নারীবাদীরা ভাষায় যে-লিঙ্গবৈষম্য আছে, তাও দূর করতে চান। ভাষা বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্য করা যায় যে, সব ভাষাই কমবেশি পুরুষশাসিত সমাজের তৈরি। সে জন্যে ভাষায় অনেক শব্দ থাকে যাতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। যেমন, ইংরেজিতে বলা হয়: ম্যান ইজ মর্টাল। এখানে ম্যান বলতে নারীও বোঝানো হয়। মনুষ্যজাতিকে বলা হয় ম্যানকাইন্ড। এখানেও ম্যান অর্থ তাবৎ মানুষ, কেবল পুরুষ নয়। কিন্তু ম্যান শব্দটি পুংলিঙ্গবাচক।
ংলায়ও এ রকমের বহু লিঙ্গবৈষম্যমূলক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন, বাংলায় বলা হয় মানব জাতি–যদিও তার মধ্যে মানবীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্গদেশে এক সময় কন্যাসন্তান এতোই অবাঞ্ছিত ছিলো যে, মেয়ে জন্মালে তাকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য করার জন্যে বলা হতো মেয়েছেলে। সমাস করার সময় সংক্ষিপ্ত শব্দটি আগে এবং লম্বা শব্দটি পরে রাখতে হয়। কিন্তু যেমন রাজপুরুষ। কিন্তু স্বামী এবং স্ত্রী সমাস করলে স্ত্রীস্বামী না-বলে বলা হয়। স্বামীস্ত্রেী। তেমনি বাবামা। এরও কারণ পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে পুরুষ শ্ৰেষ্ঠ, সতরাং ব্যাকরণেও লিঙ্গবৈষম্য বজায় রাখতে হয়। সভা যিনি পরিচালনা করেন তাঁকে বলা হয় সভাপতি। কিন্তু মহিলা সভাপতিকে সভাপত্নী বলা হয় না। নারীবাদীরা এ ভাষার বিরোধী। পশ্চিমা বহু দেশে তাই লিঙ্গবৈষম্যমূলক বহু পরিভাষার পরিবর্তে এখন উভয় লিঙ্গে ব্যবহার করার মতো শব্দ তৈরি হয়েছে। যেমন, সভাপতির বদলে বলা হয় চেয়ার পার্সন। বাংলায় অধ্যাপক শব্দের প্রতিশব্দ তৈরি হয়েছে অধ্যাপিকা। কিন্তু তারপরও বহু শব্দ থেকে যাচ্ছে, যা লিঙ্গবৈষম্যমূলক। যেমন মন্ত্রী। বাংলাদেশের দুজন মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তাদের প্রধানমন্ত্রীই বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শব্দটি শুনতে অবশ্য অতো খারাপ লাগে না। কিন্তু বাংলাদেশে কখনো মহিলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাকে কী বলা হবে, তা চিন্তার বিষয়–নিশ্চয় রাষ্ট্রপত্নী নয়। এ রকমের আর-একটি শব্দ অধ্যক্ষ। অধ্যক্ষা এখনো ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখিনি, যদিও পশ্চিমঙ্গ এবং বাংলাদেশে বহু মহিলা অধ্যক্ষ আছেন।
সবশেষে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নারীবাদীদের লক্ষ্য সব সমাজে অভিন্ন নয়। আফ্রিকার একটা অনুন্নত সমাজে যা প্রাগ্রসর নারীবাদী ধারণা বলে মনে হতে পারে, ইউরোপের একটা উন্নত সমাজে তা আগে থেকেই অর্জিত হয়েছে বলে হয়তো আন্দীে নারীবাদীদের কাছে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হবে না। কারণ, সেটাকেই ন্যূনতম প্রত্যাশা বলে গণ্য করা হয়। যেমন, বিবাহ এবং বিবাহ-বিচ্ছেদের অধিকার।
স্বাধীনভাবে বিবাহ করার অধিকার পুরুষ ও মহিলা–উভয়ের জন্যেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপর। সারা জীবনের সুখ এবং শান্তি নির্ভর করতে পারে। তা সত্ত্বেও পশ্চিমা জগতে এটা কোনো নারীবাদী বিতর্কের বিষয় নয়। কারণ, সেখানে এ অধিকার দীর্ঘকাল আগে থেইে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে এটা এখনো একটা নারীবাদী বিতর্কের বিষয় বলে বিবেচিত হতে পারে। তাই বাঙালি নারীবাদীরা এ সম্পর্কেও আন্দোলন করেন।
এ রকম, নারীদেরও পুরুষের মতোই বিবাহবিচ্ছেদের সমান অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু অনেক সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার যথেষ্ট পরিমাণে নেই। যেমন, খৃস্টধর্ম অনুযায়ী নারী-পুরুষ কারোই এ অধিকার নেই। এখনো ক্যালিকদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ খুবই অবাঞ্ছিত বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু ধর্মীয় এ বাধা সত্ত্বেও ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একটি-দুটি করে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটতে থাকে। ইংল্যান্ডে বিবাহবিচ্ছেদ আইনী সমর্থন লাভ করে সপ্তদশ শতাব্দীতে।
খৃষ্টানদের মতো হিন্দুদেরও বিবাহ হলো দৈব ঘটনা। সুতরাং অবিচ্ছেদ্য। সে জন্যে হিন্দুদের মধ্যেও বিবাহবিচ্ছেদ স্বীকৃত ছিলো না। তবে ১৯৫৫ সালে ভারতে যে-পারিবারিক আইন গৃহীত হয়, সে আইন অনুযায়ী হিন্দু, বৌদ্ধ এবং শিখদের জন্যে এ অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যদিও সর্বক্ষেত্রে নয়। বাংলাদেশের হিন্দুরা দেশের আইন অনুযায়ী বিবাহ করতে পারেন। মুসলমান এবং ইহুদীদের মধ্যে বিবাহ আইনগত চুক্তি, অতএব এ চুক্তি বাতিল করা সম্ভব। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের অধিকার অনেক কম। যেমন, পুরুষরা তিনবার তালাক বললেই বিবাহ ভেঙে যায়, কিন্তু মহিলারা শুধু তালাক বলে বিবাহ ভাঙতে পারেন। না। তার জন্যে তাদের আইনের আশ্রয় নিতে হয়। স্বামীদের কোনো কারণ দেখানোর দরকার নেই, কিন্তু নারীদের দেখাতে হয় শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতন, স্বামীর অন্য যৌনসম্পর্ক অথবা এ ধরনের কোনো কারণ।
যতো দিন সম্ভব ছিলো পুরুষরা ততোদিন নারীদের শাসন এবং শোষণ করেছেন। কিন্তু শিক্ষার বিকাশ এবং অর্থনৈতিক সাবলম্বন লাভের ফলে নারীদের মধ্যে যে-সচেতনতা দেখা দেয়, তা থেকেই নারীবাদের সূচনা। পুরুষ প্রথমত বিশ্বাসই করতে পারেনি যে, নারীরা পুরুষদের মতো মননশক্তির অধিকারী অথবা সংসারের কাজ ছাড়া কোনো কাজ করতে সমর্থ। কিন্তু যখন নারীরা প্রমাণ করলেন যে, তাদের মননশক্তি পুরুষদের মতোই এবং তাঁরা যে-কোনো কাজই করতে পারেন, তখন পুরুষ সমাজ সহজে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। নারীদের তা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আদায় করে নিতে হয়েছে। গোড়ার দিকে এ কাজে কিছু পুরুষও তাদের সহায়তা করেছেন।
