গরু ছাগল থেকে শুরু করে তাবৎ জীবের অন্তত স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার আছে। নারীদের তাও নেই। তাদের দেহটা যেহেতু পুরুষদের কামনার বস্তু, সে জন্যে সেই দেহটা নিয়ে পুরুষদের ঈর্ষা এবং দুশ্চিন্তার সীমা নেই। সে জন্যে যেমহাপুরুষ বিধবাদের বিবাহ দেওয়ার অনুমতি দেন, তিনিই আবার নিজের বিধবাদের বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। কেবল তাই নয়, নারীদেহটাকে ঢেকে-ঢুকে রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে সব ধর্মে। বোধ হয় প্রাচীন হিন্দু ধর্মে এ ব্যাপারে অতো শুচিবাইগ্রস্ত ছিলো না। সে কালের যতো নারীমূর্তি দেখা যায়, বিশেষ করে টপলেস মূর্তি, তা থেকে এ ধারণা হতে পারে। তা ছাড়া, মন্দিরে মিথুনরত মূর্তি থেকেও এমন মনে হতে পারে। কোনো কোনো মন্দির আছে, যাকে বলা যায় বাৎস্যায়নের প্র্যাকটিকল ডেমনষ্ট্রেশান। কয়েকজন পুরুষ মিলে এক নারীকে সঙ্গম, কয়েক নারীকে এক পুরুষের সঙ্গম থেকে আরম্ভ করে যৌনকর্মের এমন কোনো বৈচিত্র্য নেই, যার নমুনা নেই এসব মূর্তিগুচ্ছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মের এই ব্যতিক্রম বাদ দিলে সব ধর্মই নারীদেহ নিয়ে মহা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কতোভাবে সেই সুন্দর দেহটিকে ঢেকে রাখা যায়, তার প্রতিযোগিতা চলে ধর্মে ধর্মে।
ডিবিশন অব লেবার। এই ডিবিশন অব লেবারের প্রতি সব ধর্মেরই কমবেশি সমর্থন রয়েছে। ধর্ম নারীপুরুষের ভূমিকা মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে বেঁধে দিয়েছে। তুমি ঘরে বসে হাত পুড়িয়ে রান্না করো, থালা-বাটি মাজো, ঘাম ঝরিয়ে কাপড় কাচো, ঘর পরিষ্কার করো, আমি ভদ্র পোশাক পরে বাইরে গিয়ে কিছু টাকা পয়সা নিয়ে আসি। অর্থাৎ শক্ত কাজটা তুমি করো, হাল্কা কাজটা আমি সারি। এভাবে পেশী আর অর্থ দিয়ে পুরুষরা একেবারে আদি কাল থেকে নারীদের রেখেছে বন্দী করে।
তার ফলে যেসব সামাজিক আইন তথা লোকাচার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে, তা পুরুষরাই তৈরি করেছেন। কোনো কোনো প্রভাবশালী পুরুষ আবার এসব আইনকে অদৃশ্য শক্তি ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে আরও জোরদার করেছেন। অন্য ভাষায় বলা যেতে পারে, পুরুষের আইন আর ধর্ম সম্পূরকের মতো কাজ করেছে। পুরুষের আইনই ধর্মের লেবাসে অবশ্য-পালনীয় প্রশ্নাতীত বিধানে পরিণত হয়েছে। কারণ পুরুষের আইন লুকিয়ে-চুরিয়ে কখনো কখনো অমান্য করা যায়। বীরপুরুষরা সবসময়ে হাজির থাকেন না, সর্বত্রগামীও নন। বাকি সময়টা মেয়েদের পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব বেছে নিলেন স্বয়ং ঈশ্বর মহোদয়, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বদ্ৰষ্টা, সদাজাগরূক, সর্বত্রগামী। সুতরাং তাঁর বিধান অমান্য করার উপায় নেই। তিনি আবার অনেকগুলো দেবতা (অথবা অপদেবতা) লাগিয়ে রেখেছেন মেয়েদের পাহারা দেওয়ার জন্যে। এটা হাড়ে-হাড়ে উপলব্ধি করতে পেরেই নারীবাদীরা অতো চটা ধর্মের ওপর।
