এক সময়ে জনপ্রিয় বিশ্বাস ছিলো যে, সূর্য ঘোরে পৃথিবীর চারদিকে। কিন্তু ষোলো শতকের প্রথম ভাগে কোপারনিকাস যখন তার উল্টোটা বললেন, তখন তাঁর গ্রন্থ প্ৰকাশ করতে ব্যর্থ হলেন। শোনা যায়, তেরো বছর অপেক্ষা করার পর মৃত্যুশয্যায় তিনি তাঁর গ্রন্থ দেখতে পান। গেলিলিওর ভাগ্য ছিলো আরও খারাপ। তিনি যখন কোপারনিকাসের তত্ত্ব সমর্থন করলেন এবং দাবি করলেন যে, পৃথিবী বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে নয়, তখন পোপ সেটা মানতে পারলেন না। ফলে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হয় গৃহবন্দী হিশেবে। কোনো কোনো শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, সূর্য রাতের বেলায় গিয়ে সৃষ্টিকর্তার সিংহাসনের তলায় বিশ্রাম নেয়। পরের দিন ভোরে সে আবার তার দায়িত্ব পালনের জন্যে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। এই ব্যাখ্যার মধ্যেও পৃথিবী স্থির থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। কোনো কোনো ধর্মে এমনও বলা হয়েছে যে, পৃথিবী গােলকের মতো নয়, পৃথিবী হলো সমতল ভূমির মতো। এসব কথা মেনে নিলে আমাদের মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না।
জ্ঞানবিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতির পরে ডারউইন যে বিবর্তনবাদের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, রোম্যান ক্যাথলিক চার্চ প্রায় এক শো বছর পর্যন্ত তার সরাসরি কোনো প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু তারপর ১৯৫০ সালে পোপ ফতোয় দেন যে, বিবর্তনবাদ মেনে নিলে মানুষকে ছোটো করা হয়। তবে বিজ্ঞানের অসাধারণ আবিষ্কারের কথা পোপ জানতেন। তাই তিনি নিজেও সৃষ্টিতত্ত্বকে আক্ষরিকভাবে মেনে নিতে পারলেন না। তিনি বললেন, সৃষ্টিতত্ত্বকে মেনে নিতে হবে প্রতীকী অর্থে।
পশ্চিমা বিশ্বের স্কুল-কলেজে সৃষ্টির রহস্য বোঝার জন্যে বিবর্তনবাদ পড়ানো শুরু হয়েছিলো। কিন্তু পোপ এই ফতোয়া দেওয়ার পর থেকে রোম্যান ক্যাথলিক এবং ইভ্যানজেলিকাল (তবলগীদের মতো) খৃস্টানরা বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করতে আরম্ভ করেন। জন হুইটকম্ব এবং হেনরি মরিসের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিও সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে নতুন করে গ্রন্থ রচনা করেন। সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করার জন্যে একাধিক সংগঠনও প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়: সৃষ্টিতত্ত্বকে প্রচার করে তাকে জনপ্রিয় করা। ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্কেনসতে একটি আইন পাশ হয়, যাতে বিবর্তনবাদ পড়ানোর সময় সৃষ্টিতত্ত্বের জন্যেও সমান সময় ব্যয় করার বিধান থাকে। কিন্তু এই আইন বাতিল হয়ে যায় আদালতে। পরে লুইসিয়ানায়ও অনুরূপ একটি আইন প্রণীত হয়। কিন্তু এ আইনও সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়। বস্তৃত, ষাটের দশক থেকে অনেক জায়গাতেই সৃষ্টিতত্ত্বের প্রতি একটা নতুন উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। পূর্ব বাংলায়ও এ সময়ে বরকতুল্লাহ নামে একজন লোক সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে–এই মতবাদ প্রচার করে বই লিখেছিলেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে কয়েকজন লোকের সামনে তাঁর হাস্যকর বক্তব্য পেশ করতে শুনেছিলাম।
