আঃ! বন্দুকের আওয়াজও মেটিং কল!
এ কারণ যে এ বনভূমি রোসনাই! আমরা দুজনেই বড় মন কেমন অনুভবে, আবার কীদৃশী ঈর্ষায় আমি, কি ভয়ঙ্কর রোষে আমি, আবার ঠিক তখন পিকনিক পার্টিতে পোরটেল গ্রামোফনে একটি কমিক রেকর্ডের ফাটাতে পিন ঠেকিয়া ক্রমাগত একই শব্দের অদ্ভুতভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটিতে আছে, যাহা আমারে অধিকতর উন্মত্ত করে! কোন ক্রমে আমি সুঘরাইএর প্রতি লক্ষ্য করিলাম, সেই দ্বিপ্রহরে এখন যেন সন্ধ্যাপ্রসবী শিঙ্গা বাজিতেছে! আমার আবার অক্ষর পরিচিতি ঘটিল! বুঝিলাম আমারও মনিব মাধব! আছেন, তাই আমি আর এক বুনো!
এই পৰ্য্যন্ত বিস্তারিয়া মনিব মহাশয় সদম্ভে প্রতিষ্ঠা করিলেন, ঐ বালক সেই মিসিং লিঙ্ক!
ল্যভ লেটারএর…!
ইনি এবং উচ্চারণের পরক্ষণেই মনিব পত্নী বিদ্যুতে জিহ্বা দংশনের পরই কহিলেন, ও মা, ঐ কারা আসছে দেখ…।
.
এই ডাগর মনোহর হিরণার টিলার উত্তরে আরও দেশদেশান্তর সকল আছে, এখন উত্তরে প্রতীয়মান ঐ ভাগে যোজনব্যাপী আলুলায়িত প্রলম্বিত রম্য উত্তম শ্রীমণ্ডিত উত্রাই, কোথাও একলা আতা গাছ, কখনও বা পাথরপৃষ্ঠ, মহুয়া স্থির সস্ত্রীক, তারপর সমতল; তারপরও চিঠি যাইয়া থাকে; ঐদিকে মানুষের নিঃশ্বাসে আকাশ খুব নীলিমা; চোখে জল; ঐ রাস্তা যারপরনাই লক্ষ্মী, যায় ও আসে, ঈদৃশ পথটি বেচারী ঘুমকে কভু সমালোচনা করে না।
মনিব মহাশয় ঐ পথে শরৎকালকে আসিতে দর্শনে বলিয়াছিলেন, শরৎ আসিয়াছে এস কাঁদি তাঁহার চক্ষু সজল হইয়াছিল।
বঙ্কিমবাবুর লাইন আষাঢ় আসিয়াছে এস নামি!
.
এখন পত্নীর ইঙ্গিতে, মনিব মহাশয় তাঁহার মানসিক শান্তি হইতে–তিনি যেহেতু বিচারই শান্তি বিশ্বাসী যেহেতু, তিনি কিছু সিদ্ধান্তে আসিয়াছেন, তিনি আপন বালভৃত্যকে আর এক সৌখীনতায় আপন সৌখীনতাতে (!) অন্তরিত করিতে পারিয়াছেন-উৎরাই পর্য্যবেক্ষণ করিলেন;
পরিদৃশ্যমান হইল এই যে, চৈত্রের ঘূর্ণায়মান বাত্যায়-জব্দ কিছু পাতার ন্যায় একটি দল, ইহা প্রভাময়ী; যে উহারা জনে জনে তুমুলগোঁয়ার বাতাসে গাত্রবস্ত্রাদি কেহ ফ্রক কেহ শাড়ী সামলাইতে যে, ইহা জলবৎই যে সকলেই অপূৰ্ব উৎসুক যে ঐ আলোড়িত দল গীত গাহিতে আছে, যাহারই এক আধ মাত্র ঘুরন্ত বাতাসে এত দূরেও ছিটকাই আসে।
এহেন দৃশ্য মারচ! অভিরাম রঙ্গিলা! উহারা যেন প্রকৃতিকে ডাকিতে গিয়াছিল, না না, তাহা কেন, উহারা প্রকৃতিকে বাড়ী পৌঁছাইয়া দিতে গিয়াছিল, যে ইহা নজরে মনিব মহাশয় পূর্ণ, ধীরে ধীরে বলিলেন,…বেশ দেখিতে লাগিতেছে না বল! আজব হেরোইক! উহারা যেন ব্রাহ্মণী হংসের রুট ধরিয়া। আসিতেছে না? সপ্লেইনডিড!…প্লেনডর!…
কে ওরা বুঝতে পাচ্ছ? মাগো আমার কথা ওরা বোধ হয় শুনতে পেয়েছে গো…লাজে মরি!