নারীবাদীরা চটা–তার কারণ তারা অনুভব করতে পেরেছেন যে, কখনো অনুনয়-বিনয় করে, কখনো ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিষিদ্ধ ফল খাইয়ে, কখনো মিনসের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে যদিবা একটু এধার-ওধার করা যায়, ঈশ্বর বাবুর কথা স্বামী অগ্রাহ্য করতে চান না, এমন কি, নারীরা নিজেরাও অমান্য করতে ভয় পান। কী জানি, শেষে কী হয়! ফলে সেই মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসা আইনই কবুল করে নিতে হয়। নারীবাদীরা মুক্তির, স্বাধীনতার, উন্নততর জীবনের, সমানাধিকারের সৃষ্টিছাড়া চিন্তাভাবনা করলেও, সাধারণ নারীরা আদৌ ভেবেই দেখেন না, পুরুষরা কী কী উপায়ে এক্সপ্লয়েট করেন তাঁদের।
স্বাধীনভাবে চিন্তা করার বিষয়টা ধর্ম তথা সনাতন মূল্যবোধ ঠিক উৎসাহিত করে না। ধর্মের কথা হলো: তুমি ভাববে কেন? তোমাকে যেমনটা করতে বলা হয়েছে, ঠিক তেমন করো–পুস্তকী ভাষায় অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না-করে, ডানে-বায়ে না-তাকিয়ে যেমন বলা হয়েছে–ঠিক তেমনই–সামনে চলো। ধর্ম যতো আগেই বিধান দিয়ে থাক, সেটা প্রশ্নাতীত। সেটা এ যুগে চলতে পারে। কিনা, অথবা সেটা মেনে চললে উন্নতির পথে যাওয়া সম্ভব কিনা, এটা কেউ বিচার করে না। এমন কি, এ প্রশ্ন কেউ তুললে রক্ষণশীল সমাজ রক্তচক্ষু দেখিয়ে তাকে শাসন করে। এসব ঝামেলায় বেশির ভাগ লোকই যেতে চায় না। বস্তৃত, সনাতন মূল্যবোধ মেনে চললে শামসুর রাহমানের ভাষায় মেষের মতো সুখে থাকা যায়— মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ!
নারীরা কিছুকাল আগে পর্যন্ত সেই বেশ সুখেই ছিলেন। কিন্তু পথভ্রষ্ট কিছু নারদরদী–ভাষান্তরে–স্ত্রৈণ পুরুষ এবং কিছু উচ্চাভিলাষী মহিলা মিলে নারীদের মনে অশান্তির বীজ বপন করেন দেড় শো / দু শো বছর থেকে। তখন থেকেই ঘরেঘরে নারীদের মনে অ-সনাতনী চিন্তা দানা বঁধতে আরম্ভ করে। নারীপুরুষের অধিকার সমান ইত্যাদি বৈপ্লবিক ধারণা বাসা বাধে। এখন ধর্মগুরুরা পই পই করে মন্ত্র যপ করে ফের এই অবাধ্য নারীদের ঘর-মুখো করতে চেষ্টা করছেন। অনেক স্বামীও যোগ দিয়েছেন এই চেষ্টায়। তারা বৌদের এবং ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদের শ্ৰীলতার দোহাই দিয়ে কয়েক পরীত কাপড়চোপড় পরাচ্ছেন। দুবেলা মন্ত্র যাপ করাচ্ছেন। উঠতে-বসতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্বামী পরম গুরু। স্বামীর পদতলেই স্বর্গ। কিন্তু যে-স্ত্রীরা শিক্ষার আলো দেখেছেন, একবার চার দেয়ালের বাইরে কাজ করার স্বাদ পেয়েছেন, রান্নাবান্নার চেয়েও তৃপ্তিদায়ক কাজের জগতের সন্ধান পেয়েছেন, সন্তান জন্মদান এবং তাদের লালনপালন করার চেয়েও অর্থবহ। জীবনের দেখা পেয়েছেন, সেই নারীরা আর পুরোনো মূল্যবোধের খাচায় বন্দী হবার সম্ভাবনায় আনন্দে লাফাচ্ছেন না। ফলে রক্ষণশীল সংসারে নারীপুরুষে দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে, সেই দ্বন্দ্ব কখনো কখনো এমন গুরুতর হচ্ছে যে, তার ফলে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। এই অশান্তি এবং দ্বন্দ্বের জন্যে সমাজ সাধারণত অবাধ্য নারীদেরই দোষারোপ করে। সমাজে এঁদের ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না।
