তাকে দেখে রোকেয়া ও তার নানার বাড়ির সবাই অবাক। রোকেয়া সালাম দিয়ে কদমবুসি করে জিজ্ঞেস করল, নানাভাই কেমন আছেন? নানি কেমন আছেন? তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসলেন না কেন?
আনসার উদ্দিন সালামের উত্তর দিয়ে দোয়া করে বললেন, আমরা সবাই ভালো আছি। আর তোমার নানিকে নিয়ে আসার কথা যে বললে, সে কেন আসবে? সে মেয়ে মানুষ, আর তুমিও মেয়ে মানুষ। তেমাকে দেখে সে ইন্টারেস্ট পাবে না। তুমি নাত জামাই হলে অন্য কথা ছিল।
রোকেয়ার মামাতো বোন মনোয়ারা বলল, আপনি তাহলে নাত-বৌকে দেখে ইন্টারেস্ট উপভোগ করতে এসেছেন?
এই কথায় সবাই হাসতে লাগল। আনসার উদ্দিন হাসতে হাসতে বললেন, তোমার পরিচয়টা পেলে উত্তর দিতে সুবিধে হত।
রোকেয়া বলল, ও মনোয়ারা, আমার মামাতো বোন।
আনসার উদ্দিন একবার মনোয়ারার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, অপূর্ব।
রোকেয়া বলল, কি অপূর্ব?
আনসার উদ্দিন বললেন, কি অপূর্ব, তা তোমার বোঝা উচিত ছিল। যখন বুঝতে পারছ না তখন আমিই বলি, মনোয়ারা বিবিকে দেখে তোমার প্রতি আমার ইন্টারেস্ট চলে গেল। এবার থেকে ওকেই দেখতে আসব।
উনার কথা শুনে আবার সবাই হাসতে লাগল। মনোরা হাসি থামিয়ে বলল, বেল পাকলে কাকের কি?
আনসার উদ্দিন বললেন, তোমার কথা অবশ্য ঠিক। তবে ঐ যে লোকে বলে, খাওয়ার চেয়ে দেখা ভালো। তারপর রোকেয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি ভাই আবার মনে কষ্ট নিও না। তুমিও অপূর্ব। তোমাদের দুজনকে দেখে সমান ইন্টারেস্ট পাচ্ছি। এখন বল, হারুন তোমাকে বেশি ভালবাসে, না আমি তোমাকে বেশি ভালবাসি? আর আমাদের দুজনের মধ্যে কাকে তুমি বেশি ভালবাস?
রোকেয়া হাসতে হাসতে বলল, আপনারা দুজনে আমাকে যেমন সমান সমান ভালবাসেন তেমনি আমিও আপনাদের ভালবাসি।
আনসার উদ্দিন বললেন, উঁহু, উত্তরটা ঠিক হল না। আমি বেশি ভালবাসি। তাই এই বুড়ো বয়সে প্রতি সপ্তাহে তোমাকে হারুনদের বাড়িতে দেখতে যাই। আজ সেখানে না পেয়ে তোমার বাপের বাড়িতে এসেছিলাম। সেখানেও না পেয়ে এখানে অনেক কষ্ট ভোগ করে এসেছি। আর হারুন তো সেই যে গেল এতদিনের মধ্যে একদিনও এল না।
রোকেয়া হাসি চেপে রেখে বলল, আসবার রাস্তা থাকলে প্রতিদিন আসত।
আনসার উদ্দিন হাসতে হাসতে বললেন, তোমরা আজকালের মেয়ে। তোমাদের সাথে কি আর যুক্তি তর্কে পারব ভাই।
নাস্তা খেয়ে তিনি চলে আসতে চাইলে, রোকেয়া ছাড়ল না। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে বিকেলে চা খাইয়ে তবে ছাড়ল।
শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের ভালবাসা পেয়ে রোকেয়া শাশুড়ীর শত লাঞ্ছনা গঞ্জনা ভুলে যায়। তার উপর হারুন প্রতি মাসে তিন-চারখানা করে চিঠি দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেয়। এতকিছু সত্ত্বেও রোকেয়ার এমন দিন কাটেনি, যেদিন সে শাশুড়ীর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা খেয়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়নি। হনুফা বিবি বৌয়ের সঙ্গে মিষ্টি মুখে কথা বলা তো দূরের কথা, নরম মেজাজে ও বললেন না। সব সময় রুক্ষ্ম মেজাজে বলেন।
রোকেয়ার বড় ভাই জাভেদ এক বছর পর বিদেশ থেকে এসে রোকেয়াকে নায়ারে নিয়ে এল। রোকেয়ার বিয়ের সময় সে দেশে ছিল না।
রোকেয়া মা বাবাকে সালাম করে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
মেহেরুন্নেসা মায়ের মুখে বিয়ের দিনের রোকেয়ার শাশুড়ীর ব্যবহারের কথা শুনেছিলেন। এখন মেয়েকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোর শাশুড়ী কি তোর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে?
