খণ্ডিত পত্র সকল উড়িতেছে, দ্রুত পদক্ষেপে তাহারা আছে এখন তাহাদের বসন চেহারায় যেমন পাথর নির্ম্মিত, এইভাবে ক্রমে তাহাদের বসন পাংশু মলিন বর্ণ ধারণ করিল, তাহারা প্রেক্ষাগৃহের একুসটিকে নূতন বর্ণাঢ্য সংজ্ঞা তথাপি দিল। তাহারা সংগৃহীত খণ্ডিত পত্রগুলির চারি দিকে চক্রবৎ ঘুরিল, এবার তাহারা সজল নয়নে একদা সুমহৎ বৃক্ষের সন্নিধানে গেল, ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া লতা ছিন্ন করিল এবং লতা দিয়া পরম রমণীয় এক সাজি নির্ম্মাণ করিল–কি আজব! কি কুহক! বিজোড় না হইলে চুপড়ি আধার অসম্ভব! চুপড়ি টুকরী ধামা–সবই বিজোড় বন্ধন!
তাহারা বেদনায় ঝঙ্কারিল, আমরা কোথাও বিজোড়, আমরা কোথাও বিজোড়! সাজিতে খণ্ডিত পত্রসকল রাখা হইল, এখন তাহারা শোভাযাত্রা করিয়া চলিল; অন্ধকার হইল, তাহাদের হাতে মশাল, তাহারা চলিতেছে দিকাভিমানী দেবতা সকল মুগ্ধ প্রীত হইলেন; তুমুল বরষণ হইল, তাহাদের মশাল নিভিল না, তাহারা ধীরে প্লাটিক (মনুষ্য) অঙ্গের সীমা অতিক্রম করিল, সম্মুখে বনরাজি, ক্রন্দনই তাহাদের নির্ভীকতা, সম্মুখে বনরাজি।
সেই বনস্থলী অলৌকিক, শিশুর হাততালিই এখানে পুষ্প, অপেক্ষমানারনয়নই ফল। এবং তাহারা সেই বনে আনীত খণ্ডিত পত্ৰসকল ছড়াইয়া দিল, বারম্বার কহিল, এই পত্র যদি সত্যযুগের হয় তাহা হইলে শূন্যস্থান ইহার পূর্ণ হউক! বনস্পতি নিশ্চয় শুনিলেন! নিথর বনভূমি! শুধু শ্রুত হইতেছিল সেই বনের পূর্বাঞ্চলে কোন গৃহাভিমুখী কাঠুরিয়ার দল কোন গীতের এক ছত্রই–এখনও অন্তরার বিবর্তন হয় নাই বার বার গাহিতেছে! সকলেই খণ্ডিত পত্র বাহকরা ভক্তিযুক্ত মনে দণ্ডায়মানা, আরক্তিম চোখে প্রতীক্ষায়।
এমত কালে সম্মুখের ঝোঁপ জ্বলিয়া উঠিল।
…অনেকটা তেমনিভাবে…মনে পড়ে যেমন দাবদাহর সূত্রপাত আমরা সেই হাজারীবাগ অঞ্চলে জায়নোফর বনে যেমন দেখি, উঃ কি দারুণ নয় সেই গাইডটা, নির্জন বনের মধ্যে অদ্ভুতভাবে মুখে হাত দিয়া দারুণ প্রলুব্ধকারী ডাক দিতে থাকিয়া হঠাৎ তর্জ্জনী সঙ্কেতে এক ঝোঁপ দর্শাইয়া ফিসফিস্ স্বরে জানাইল, খসখস ফট! শব্দ! শিকার!
