ইতি
তোমারই পাগল হারুন।
রোকেয়া চিঠিটা দুতিনবার পড়ল। প্রতিবার পড়ার সময় চোখের পানিতে বুক। ভাসাল। পড়ে যেন তার তৃপ্তি মিটছে না। যতবার পড়ে ততবার পড়তে ইচ্ছা হয়। তারপর চিঠির উপর অসংখ্যবার চুমো খেয়ে বালিশের তলায় রেখে দিল। এখনি চিঠির উত্তর লেখার জন্য তার মন উতলা হয়ে উঠলেও মনকে শক্ত করে রুম থেকে বেরিয়ে এল। ভাবল, বেশিক্ষণ রুমে থাকলে শাশুড়ী দুনিয়া ফাটিয়ে ফেলবে। রাতে ঘুমোবার আগে লিখবে ভেবে সংসারের কাজে মন দিল।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর রোকেয়া স্বামীর চিঠির উত্তর লিখতে বসল।
ওগো আমার প্রাণপ্রিয় স্বামী,
প্রথমে তোমার পবিত্র কদমে শতকোটি সালাম জানাচ্ছি। তারপর ভালবাসার সন্দেশ পাঠালাম। গ্রহণ করে ধন্য করো। আশাকরি আল্লাহ পাকের রহমতে তুমি ভালো আছ। আমিও তাঁরই করুণায় ভালো আছি। বাড়ির অন্যান্য সব সংবাদ কুশল জানিবে।
প্রিয়তম, তোমার চিঠি পড়ে যে কত আনন্দ, কত সুখ ও শান্তি পেলাম, তা আল্লাহ পাক জানেন। আমার কলমের অত শক্তি কি আছে যে তোমাকে তা লিখে জানাব? চিঠির মধ্যে যে এত মধু থাকে তা আগে কোনোদিন জানতাম না। চিঠি পড়ার সময় অনাবিল এক খুশির আমেজে সমস্ত তনুমন শিউরে উঠেছে। ওগো জীবন সর্ব, তোমার প্রতি আমার ভালবাসার কোনো সীমা নেই। হৃদয় উজাড় করে তোমাকে ভালবেসেছি! বাপের বাড়ির অনাহূত ফুল আর আমি নই। তোমার হাতে আল্লাহ পাকের ইশারায় আমি দলিত ও মথিত হয়েছি। আমি বড় ভাগ্যবতী মেয়ে। তোমার মত স্বামী পেয়ে আমি ধন্য। সত্যি প্রিয়তম, তোমাকে একদণ্ড ভুলে থাকা আমার পক্ষে কোনোকালেও সম্ভব নয়। অতীতের মধুময় সময়গুলোর কথা মনে পড়লে একদিকে যেমন খুব. আনন্দ পাই, অপরদিকে তেমনি দুঃখে ও বেদনায় মনটা কেঁদে উঠে। যে স্বামীর সঙ্গে দিনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি। সে আজ কোথায় কোন সুদূর বিদেশে। আবার কবে সেই মধুময় দিন ফিরে আসবে তা আল্লাহপাককে মালুম। প্রিয়তম, ঘন ঘন চিঠি দিয়ে এই তাপতীর প্রাণ শীতল করো। একা একা আমার মোটেই ভালো লাগছে না। একটা দুঃখ ও শূন্যতা আমাকে সব সময় গ্রাস করে রেখেছে। লক্ষ্মীটি বল, কেন তুমি আমাকে এভাবে একা ফেরে গেলে? বিদেশের মায়ায় আমাকে ভুলে আছ কি করে?
