পাকিস্তানের মতো ইসলামী দেশে ধর্ষণ প্রমাণ করার দায় পুরোটাই নারীদের ওপর। তার অর্থ প্ৰমাণ করতে না-পারলে সেই নারী কেবল অপমান সহ্য করতেই বাধ্য হবেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিও পেতে পারেন। পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী যদি চারজন পুরুষ সাক্ষ্য দেন যে, তারা দেখেছেন একজন পুরুষ এক মহিলাকে ধর্ষণ করছে, তা হলেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। অন্যথায় নয়। এর থেকে অন্যায্য আইন হওয়া শক্ত। কিন্তু তবু এ আইন পাকিস্তানে প্রচলিত আছে। এই আইনের বিরুদ্ধে মুখতারান মাই নামে এক ধর্ষিতা নারী যে-অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার জন্যে তিনি সারা বিশ্বের নারীবাদীদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছেন। ধর্ষণের জন্যে মহিলাদের দায়ী করার এই মনোভাব নারীবাদীরা দূর করতে চান ।
নারীদের অধিকার সম্পর্কিত আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌনতা। যৌনকর্ম নারী এবং পুরুষ উভয়ের সমান উপভোগ করার কথা। কিন্তু অল্পকাল আগেও মনে করা হতো যে, নারীদের যৌনতার অস্তিত্বই নেই অথবা এই কর্মে তাদের ভূমিকা নিতান্তই নিক্রিয় এবং এতে তাঁদের তৃপ্তি-অতৃপ্তির কোনো প্রশ্ন ওঠে না। নারীদের যৌনতাকে সাধারণত পাপ এবং নোংরা বিষয় বলে গণ্য করা হতো। ব্যাপকভাবে মনে করা হয় যে, তাদের যৌনতা আছে শুধু পুরুষদের তৃপ্ত করার জন্যে। এ ব্যাপারে পুরুষদের স্বার্থপরতার সবচেয়ে বড়ো দৃষ্টান্ত আরবী ভাষী এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে লক্ষ্য করা যায়। এই দেশগুলোতে মেয়েদের যৌনাঙ্গের একটা অংশ (ক্লাইটারিস) কেটে ফেলে খতনা দেওয়ার নিয়ম এখনো ব্যাপকভাবে চালু আছে। এসব দেশ থেকে যারা পশ্চিমে চলে এসেছেন, তারা সেসব দেশেও গোপনে গোপনে এই রীতি অনুসরণ করেন বলে অনেক সময়ে জানা যায়। এভাবে খতনা করলে মেয়েদের যৌনসুখ অনুভব করার ক্ষমতা অনেকাংশেই হ্রাস পায়। ফলে নারীকে তৃপ্ত করার দায় থেকে বীর পুরুষরা অব্যাহতি পান।
বস্তৃত, মানব সভ্যতার গোড়া থেকেই বহু নারী সারাজীবনে হয়তো কখনোই সত্যিকার যৌনসুখের স্বাদ পেতেন না। কিন্তু তা নিয়ে তাদের মধ্যে তেমন সচেতনতা অথবা অভিযোগ ছিলো না। তারা যা পেতেন, মনে করতেন, সেটাই স্বাভাবিক এবং তাই নিয়েই সুখী থাকতেন। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল বাজারে চালু হওয়ার পর তাঁদের মধ্যে এ সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পায়। কারণ তারা গর্ভের আশঙ্কা না-করেই যৌনকর্মে অধিকতর অংশ গ্রহণের সুযোগ পান। তা ছাড়া, পিলের দৌলতে মেয়েরা প্ৰথম বারের মতো যৌনস্বাধীনতার আস্বাদও লাভ করেন। এর ফলে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন অভিজ্ঞতাও বৃদ্ধি পায়। চিরাচরিত সতীত্বের মাপে এটাকে যেমনই মনে করা হোক না কেন, এ থেকে কোনো কোনো নারী তুলনা করেও যৌনসুখের মান বিচার করার সুযোগ পান।
