সমাজ কতোটা রক্ষণশীল তার ওপর নির্ভর করে এক-এক সমাজে নারীবাদীদের কতোটা বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আবার কতোটা অধিকার নিয়ে নারীরা সন্তুষ্ট হবেন, তাও নির্ভর করেছে, সে সমাজ কতোটা আধুনিক অথবা কতোটা রক্ষণশীল তার ওপর। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, ক্যাথলিক সমাজে এখনও নারীদের ধমীয় বিধান শিথিল করার আন্দোলন করতে হচ্ছে, কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট সমাজ করতে হচ্ছে না। ক্যাথলিকদের কাছে যৌন-স্বাধীনতা এখনো অতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথচ সুইডেনের মতো দেশে দু দশক আগে সেটাই ছিলো নারীবাদী আন্দোলনের একটা প্রধান বিষয়। বাঙালি নারীবাদীদের কাছেও যৌনস্বাধীনতা এখনো তেমন প্রাসঙ্গিক নয়, যদিও কালে কালে তা হওয়া অসম্ভব নয়। মুসলমানদের মধ্যেও নারীমুক্তির ধারণা যথেষ্ট বাধার মুখোমুখি হয়েছে।
আবার, পর্দা প্ৰথা থেকে মুক্তি পাওয়া মুসলমান ছাড়া কোনো সমাজেই একটা আন্দোলনের বিষয় নয়। কিন্তু বিরাট মুসলিম বিশ্বে নারীবাদীদের কাছে এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, নারীদের বন্দী করে রাখার যতো উপায় আছে, পর্দা তার প্রধান হাতিয়ার। ধমীয় বিধান দিয়ে যেহেতু একে পালনীয় বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে জন্যে এই বিধান অস্বীকার করে নারীদের মুক্ত করার জন্যে আরও সময় লাগবে বলে মনে হয়। গত পঞ্চাশ বছরে শিক্ষা এবং নারীদের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ফলে সমাজের একাংশে যেভাবে পর্দা খসে পড়েছে, তা থেকে অবশ্য মনে হয়, কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন থাকলেও কালে কালে পর্দা প্রথা থাকবে না। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত হওয়ায় এবং বিশ্বায়নের হাওয়া লাগায়ও আন্তর্জাতিক আবহাওয়া কোনো দেশ অথবা কোনো সমাজই পুরোপুরি ঠেকিয়ে রাখতে পারবে বলেও মনে হয় না। সেদিক দিয়ে মনে হয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বে নারীমুক্তির যে-দৃষ্টান্ত শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপিত হয়েছে, তা রক্ষণশীল সমাজগুলোকেও কমবেশি প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে এবং একদিন নারীরাও পুরুষদের মতো একই অধিকার লাভ করবেন। এবং সে অধিকার লাভের পরই নারীও মানুষ বলে স্বীকৃতি লাভ করবেন। আপাতত পুরুষরা পুরোপুরি মানুষ, নারীরা নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ।
(অন্যদিন, ঈদ সংখ্যা, ২০০৬)
০৭. ধর্ম ও নারী
গত ২৪ শে মার্চ (২০০৪) নিউ ইয়র্কের ইসলামিক সেন্টারে বিনে পয়সার ভোজের সঙ্গে শেখ মোহাম্মদ আল-শরীফ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিলো: বিবাহ এবং তার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক কী। নানা শাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত করে তিনি যা বলেছিলেন, তা সংক্ষেপে বলিতে গেলে হিংটিংছট–বিয়ের সঙ্গে ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই। শুনে কারো কারো একটু খটকা লাগতে পারে। কেউ কেউ বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে স্বীকার করতেই হবে যে, বিয়ে মানে হলো একজন পুরুষের সঙ্গে একজন মহিলার সহাবস্থান, সহবাস! পুরুষপ্রধান ঐতিহ্যিক সমাজের প্রত্যাশা হলো: দিনের বেলা স্বামী বাইরে যাবে, টাকা পয়সা নিয়ে আসবে। তাই দিয়ে সংসার চলবে। আর বৌ ঘরে বসে রান্নাবান্না করবে, সংসারের কাজকৰ্ম্ম করবে, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করবে, আর রাতে স্বামীর সঙ্গে শোবে। তাতে ভালোবাসার কথাটা প্ৰায় অবান্তর। ধান ভানতে শিবের গীত গাইবার মতো। এ যুগের শেখ সাহেবই নয়, প্রাচীন শাস্ত্রকার মনুও এই একই বিধান দিয়েছেন। আসলে সব শিয়ালের একই রা! মনু বলেছেন, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা। অর্থাৎ পুত্র জন্ম দেওয়ার জন্যে বৌ আনা। তা না-হয়ে খাল কেটে কুমির আনে কে? একটা লোকের খাওয়া-পরার জন্যে তো ব্যয় কম হয় না! তদুপরি, তার সঙ্গে মানিয়ে চলতে গেলে কিছু ছাড় তো দিতেই হয়! তা ছাড়া, এটা বিজ্ঞানের কথা— সন্তান জন্ম দিতে ভালোবাসা লাগে না। ধর্ষণ করলে কি গৰ্ভ হয় না?
