আর, নারীদের অধিকারের কথা যাঁরা বলছেন, এবং সেই অধিকার আদায়ের জন্যে প্রচলিত সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডাটা একটু উচু করে তুলে ধরছেন, সেই নারীবাদীদের রীতিমতো ভয়ভীতি এবং সহিংসতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে স্ত্রীশিক্ষার হার অনেক বেশি, যে-সমাজে নারীপ্রগতির ধারা বইতে শুরু করেছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, সেখানেও তিলোত্তমা অথবা সুস্মিতাদের অনেকে ভালো চোখে দেখেন না। আর, বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে সনাতন ভূমিকার বাইরে কোনো নারী কিছু করলে, তাকে সমাজের শাসন সহ্য অথবা অগ্রাহ্য করতে হয়। তসলিমার মতো কেউ নারীদের অধিকার এবং পুরুষদের অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে তাঁকে ফতোয়ার শিকার হতে হয়। কেবল ব্যক্তি নয়, এনজিওর মতো কোনো সংস্থা নারীদের উন্নতির কাজে এগিয়ে এলে তাকেও মৌলবাদীদের বোমাবাজি অথবা অগ্নিসংযোগের শিকার হতে হয়।
ধর্ম এবং নারীদের সংঘাত অবশ্য ফতোয়া অথবা ধমীয় বিধান দিয়ে মীমাংসা করা যাবে বলে মনে হয় না। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্ৰযুক্তির উন্নতি হচ্ছে বলতে গেলে রকেটের গতিতে। গোটা বিশ্বের নারীপুরুষের মিলিত কর্মজীবনের ক্রমবর্ধমান আদর্শ যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। সারা পৃথিবীতে। ইচ্ছে করলেও সেই প্রগতির ধারাকে ঠেকিয়ে রাখার উপায় নেই। ফলে মধ্যপ্ৰাচ্য এবং আফ্রিকার মতো রক্ষণশীল সমাজগুলোও এই নতুন জীবনের আদর্শ দিয়ে কমবেশি প্রভাবিত হতে আরম্ভ করেছে। এসব দেশে শিক্ষার হার যতো ছড়িয়ে পড়বে, এই আদর্শ ততোই প্রশস্ত পথে রক্ষণশীলতার দুর্গগুলিকে দুর্বল করবে। তাতে ধর্ম যাই বলুক না কেন। কিছু কাল এমন হবে যে, মানুষ ধর্ম এবং বাস্তব জীবনকে দুটো কম্পার্টমেন্টে ভাগ করে নেবে। ধর্ম পালন করার সময়ে ধর্ম করবে, আবার জীবন পালন করার সময়ে আধুনিকতাকে মেনে নেবে। ধর্ম এবং জীবনের মধ্যে এক ধরনের আপোশ করে নেবে। যেমন, এখন পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়। এমন কি, অল্পবিস্তর লক্ষ্য করা যায় মধ্যপ্রাচ্যে।
ধর্ম অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বিশ্বাস। এই শিক্ষা অস্থিমজ্জায় মিশে থাকে। ভেতর থেকেই সে আমাদের শাসন করে। তার বিধানকে অগ্রাহ্য করা অথবা অবহেলা করা তাই আদীে সহজ নয়। কিন্তু তাই বলে ধর্ম চিরকাল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সব ধর্মের দিকে তাকিয়ে দেখলেই দেখা যাবে, তাতে ধীরে ধীরে কমবেশি পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তাই ধর্ম যতোই শক্তিশালী হোক, সে সময়ের ঘড়িটাকে আটকে রাখতে পারবে না, অথবা যে-নারী একবার মুক্ত হাওয়ার স্বাদ পেয়েছে, তাকেও ফের বদ্ধ অন্ধকার ঘরে বন্দী করতে পারবে না।
০৮. নর-বানর
রবীন্দ্ৰনাথ আপসোস করে লিখেছিলেন: “আমি যদি জন্ম নিতাম কালিদাসের কালে …।” আমি অদ্দূর পেছনে যেতে চাইনে। আপাতত, তাই বলতে পারি, আমি যদি জন্ম নিতাম ডারউইনের কালে …। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, আমি তা হলে কী করতাম? না, না, আমি কিছুই করতাম না। তবে ডারউইনের মস্ত লাভ হতো। তাঁর তত্ত্ব নিয়ে আজও যে-বিতর্ক আছে, তা আদৌ থাকতো না।
একেবারে যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা বললেও, বিবর্তনবাদ প্রমাণ করা ডারউইনের পক্ষে মোটেই সহজ ছিলো না। অন্তত গবেষণাগারে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিশিয়ে পানি তৈরি করে দেখানোর মতো অতো সহজ ছিলো না। তাই তিনি যেসব প্রমাণ দিয়েছেন, তাকে অনেকে অকাট্য বলে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর জীবদ্দশাতেই অনেকে তার বক্তব্য প্ৰত্যাখ্যান করেছেন। আর ধর্মপ্ৰাণ ব্যক্তিরা তো তাকে রীতিমতো ধর্মবিদ্বেষী বলেও ফতোয়া দিয়েছেন। তারপর চলে গেছে। দেড় শো বছর। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও আজও অনেকে তাঁর তত্ত্ব মানতে চান না। আসলে, হাতে-কলমে তিনি প্রমাণ করতে পারলেন না। যে, বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বানরের মতো একটা জীব নরে পরিণত হয়েছে। এর কারণ, তিনি এমন কোনো নির অথবা বানরের দৃষ্টান্ত হাজির করতে পারলেন না, যাকে দেখে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে, হ্যাঁ, এ জন্তু অর্ধ-নর, অর্ধ-বানর। অর্থাৎ নর এবং বানরের মাঝখানকার হারিয়ে-যাওয়া সূত্ৰ–ইংরেজিতে যাকে বলে মিসিং লিঙ্ক–তার সন্ধান তিনি দিতে পারেননি। কিন্তু আমি যদি তাঁর সমসাময়িক হতাম, তা হলে তিনি অনায়াসে আমাকে হাজির করে তাঁর তত্ত্বের প্রতি সবার সমর্থন আদায় করতে পারতেন! আমাকে যাঁরা দেখেছেন, আশা করি তাঁরা একবাক্যে বানরের সঙ্গে আমার সাদৃশ্যের কথা স্বীকার করবেন। সে যাই হোক, আমা-বিহনে ডারউইন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন। আর অন্যরা ১৮৭১ সালে বানর-রূপী ডারউইনের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে তাঁর বক্তব্য যে ঠিক নয়, সেটাই প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন।
মোরগের জন্ম আগে, না ডিমের জন্ম আগে— তা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে অনেক তক্কো হয়ে থাকে। কেবল মোরগ আর ডিম নয়, জানোয়ার-শ্রেষ্ঠ মানুষেরা কোথা থেকে এলো, তা নিয়েও বাচসা শুরু হয় খৃস্টর জন্মের আগে থেকেই। কিন্তু এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব ডারউইন এবং অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের আগে পর্যন্ত কেউ দিতে পারেননি। এমন কি, এঁরা দুজন তত্ত্ব দেওয়া সত্ত্বেও এই বিতর্ক থেকেই গেলো।