যে ইহা শুনিয়া মনিব মহাশয় তদীয় বৈষ্ণবীয় মনস্কতা হইতে, স্বীয় সহধর্মিণীরে আশ্বাস। স্বগতভাবেই দিয়াছিলেন, তুমি কি পাগল! ওরা কে…
বুঝতে পাচ্ছ না, ‘ছোট-বাইরেরা’ গো, যদি ওরা কিছু শুনে থাকে, ওরা বড় বাবা যেমন বলেন বড় জবরদস্ত মৌলবী!
হইবে না-ই বা কেন! হেডমিসট্রেস বলিয়া কথা…!
সম্প্রতি তাহারা, ঐ দল, দূরে থমকাইল, এখন কেমন একরূপ তাহারা দোমনা করিতেছিল অগ্রসর বিষয়ে, স্পষ্টতই যে এখন তাহারা রাস্তা ছাড়িয়া পার্শ্ববর্ত্তী জমিতে ইতস্তত রহিয়াছে! যাহা নেহারিয়া মনিব পত্নী ভ্রদ্বয় কুঞ্চিত করেন, ব্ৰীড়ায় অবনত মুখে জানাইলেন,না গো, ছ্যা ছ্যা ওরা নিশ্চই আমার ‘লাভ লেটার’ বলাটা শুনতে পেয়েছে! বড় তরাসে ওরা যদি এতটুকুন আঁশ গন্ধ রইল ত অমনি হাঁ হাঁ করবে’খুনি…।
তুমি খেপিয়াছ…আমার ধারণা বলে উহারা আমাদের এড়াইতে চাহিতেছেন, সেদিনকার ব্যাপারের, মানে সাঁওতাল নৃত্যের দিন মনে নাই!
.
রকমারি লণ্ঠন ও পেট্ররোমাক্সের বিকিরণ গাছলতাপাতা নানা ছাঁদে, বহুস্তরে, ভেদিয়াছে–কভু বা আজব রামধনু! ছটাস কতক নাবি জিনিয়াতে ও জলদি ডেলিয়াতে, কখনও আন্দোলিত চামেলীতে (আঃ আমাদের রিখিয়ার বাড়ীর জানালার নীচে কি অফুরন্ত চামেলী! কি তারিখহীন!), আবার অন্যদিকে সাঁওতাল রমণী যাহারা ইতস্তত আছে, তাহাদিগের দেহে ঐ আলো, যে এবং এই সকলের সেই ছায়াই যাহা ক্ষণিক নিমিত্তই চকিতেই জাগাইতে পরিশ্রম করিয়া করিয়া যায় মুরারীবাবুকে–ইনি তিনি যিনি রৌদ্র-প্রত্যক্ষ-বোধ লইয়া নিম-নিদ্রিত।
ইনি টুলেতে বসিয়া, যে টুল একটি ইজিচেয়ারের পিছনে আছে, ইহার শিয়রে পশ্চাৎ হইতে তিনি মাথা রাখিয়াছেন; তাই এইভাবে তাঁহার ঘাড়ের রেখাঁটি সম্মোহ হইয়াছে। নিশ্চয়ই তিনি এখানকার পাহাড়ী হাওয়ার মধ্যকার পারিপার্শ্বিকতাকে উক্ত আকার অতুলনীয় অভিব্যক্তিতে স্বপ্নে আনিতেছিলেন; যে তদীয় মুখমণ্ডল এরূপ যে স্বতঃই মনে হইবে যে মুহূর্তেই তিনি চোখ মেলিয়া ঘোষণা করিবেন, কি গ্রাণ্ড!
এবার ঐ মুরারীবাবুর আঁখিপক্ষ্ম কম্পিত ছিল, তিনি সজাগ; কেননা তিনি সজাগ, কেন না তিনি অলৌকিকতা শুনিতেছিলেন। কেহ, পরিতোষবাবুই, তাহা বর্ণিতেছিলেন যে: আমার স্ত্রী, শুধু আমার স্ত্রী বলি কেন, উহাদের গোষ্ঠী মানে ফ্যামিলির সবাই খালাস করিতে খুবই অর্থাৎ পারদর্শী, কি এক পুণ্য আছে! যদি ক্কচিৎ বাই চান্স একটি নষ্ট হয় ত কান্দিয়া আকুল হন, দু-তিন দিন অন্ন গ্রহণ পৰ্য্যন্ত করেন না, খালি কান্না! হা ভগবান, আমি জন্ম রহস্য দেখিতে বিহ্বল কেন হইলাম!