রোকেয়া ভাবল, সত্য কথা বললে মা-বাবা মনে খুব ব্যথা পাবে। কান্না থামিয়ে চোখ মুখ মুছে বলল, না মা, তিনি তেমন কিছু বলেন না। তোমাদের জন্য প্রাণ জ্বলছিল তাই।
রোকেয়ার নানি রহিমন বিবি দুদিন হল মেয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন। তিনি এতক্ষণ সেখানে ছিলেন না। এই মাত্র এলেন। রোকেয়া তাকে সালাম করতে দোয়া করে বললেন, তুই যে বললি, তোর শ্বাশুড়ী তোকে কিছু বলে না, কথাটা কি ঠিক? তুই না বললেও আমরা জানি। বিয়ের দিনে তোর শাশুড়ী যে কষ্ট দিয়েছে এবং যেসব কথা বলেছে, তাতেই বুঝেছি সে কি রকম মেয়ে। সেই দিনই বুঝতে পেরেছি তোকে চিরকাল অশান্তি ভোগ করতে হবে। তারপর মেয়ে জামাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমিও তোমার শ্বশুর আজিজের কথায় এই কাজ করে খুব অন্যায় করেছি। আর তাকেই বা দোষ দেব কি? সে তো আর হারুনের মায়ের স্বভাব জানত না, হারুনকে জানত। তবে হারুন খুব ভালো। সে দেশে থাকলে আলাদা কথা ছিল। ওর শাশুড়ী খুব জঘন্য ধরনের মেয়ে। তার মত মেয়ে আমি আর দেখিনি।
শাহেদ আলী বললেন, কি আর করার আছে আম্মা। লোকে যে বলে, জাতের সাপ গর্তে মজে, আর অজাতের সাপ ছোবল মারে। রোকেয়ার শাশুড়ীর কথা শুনে তার প্রমাণ পেলাম। তারপর মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন, শোন মা রোকেয়া, তোর শাশুড়ী তোর সাথে যতই খারাপ ব্যবহার করুক না কেন, কোনোদিন তার কথার উত্তর করবি না। আর রাগ করেও থাকবি না। নিজের মায়ের মত মনে করবি।
মেহেরুন্নেসা মেয়েকে এক সময় কাছে বসিয়ে বুঝিয়ে বললেন, তোর শাশুড়ী তোর উপর যতই অত্যাচার করুক, তবু তুই রা করবি না। ছোটলোকের মেয়ের মত তার সাথে ঝগড়া করে বাপ-দাদার মুখে চুন-কালি দিবি না। জেনে রাখ মা, মানুষ মাটির উপর কত অত্যাচার করে, কাটে, পিটায়, বাড়িঘর করার সময় কত কিছু করে। তবু মাটি কোনো প্রতিবাদ করে বলে না, কেন তোমরা আমার উপর এত অত্যাচার করছ? কেন বলতে পারে না জানিস? তার কথা বলার মুখ নেই বলে। তেমনি তুইও মাটির মত থাকবি।