মনের অস্থিরতায় ও আবেগে এবং বিরহ জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেক কিছু লিখে তোমার কাছে হয়তো অপরাধী হয়ে গেলাম। স্ত্রী মনে করে স্বামীগুণে ক্ষমা করে দিও। আল্লাহপাকের কাছে তোমার সার্বিক মঙ্গল কামনা করে এবং পরিশেষে তোমার পুরুষ্ট ওষ্ঠে কয়েকটা কিস দিয়ে বিদায় নিলাম। আল্লাহ হাফেজ।
ইতি
তোমার পাগলী রোকা।
হারুন বিদেশ যাওয়ার আগে বেশ কয়েকটি এয়ারমেল খাম টিকিটসহ কিনে ঠিকানা লিখে রোকেয়ার হাতে দিয়ে বলেছিল, আমাকে চিঠি দিতে তোমার যেন কোনোরকম অসুবিধে না হয়, সেই জন্যে নিয়ে এলাম। রোকেয়া সেগুলো নিজের বাক্সে রেখে দিয়েছিল। রাত্রে চিঠি লিখে পরের দিন হোসেনকে দিয়ে পোস্ট করাল।
হারুন বিদেশ চলে যাওয়ার দুমাস পর একদিন রোকেয়ার এক চাচি শাশুড়ী রোকেয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, বৌমা তুমি কি পোয়াতী?
রোকেয়া লজ্জা পেয়ে কিছু বলতে পারল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
উনি আরো দুতিনবার জিজ্ঞেস করার পরও রোকেয়া লজ্জায় বলতে পারল না।
তখন উনি বললেন, বৌমা, তুমি যদি কিছু না বল, তাহলে আমরা বুঝব এই সন্তান হারুনের নয়।
এই কথা শুনে রোকেয়ার জ্ঞান হারাবার উপক্রম হল। কোনো রকমে সামলে নিয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হারুন জানে?
রোকেয়া আবার মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ জানে।
উনি বললেন, তোমার শাশুড়ী আমাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিল; তাই করলাম। আমার উপর তুমি যেন আবার মনে কষ্ট নিও না। এই কথা বলে তিনি চলে গেলেন।
রোকেয়া বসে বসে চোখের পানি ফেলতে লাগল। এতদিনে সে বুঝতে পারল, একমাত্র শাশুড়ী ছাড়া এ বাড়ির সবাই তাকে ভালবাসে। দেবররাও তাকে ভালবাসে। মেজ দেবর শামসু বড় ভাইয়ের বিয়ের সময় দেশে ছিল না। বড় ভাই বিয়ে করেছে জেনে ভাবিকে আলাদা করে চিঠি দিয়েছে। সেই সঙ্গে কিছু টাকাও ভাবির নামে পাঠিয়েছে। অন্যান্য দেবররা ভাবিকে এটা সেটা কিনে দেয়। রোকেয়ার নানা শ্বশুর আনসার উদ্দিন প্রতি সপ্তাহে একবার নাত বৌকে দেখতে আসেন। সে গর্ভবতী হয়েছে জানার পর কোনোবারে চাটনি, আবার কোনোবারে আচার কিনে নিয়ে আসেন। কোনো সময় এসে যদি দেখেন রোকেয়া বাপের বাড়ি গেছে, তাহলে তিনি রোকেয়াকে দেখতে সেখানে যান। একবার রোকেয়া বাপের বাড়ি থেকে নানার বাড়িতে বেড়াতে গেল।
আনসার উদ্দিন মেয়ের বাড়িতে এসে শুনলেন, রোকেয়া বাপের বাড়িতে গেছে। তখন তিনি সেখানে গেলেন।
রোকেয়ার ছোট বোন জুলেখা পান সরবত দিয়ে বলল, মেজ আপাতত এখানে নেই; নানার বাড়ি গেছে।
আনসার উদ্দিন রসিকতা করে বললেন, সে গেছে তো কি হয়েছে, আমি তাকে নিতে আসি নাই; তোমাকে নিতে এসেছি।
জুলেখা ওঁর রসিকতা বুঝতে না পেরে ভয় পেয়ে সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল।
আনসার উদ্দিন হাসতে হাসতে রোকেয়ার আব্বা শাহেদ আলীকে বললেন, তোমার মেয়ের কাণ্ড দেখ, আমার কথায় ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। তারপর তিনি রোকেয়ার নানার বাড়িতে গেলেন।