শেখ মুহাম্মদ আল-শরীফ এবং মনু–দুজনই যা বলেছেন, তা শাস্ত্রীয় আইনের কথা। মনুর বিধান তো রীতিমতো হিন্দুদের কোড অব লাইফ। অমাবস্যা, পূর্ণিমা, একাদশী, ষষ্টী–কবে কুমড়ো খাওয়া যাবে, কবে যাবে না–এ ধরনের বিষয় থেকে আরম্ভ করে কবে যৌন সম্ভোগ করা যাবে, কবে যাবে না–সবই আছে মনুতে। এর চেয়ে কমপ্লিট কোড অব লাইফ আমার জানা নেই। আর থাকলেও, তার কোনো দরকার নেই। আর শেখ মুহাম্মদও যা বলেছেন জেনেশুনেই বলেছেন। তিনি প্রথম যৌবনেই হাফিজ হয়েছেন কোরান মুখস্থ করে। তার পর খোদ মদিনা থেকে ডিগ্রি করেছেন ইসলামী আইন নিয়ে। খৃস্টানরা কি বাদ যান? না, যান না। যুগে যুগে ংস্কার নামক নানা প্ৰক্ষেপ ঢুকে পড়েছে খৃস্টধর্মে। শাখার হিশেবে খৃস্টধর্ম বোধ হয় হিন্দু ধর্মকেও হারিয়ে দিয়েছে। তবু খৃস্টধর্মের সেই বিচিত্ৰ মতের মধ্যেও নারীদের কম কাবু বা কোণঠাসা করা হয়নি। তবে পশ্চিমা দেশের অধিকাংশ নাগরিক চার্চে যান না, সকালে-সন্ধ্যায় প্রার্থনাও করেন না। কাজেই সেখানে মেয়েদের ওপর ধর্মের শাসনটাকে–অন্তত বাইরে থেকে–লোহার শিকলের মতো দুর্ভর মনে হয় না।
ধর্মে ধর্মে দুস্তর ভেদ আছে। এক ধর্মে যা পুণ্যের কাজ, অন্য ধর্মে তা রীতিমতো পাপ বলে বিবেচিত হতে পারে। এক ধর্মে শুয়োর খাওয়া কোনো অন্যায় কাজ নয়, কিন্তু আর-এক ধর্মে শুয়োরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। আবার কোনো ধর্মে সব রকমের মাসং খাওয়াই নিষিদ্ধ। বিচার করে দেখলে ধর্মে ধর্মে এ রকমের অমিল দেখা যাবে। বিস্তর। কিন্তু সব ধর্মেই পুরুষদের তুলনায় নারীদের হেয় করে দেখানো হয়েছে। ধর্মের বিধান অনুযায়ী নারীরা মনুষ্যেতর জীব। তবে সেই জীবটা অন্য মানুষের মতো দেখতে, মানুষের মতো কথা বলে, মানুষের মতো বুদ্ধি রাখে, এমন কি, এই জীবটিকে না-হলে তথাকথিত মানুষগুলোর চলেও না। কিন্তু এই জীবটিকে ছোটো করে তার সীমানার মধ্যে রাখার জন্যে সব ধর্মেই এন্তার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
