ততঃ অচিরাৎ তুমি বিপুলতর দাপটে নির্ঘোষিলে,…এখানেও কাগজ! তোমার বাচনভঙ্গিতে চমক আয়রনি, শ্লেষ ছিল; অথচ তুমি শান্ত, অথচ তুমি নাটকীয় ভাবে দাঁড়াইলে, শিশিরবাবু যেমন ফুটলাইটের সমক্ষে, ফলে তোমাকেই তুমি, তোমার ঐ বাচনভাবকে তুমি নির্বাক করিলে, তোমার সবকিছুতে কেমন এক দুৰ্ব্বার খামখেয়ালী-ফের; কিয়দংশে মজার মনে হইলেও, আমি উদ্বিগ্ন, আমি ধন্ধে আছিলাম, যে তোমার মনুষ্যজাত দর্পিত জিহ্বায় ঈদৃশ হাহন্ত বলিয়া উঠিল, যে, এই মহাস্থানের কুমারীত্ব বিনষ্ট হইয়াছে ঐ সকল কাগজের টুকরায় যে ইহার, এই টিলার পুণ্য যা কিছু ইহার গৌরীত্ব অহঙ্কার ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে।
যে আমারে উদ্দেশ করত ইহাই ইঙ্গিত করিলে এবং, যে, হায় তুমি না একদা কামনা করিয়াছিলে– যে এরূপ মহিমার কূৰ্ম্মপৃষ্ঠ জমি কি শান্তরসাস্পদ! কি স্তব্ধতা!–এখানে এক সুবিশাল নয়নসুখ নবরত্ন মন্দির উৎসর্গ করিব-অবশ্য যদি এমন সুকৃতি থাকে, অবশ্য যদি আদিষ্ট হই কখনও কখনও, এখানে শ্রীশ্রীমায়ের মন্দির স্থাপন করিব! কিন্তু এখন এই টিলা ইহা এখন অশাস্ত্রীয় হইয়াছে, এই টিলারে কেহ আর নালিশ জানাইবে না, সাক্ষী মানিবে না…অত্যাশ্চর্য্য যে কেবলমাত্র কাগজটুকরো দর্শনেই তুমি এবম্ভূত মতিচ্ছন্নই!
তোমার সেই অপ্রাকৃতিক বিলাপ বচনে আমি অথৈ-তে, আমাতে যারপরনাই এক পরমাশ্চৰ্য্য ভীতি সঞ্চারিত হয়! যে আর তোমার ঐ দুঃখদশা আমারে বিষণ্ণ মুহ্যমান করিলেক। জানি তুমি ধার্মিক, তুমি অতীব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, তুমি অভিমানী, কত কত তুচ্ছ কিছু তোমারে হিম করে,…সেই যে সেই মনে পড়ে…সুন্দর মহিমাময় গম্ভীর গভীর খদির বৃক্ষ পূর্ণ আইবুড়া কুজ্ঞটিকাময়ী জঙ্গলে, যেখানে পেচকের আওয়াজে শিকড়গুলি ভয়ঙ্কর, যেখানেতে লতাগুল্মে প্রায়ই হরিণের শিং আটকাইয়া যায়, এহেন সংস্থানে তথায়ে অনেক লজ্জাবতী ও বিবিধ ভূমি গুল্মের কাছেতে, সমক্ষে, এক টুকরা দৈনিক টাইমস কাগজ, সিভার্সের মারমালেড-জার ও সাদা-পিগ মুদ্রিত টিন ও IXL এপরিকট জ্যামের টিন দর্শনে তুমি কি পরিমাণ গ্ৰাম্য, তুমি নিশ্চিহ্ন, তুমি মর্মপীড়িত ম্রিয়মাণ হইয়াছিলে, তুমি তদানীন্তন কালে এক মৌমাছি দেখিলে যাহা ঐ বিকট (!) সংস্থানে পরিক্রমণরত, তাহারে তুমি নির্বোধ বলিলে, তুমি বীভৎস দুষমনী উহাতে দেখিয়াছিলে–তুমি ধার্মিক যেহেতু–অথচ মজার কথা এই হয় যে, তোমার তাঁবুতে ঐরূপ আধারের দোকান সাজান! হায় সেই দিন তুমি ও তোমার প্রিয় বন্ধুদ্বয় (জোসেফ কিরণ। চৌধুরী ও ভবানী সি. বাসু) হরিণের পশ্চাদ্ধাবন হইতে পর্যন্ত বিরত হইলে–সূক্ষ্ম তত্ত্বে তখন তুমি বাণবিদ্ধ, যে তুমি ভক্তিযুক্তমনে চরণামৃত পান কর সেই তুমি…তোমাকে যখন যখন মনে পড়ে আমি কীদৃশী অচিন বালিকা!
