তোমার মনে পড়ে, সেইবার ঘুটঘুটিয়ার জঙ্গলে পিকনিকে যখন যাই তখন তুমি হুপপী (কাঠ ঠোকরার মত দেখিতে এক রূপ সাদা কাল মিশ্রিত পাখী), দেখিতে চাও আমরা সুঘরাইকে কাজের। সাহায্যে রাখিয়া বহুদুর চানোয়ার তীর ধরিয়া পূর্বদিকে যাই! বেশ সময় বাদে, আমরা যখন ফিরিয়া আসি, তখন তুমি ভৃত্যকে না দেখিয়া উতলা হইয়া যাহারা রান্না তদারক করিতেছিলেন (অনেক চেঞ্জার এই পিকনিকে মিলিত হইয়াছিলেন) তাহাদের তুমি প্রশ্ন কর!
তাঁহারা কেহই, তাহার সংবাদ দিতে পারিলেন না, তুমি বড়ই শঙ্কিত যুগপৎ অপ্রসন্ন যে তোমার অনুপস্থিতিতে কেহ যদি বেচারীকে ডোম বলিয়া ছোট করিয়া থাকে, খেদাইয়া থাকে, রান্নার কাছ হইতে তুমি আমাদের অন্য ভৃত্যদের ও অন্য চেঞ্জার বাড়ীর বালকদের তাহার খোঁজ করিতে বলিলে।
তখন, তাহার নামে বন চমকাইতে লাগিল! অজস্র প্রজাপতি পার হইয়া অনেক গভীরে সেই ডাক প্রচারিত, এমত সময় মূর্তিমানের উদয় হইল, হাতে খাঁচা দেখিয়া তুমি তাহারে চিনিলে! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া জিজ্ঞাসিলে, মুখপোড়া জানোয়ার কোথায় ছিলি…এই ভয়ঙ্কর বন, তোর কি কোন ভয় ডর নেই র্যা…
আজও আমার মনে আছে, জানোয়ার মৃদুহাস্যে উত্তর করিল, মা গো, কোন ভয় করিবেন না, আমার জন্য এখানে–এই দীপ্তিময়ী বনে আপনকার কোনই শঙ্কার কারণ নাই…এবং অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করত কহিল, মাগো জানিবেন, মহতী বনস্থলী আমার গা শুকিয়াছে…।
যে এবং ইহা প্রকাশিয়া সুঘরাই সমস্ত লতা গুল্ম পত্রবিকাশের, পক্ষী রবে ছন্দিত যাহা, ঐশ্বৰ্য্যময়ী যাহা, তাহারই পানে সগর্বে নির্ভীকতায়ে মস্তক সঞ্চালনে দেখে–কি এক অহংতা এখন তাহাতে যে এবং সে কেমন এক শব্দ করিল আর যে সমস্ত বন ব্যাপিয়া নিথর প্রতিধ্বনি ঘটিল।
যে ইহা শ্রবণে তুমি নিশ্চল, এমনও যে ঐ বাক্যে স্বভাববশত স্বীয় কপালে ভক্তিভাবে হাত স্পর্শ করিতে ভুলিয়াছিলে! তখন আমরা দুজনেই হারামজাদার প্রভায় আচ্ছন্ন! অবশ্য অন্যান্যরা সারিবদ্ধভাবে যাহারা তাহাকে আধা ঘিরিয়া ছিল, তাহারা হাস্য করে, কিন্তু হঠাৎ তখনই বৃক্ষ পত্র খসিতে তাহারাও ঈষৎ থ!