আমিও শিকার ভাবিয়া বন্দুক তুলিলাম, পরক্ষণেই সেখানে ধিক ধিক অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইল, আশ্চৰ্য। ধূমহীন একেবারে…ক্রমাগতই শিখা, গাইড সেইভাবে তখনও তাহার চক্ষুৰ্বয়ে ধন্ধ! আমি জলের বোতলের প্রতি নির্বোধের ন্যায় তাকাইলাম, ইস!…তারপর সেইদিন তোপচাঁচির বাঙলায় আমরা মনমরা, আমরা অবসন্ন…ভাগ্যে সেখানে আশ্চর্য্য যে খাদ্যের পাত্র সার্ভিস সবই রূপার নির্ম্মিত। তুমি সন্দেহে হল-মার্ক দেখিলে, কহিলে নিশ্চয় মেপিন এণ্ড ওইয়েব…বেশ পুরাতন ও লেইট ভিক্টোরিয়ান রৌপ্য।
–আঃ আমরা সেই ওবজে দ’আর (object d’art) পাত্রে ভোজন করিলাম, এসপারাগ্যাস সুপ ভুলিবার নহে, আমরা অনেক অনেক বাড়ী বাসনপত্রের গল্প করিতেছিলাম, তাহার পর, তাহার পর…হ্যাঁ ওইসটার না কি একটা খাইবার সময়…আমি মস্ত হাঁ করি, না না বিশ্রীভাবে চিবাইতে দাঁত দেখা যাইতেছিল, তুমি অবাক হইয়া আমারে সাবধান কর, কাঁটা ছুরির অজস্র শব্দ করিয়া থাকি, তুমি অবাক হইয়া আমায় সাবধান কর। কেননা, উহা ত ঘটিবার নহে।…ওবজে দ’আর-এ আমরা কি সেই দাবদাহ। সূত্রপাত ভুলিয়াছিলাম?…কিন্তু দেখ ভুলি নাই…।
ঠিক তেমনই ঐ বনের ঝোঁপ জ্বলিয়া উঠিল। যাহারা খণ্ডিত পত্র লইয়া আসিয়াছে তাহারা তৎপ্রবর্ত্তীত নতজানু হইল।
প্রজ্জ্বলিত ঝোঁপ হইতে এক কিশোর সুন্দর বনদেবতা দেখিতে সুঘরাইএর মত এক অভিনব চমৎকার ফড়িং দৰ্শাইয়া কহিলেন,–ইহা কি সেই?
তাহারা সভয়ে উত্তর দিল, প্রভু উহা তাম্রবর্ণের যে! তুমি ভাল জান!
তখন বনদেবতা অদৃশ্য হইলেন, কিয়ৎ পরেই তিনি হীরকপ্রভ এক শম্বুক দেখাইলেন, কহিলেন, ইহাই কি সেই?
তাহারা সভয়ে উত্তর দিল,–প্রভু উহা রৌপ্যবর্ণের যে! তুমি ভাল জান!
তখন বনদেবতা অদৃশ্য হইলেন, কিয়ৎ পরেই তিনি এক নবারুণ সদৃশ ক্কচিৎ পান্নার ঘটা গঠিত এক বিচিত্র ক্রৌঞ্চ দেখাইলেন, কহিলেন,–ইহাই কি সেই?
নতজানু সকলে আর্দ্র চোখে উত্তর দিল,–প্রভু তুমি ভাল জান।
বনদেবতাকে দেখিতে ঐ ছোঁড়ার মত!
সেইদিন তখন ঐ মনস্তাপ জাতীয় পরমাশ্চৰ্য্য উপাখ্যান শ্রবণে মনিব পত্নী হাসিয়াছিলেন, অথচ তামাশায়, কেননা যে এতাদৃশ লিরিসিজমকে শোভনীয়তা, ঔচিত্য, মানে বাস্তবতা দানে বহুকাল আগের ততাপচাঁচির ঘটনা উল্লিখিত হইয়াছে, প্রাচীন এক ক্ষোভ বিস্মৃতির কথা যাহা!
তিনি ইহাও সঠিক বুঝিলেন যে ঐ চিঠির ফাঁক স্বামীকে উৎচকিত করিয়াছে, তাই যুগপৎ তিনি, পত্নী, সমালোচনায় বলিয়াছিলেন যে,–ধর তোমার চিঠি মিলানো ঐ কাঁক অনেকটা এমনই মানে। অক্ষমতার ছাড় বা শিল্পীর ছাড় যেখানে তাহারা ভাবিতে পারে না।
মনিব মহাশয় তদ্বিষয়ে উত্তর দিলেন,–আঃ সে শুভ্রতা! সে শুভ্রতা!
আজ এখন সেইদিনকার সেই বালকবৎ ভীরু স্বামীকে স্মরণে অধুনা তীব্র কটাক্ষপাতে প্রতিবাদ করিলেন, মিসিং লিঙ্ক না ছাই পাঁশ…কোথায় ছোঁড়া তেমনটি চেয়ে দেখত…?
সাক্ষাৎ চোর-চোর বুঝিয়া তুমি সদ্য-জঙ্গল দেখিলে কি রূপে তাহা হইলে…।
তখন কেন জানি না জঙ্গুলে বলে মনে হ’ল…। মনিব পত্নী ইহার পর ছেলেমানুষের মত আব্দার করিলেন,–ওগো এইভাবে পোড়ারমুখো ছোঁড়ার তুমি একটা ফটো তুল…ওরে বাবা পালকটা কুড়ো কুড়ো…কিন্তু তোমার কি করে মনে হল?