ঐ সকল কাগজের টুকরা সকল তখনও এই টিলায় উড়িতে আছে!
আঃ ক্ষণজীবী পতঙ্গ সকল! তুমি সুঘরাইকে এক টুকরা কুড়াইতে নির্দ্দেশ দিলে, টুকরা আনীত হইল,–তাজ্জব, তুমি আজন্ম সংস্কার ভুলিলে, তুমি কি নেটিভ!–আনীত টুকরা পাঠে তুমি অতিমাত্রায়ে বিক্ষুব্ধ, কি এক বেদনা তোমাতে ফুটমান হইতে চাহিল, তোমাতে বাক্য বৈখরী হইল, অথচ কিন্তু ঝাঁপটা হাওয়াতে উহা গোঙানির ন্যায় বুঝায়।
তোমার আদেশে তোমার প্রিয় ভৃত্য টুকরা সংগ্রহে প্রবৃত্ত হইল, এই স্থান বৃহৎ হইল, যে অন্যপক্ষে আমি স্ত্রীলোক মাত্র–সতত পৃথিবীরে দোষারোপ করিতে ইতস্তত থাকি, অবশ্য আমি মদীয় গণ্ডদেশে তর্জ্জনী স্পর্শ করিয়াও করি না, যে এবং তোমার পাইপ সত্ত্বেও আমি বিব্রত নহি, তোমারে আর আমি নেটিভ বলি নাই, আমি শুধু তোমার পাইপের হস্তীদন্তশ্বেত বিন্দু (কোন এক দামী পাইপে এইরূপ থাকে) নিষ্পলকে দেখি; যে সেই ডোম বালক ইতঃমধ্যে মহাউৎসাহে ছুটিয়া ছুটিয়া কাগজ সকল কুড়াইতে আছে, এ দৃশ্য ভয়ঙ্কর, ঐ দৃশ্য বিশ্রী! যে তাহার আদরের তিতির পাখীটি এখন খাঁচা ছাড়া উহাও মহা আমোদে তাহারে অনুসরণ করে ক্কচিৎ কখনও বা উড়িয়া কখনও পদব্রজে।
এ দৃশ্য দারুণ খেলা।
যে তুমি দুচারখানি টুকরা পাঠে ইহাই পড়িলে, ল্যভ লেটাঃ! আশ্চৰ্য্য ঐ কথার কোন প্রতিধ্বনি ছিল না। মেঘ সকল নিঃশঙ্কচিত্ত ছিল।
এবার তুমি যখন অস্পষ্টভাবে উচ্চারিলে ল্যভ লেটাঃ কিছু প্রতিধ্বনি শ্রুত হয়, যেই না তুমি নিরীহ শিশুকণ্ঠে ঘোষিলে ল্যভ লেটাঃ! এইবার দিকে দিকে সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হইল। শিশুস্বর নিবন্ধন উহাতে শ্লেষ ছিল নাই। আশ্চর্য মেঘ অপসারিত হইল, আমরা দুইজনে দূরে দূরে অজানিতেই অসহায়ভাবে নয়ন ফিরাইলাম, আমরা (?) বহুদূরাগত গন্ধসমূহ পাইলাম, যে এবং দুর্জয় অপরিমেয় অতুলনীয় ঘ্রাণশক্তি ক্রমে বহু যুগের অতীতের স্বর শুনিলাম! এক প্রমত্ত জোয়ান কাব্যবীজ! দুস্তর গোপনতা ভাঙ্গিয়া যাহা আসিতে আছে।
অতঃপর তুমি টিলার দিকে পুনৰ্ব্বার অবলোকন কর, তুমি সম্বলহীন! তবু আদৃত ভাবে এখানে সেখানের পারিপার্শ্বিকতার কত গাছ, কত লতা, ধূলা উড়া হৃদয়ঙ্গম করিলে…যে ও তুমি কেমন যেমন ব্যর্থতায়, ইহাতে যে আমি মা জননীকে স্মরণ করিতেছিলাম। তুমি মথ-এর (পতঙ্গ) তুল্য নিৰ্ব্বিকার, দারুভূত আছিলে!
তৎকালে আর সেই বালক কখনও কখনও তাৎপর্যপূর্ণ জিগীর দিতে থমকায়, কখনও আপনারে ধিক্কার দিতে আছে, কখনও বা হঠাৎ উৎফুল্ল, এই যে আর এক খণ্ড! আর এক খণ্ড! পুনরপি আর এক।