শুধু জগুর পিসিমা, তিনি খানিক দোক্তা মুখে ফেলিতে, তাঁহার বাহুতে আড়াই প্যাঁচ সাপ মুখো, সাপটির চোখ চুনীদার, তাগা পরিলক্ষিত হইল, ইনি সাহসে মনিব পত্নীকে সম্বোধনে কহিলেন, ওগো বৌমা, বলি শোন, আমার পঞ্চা যখন পেটে তখন একবার ননদ বাড়ী যাই–তখন তাহাদের ঘাটে একজন একজনকে বলিতেছে শুনিয়াছি, যে সেই বলে না–
গরুর কুটুম চাট্লে চুট্লে
কুকুরের কুটুম শুঁকলে শাঁক্লে
মানুষের কুটুম্ এলে গেলে।
…তা তোমার সুঘরাইএর গাত্র শুকিবে না?…
ইনি সেই জগুর পিসিমা যিনি, ‘…’ নিবাসে-তে আগত চেঞ্জার ঘোষবাবুর পুত্রের, যে ছেলেটি বিশেষত ধরাগলায় নবযৌবনা যাহারা তাহাদের সমক্ষে, সৌন্দর্য্যের স্তুতি করার বহর স্মরণে, বিরক্তিতে বলে যাচ্ছিলেন,–ওমা সেদিন ভোর থাকিতে আমরা, আমি, মিনি, রাধা, নিভা, ইতি, চায়নারে লইয়া সিরিয়ার পাহাড়ে বেড়াইতে গিয়াছি, দেখি, ঘোষেদের সুপুত্র ছোঁড়াকে, আমারে দেখিয়াও, ঘোর কলি কি বলবি মাইরি, কোন হৃক্ষেপ নাই, খালি ব্যাখান…ইহা উহা সব কিছু সুন্দর, আবার বলিল, সঞ্জীববাবু না কে লিখিয়াছেন…ঝাড় মারি! সোমত্ত মেয়ে সব সঙ্গে লাজলজ্জা নেই, আমি বলি ছোঁড়া তোমাকে ছাড়া পৃথিবীটা…মরণ! লোকে আমায় আনকাচ্চার বলে বলুক, এত সুন্দরের কি দরকার!…ও ছোঁড়ার মনে পাপ আছে!
একদা আবার এই পিসিমাই তাঁহার ভাই-বৌ রাধা’র মাকে সঙ্গে লইয়া ‘…’ বাবুর বাড়ী পান্থপাদপ গাছ দেখিতে গিয়াছিলেন। সেখানে বেচারী রাধার মাও সুমহৎ বৃক্ষ সমক্ষে কম্পিত, রোমাঞ্চিত, তাহাতে ভাবান্তর, তাহাতে ঐ রমণীতে রাত্র সমাগত! তদীয় মুখমণ্ডলে আরক্তিম নাসাপুট অতীব জবা হইল, ননদিনীকে কোনক্রমে কহিলেন,…দিদি এই পান্থপাদপ অবলোকনে আমার দেহমনে এক। আলোড়ন সঞ্চারিত হইতেছে, এক অভিনব পুলক ঝাঁপটা দিয়া উঠিতেছে, এমন একটি সুকৃতির সন্তান। আমাতে আসে, সত্যই জন্ম সার্থক হয়! ইহাতে ঐ সরল বাক্যের সহিত রাধা’র মা-র ঘন শ্বাসের শব্দ প্রাচীরে প্রাচীরে লাগিয়াছে।
ইহাতে জগুর পিসিমা ভূতচালিতপ্রায় হাঁ হাঁ করিয়া উঠিয়া ভর্ৎসনায়ে বলিলেন,-ছ্যা ছ্যা মরণ দশা, গাছ দেখিয়া তোমার ভাব লাগিল যে, এই সেদিন না বিয়াইলি, আবার? তাহার শেষেরটির নাম রাখিলে চায়না…আগেরটি ইতি, তারপরও চায় না, আবার?–আর যে ইনি গল্পচ্ছলে পান্থপাদপ সম্বন্ধে এই মত নিম্ন স্বরে ব্যক্ত করেন যে, সত্যই বাপু…গাছটা যেন মরদপানা! এবং ইহা প্রকাশে তিনি বস্ত্র সংযত করার পরে ঘোমটায় ঠিক দিয়াছিলেন।
৪. জগুর পিসিমার ছড়া কাটাতে
…জগুর পিসিমার ছড়া কাটাতে, যুক্তিতে, আমরা দুইজনে সুঘরাই হইতে সেই বিরাট বনস্থলীর প্রতি দৃষ্টি সঞ্চার করিলাম, এ বন দৃঢ়–পশু যেখানে পদে পদে পথে বাধা সৃষ্টি করে। ক্রমান্বয় আরোহী কল্পনা! দেখিলাম কুহক, আমরা বুঝিতে প্রয়াসী হইলাম, দেখিলাম হস্তী-দন্ত নির্ম্মিত রমণী, যিনি কহিলেন,–শত পুত্র গর্ভে ধরিলেও আমি কুমারী। এমনও যে কুড়লের আওয়াজ আমাদের চীনে বুলবুলির ডাক বলিয়া ভ্রম হইল, এ বনভুবঃ কুমারী যে! দূর হইতে ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয়া বন্দুকের আওয়াজ আসিল, আমাদের দ্বারা বিবেচিত হইল, কোন পশুর (মিলন ইচ্ছা স্বর) মেইটিং কল!