তা সত্ত্বেও, ১৯৬০-এর দশকেই এই পেছনে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন অতো জোরালো হতে পারেনি। কিন্তু সম্প্রতি সারা বিশ্বে যে-মৌলবাদী চেতনা সুনামির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, তার প্রভাবে অ্যামেরিকার মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত দেশেও বিবর্তনবাদ বর্জন করে সৃষ্টিতত্ত্ব পড়ানোর দাবি উঠেছে। পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে রক্ষণশীল মনোভাব প্রচার করার এই ধরনের মনোভাব ভারতীয় উপমহাদেশেও লক্ষ্য করা যায়। ভারতে বিজেপির পৌরোহিত্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী মনোভাব থেকে পাঠ্যপুস্তক সংস্কার করার সরকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এর প্রবল প্রয়ােগ লক্ষ্য করা যায়। ধর্মশিক্ষা নয়, তেমন বইয়ের গোড়াতেও থাকে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা— ধান ভানতে শিবের গীতের মতো। ১৯৭১ সালে যে-দেশ গড়ে উঠেছিলো ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর, সেই দেশই মুসলিম জাতীয়তাবাদী ভাবনার জোয়ারে প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষণশীল করে তুলেছে। এর জন্যে পাঠ্যপুস্তকে মগজ ধোলাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়। তা ছাড়া, সরকারী এবং বিদেশী অর্থে গড়ে ওঠে হাজার হাজার মাদরাসা।
মুশকিল হলো: সৃষ্টিতত্ত্ব মানলে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে হয়। কিন্তু বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না। সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসীরাও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগান তাদের মধ্যযুগীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে। তাই একই সঙ্গে পাশাপাশি চলছে। রক্ষণশীলতা এবং পুস্তকী বিজ্ঞানের চর্চা। যেশিক্ষার্থী বিশ্বাস করে সৃষ্টিতত্ত্বে, সে-ই আবার অভিসন্দর্ভ লেখে বিবর্তনবাদ নিয়ে। বিজ্ঞান মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাশ করে; আর জীবনাচরণের জন্যে মুখ ফেরায় শাস্ত্রের দিকে।
সৃষ্টিতত্ত্ব পড়ানোর ফলে রাতারাতি মানব সভ্যতা মধ্যযুগে ফিরে যাবে–এটা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এই মধ্যযুগীয় মূল্যবোধের দিকে সতৃষ্ণ নয়নে তাকানোর প্রবণতা একটা মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়। সেই মনোভাব আধুনিকতা, উদারতা, ইহলৌকিকতা এবং প্রগতির বিরোধী। কিন্তু আমার মনে হয়, এই প্রবণতা ধমীয় জাতীয়তাবাদের একটা সাময়িক জলোচ্ছাস মাত্র। বেশি দিন থাকবে না। কারণ, আমাকে না-পেয়ে ডারউইন মহাশয়ের যে-অসুবিধে হয়েছিলো, সেটা জন্তুদের বাহ্যিক কাঠামোর সাদৃশ্য দেখানো ব্যাপারে। কিন্তু এখন জীনতত্ত্ব দিয়ে অনেক দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে যে, মানুষ আর কেঁচো যে-বস্তু দিয়ে তৈরি তা প্রায় একই। মানুষের সঙ্গে একটা ওরাং ওটাং-এর মিল আরও বেশি-শতকরা নিরানব্বই ভাগ। এমন প্রমাণের মুখে পেছনে ফিরে যাওয়ার মনোভাব চিরদিন টিকে থাকবে না; টিকে থাকতে পারে না।
০৯. আল্লাহ হাফেজ
বেইজিং-এ অথবা মস্কোতে বৃষ্টি হলে অনেক কমিউনিস্ট নাকি ঢাকা-কলকাতায় ছাতা খোলেন। তার কারণ, কমিউনিষ্ট আদর্শের প্রতি তাদের অতিভক্তি। তেমনি ইদানীং ধর্মের নামে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি অনেকের আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যে-পুণ্যালোভাতুর ঠিকাদার অসৎভাবে এন্তার টাকা করছেন, তিনি বেশি পুণ্য লাভের আশায় গরু কোরবানি না-দিয়ে উটি কোরবানি দেওয়ার কথা চিন্তা করেন। অর্থাৎ ধর্মের আদর্শ অনুসারে সৎ না-হলেও, আনুষ্ঠানিকতায় এঁরা কেবলমুখী। এই মনোভাব থেকেই সম্প্রতি দেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের প্রতি হিড়িক পড়ে গেছে। তা না-হলে জন্মে কোনো দিন ঈদে মিলাদুন্নবীতে শোভাযাত্রা দেখিনি। কিন্তু এখন গাঁটকাটাদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের জাঁকজমকও তেমন বৃদ্ধি পেয়েছে।
