞানকে অগ্রাহ্য করেছেন একেবারে প্রাচীন কাল থেকেই। সে জন্যে যখনই শাস্ত্রের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিরোধ দেখা দিয়েছে, তখনই ধর্মগুরুরা বিজ্ঞানের পরীক্ষিত জ্ঞানকে অস্বীকার করেছেন, আর বিজ্ঞানীদের নিন্দা জানিয়েছেন।