যারা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতার স্বাদ পাননি, তাঁরাও ১৯৫০-এর দশক থেকে উন্নতমানের যৌনবিজ্ঞানের বই পড়ে নারীদের যৌনতা সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানতে পান। এ বিষয়ে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত অ্যালফ্রেড কিন্সলির সেক্সয়াল বিহেবিয়ার ইন দ্য হিউম্যান ফিমেইল এবং উইলিয়াম মাস্টার্স ও ভ্যার্জিনিয়া জনসনের হিউম্যান সেক্সয়াল রেসপন্স (১৯৬৬) রীতিমতো পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সত্যিকারের জনপ্রিয়তা লাভ করে অ্যালেক্স কমফর্টের দ্য জয় অব সেক্স (১৯৭২)। এই গ্রন্থটি প্রকাশের পর ৭০ সপ্তাহ ধরে তা বেস্টসেলারের তালিকায় ছিলো। এসব বই থেকে নারীরা পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে, তারাও পুরুষদের সমান যৌনসুখ পেতে পারেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নারীরা যে-অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন লাভ করেন, তাও তাদের অধিকতর স্বাধীনচেতা করেছিলো। এসবের মিলিত ফল হলো: ১৯৬০-৭০-এর দশক থেকে যৌনস্বাধীনতার প্রসার।
সচেতনতা লাভের ফলে নারীবাদীরা নারীদের যৌনতার ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরতে চান। বহু শতাব্দী ধরে এ সম্পর্কে পুরুষ সমাজে যে-একপেশে এবং স্বার্থপরতার মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিলো, তাঁরা তার স্বরূপ উন্মোচন করেন। যৌনতার বিষয়ে পুরুষ সমাজে যে-দ্বৈত মূল্যবোধ রয়েছে, তাঁরা তারও সমালোচনা করেন। তাঁরা বলেন যে, পুরুষরা যৌনবিষয়ে সক্রিয় হলে তার কোনো বদনাম হয় না, বরং সেটাকেই স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করা হয়। অপর পক্ষে, কোনো নারী যৌনতার ব্যাপারে উৎসাহী এবং সক্রিয় হলে তাকে চরিত্রহীন, বেশ্যা, ছেনাল ইত্যাদি বলে নিন্দা করা হয়। এই বৈষম্য এবং ভণ্ডামি দূর করা নারীবাদীদের একটি বড়ো লক্ষ্য। পুরুষরা তাঁদের নিজেদের বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক রাখাকে প্রায় নির্দোষ বলে গণ্য করেন, কিন্তু তাদের স্ত্রীদের কাছ থেকে শতকরা এক শো ভাগ সতীত্ব দাবি করেন।
এই রকমের ভণ্ডামির আরও দৃষ্টান্ত হলো পুরুষমুখী সমাজে পুরুষের ভুল-ত্রুটি, অন্যায়কে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হয়, কিন্তু নারীদের নয়। যেমন, কোনো পুরুষ অসঙ্গত অথবা ক্রুদ্ধ আচরণ করলে তার কারণ ব্যাখ্যা করে হয়তো বলা হয় যে, কোনো কারণে তার মেজাজ ভালো ছিলো না, অথবা সে মানসিক চাপের মুখে ছিলো। কিন্তু মেয়েরা এমন আচরণ করলে সমাজ তা সহানুভূতির চোখে দেখে না। কোনো ছেলে বদমায়েসি করলে অথবা, ধরা যাক, কোনো মেয়ের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করলে তার তেমন নিন্দা হয় না–বরং ছেলেরা আমনই হয় বলে তার সাফাই গাওয়া হয়, কিন্তু মেয়েরা একই ধরনের কিছু করলে সমাজে তার অনেক নিন্দা হয়। এমন কি, কোনো পুরুষ কর্মস্থানে দক্ষতা দেখালে সেটাকে তার স্বাভাবিক ক্ষমতা এবং সামর্থ্যের বহিঃপ্রকাশ বলে বিবেচনা করা হয়; অপর পক্ষে, কোনো নারী দক্ষতা দেখালে তাঁকে ন্যায্য কৃতিত্ব দেওয়া হয় না। বরং তাঁকে কেউ সাহায্য করেছে অথবা দৈবক্রমে তিনি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বলে তার কাজকে ছোটো করে দেখা হয়। নারীবাদীরা এই মনোভাবও আমূল বদলে ফেলতে চান।
