চাঁপার মা অর্থাৎ ঘোষাল গিন্নী মনিব পত্নীর সহিত গল্প থামাইয়া,–যাই ভাই একটু ঝাঁকি দর্শন দিয়া আসি, বলিলেন।
এসময় পুনরায় মোদাবাবুর কণ্ঠ পুনরপি ধ্বনিত হইল,উহারেও লইয়া আইস…।
ইহারা দুইজনে উঠানে যাইতেই, মোদাবাবু ধ্যানঘন আবেশে অঙ্গুলি নির্দেশে ব্যক্ত করিলেন, দেখ দেখ কি গ্র্যাণ্ড! এবং তাঁহারা দেখিলেন মাকড়সার জালে জল-বিন্দু!
ইহা দেখিতে ঘোষাল গিন্নীর আশ্চৰ্য্য যে ঘোমটা স্খলিতই ছিল, তাঁহার কণ্ঠলগ্ন দশ ভরির পাটি-হার কিছু অস্থায়ী, এই পাটি-হার এখনও পাটি-হার আছে! ঘোষাল গিন্নি বলিয়াছিলেন, লোকে আমায় কত বলিয়া থাকে, ভাঙ্গিয়া অন্য কিছু গড়াও না কেন, কত নূতন প্যাটার্ন হইয়াছে,–আমি বলি প্যাটার্নের মুখে, সখের মুখে, ছাই! এক প্যাটার্ন করিলেই তখন প্যাটার্ন প্যাটার্ন বাই হইবে…স্যাকরা পোড়ারমুখোদিগের গর্ভ ভরাইতে ত জন্মাই নাই…এখনও দুইটি মেয়ে পার করিতে বাকি!
এখন ঘোষাল গিন্নীর স্বর সবিশেষ আপ্লুত, যেমন বা ফোলা, তদীয় মাড়ির আড়া দেখা যায়, জালস্থিত জল-বিন্দু প্রত্যক্ষে কহিলেন,-মাইরী কি গ্র্যাণ্ড না ভাই!
উপস্থিত এই টিলায় মনিব পত্নী সমক্ষে সুঘরাই বিষয়ে, ঐ রূপ ‘গ্র্যাণ্ড’ উক্তিটি বাধা দিল, নিশ্চয়ই ভাবিয়াছিলেন, সুঘরাইএর বিষয়ে মহা বিশ্রী শুনাইবে। ইত্যাকারে তিনি আপন স্বরগ্রামই তুলিয়াছিলেন।
কেননা স্বামী বলিয়াছিলেন, গ্র্যাণ্ড গ্র্যাণ্ড ড্যানচিবাবুরা (ড্যানচিবাবু: আগে চেঞ্জাররা ঐ সব দেশের খাদ্য সামগ্রীর দাম শুনিয়া হাটে মাঠে বলিতেন damn cheap) এমতভাবেই বলে, বেচারীরা বলে যাহাতে মনে হয়, সৌন্দৰ্য কুৎসিতের প্যারডি মাত্র, অদ্ভুত না?
অথচ তিনি এখনও সেই পালক-নির্ভরতা বৃত্তিতে থাকিয়া ছেলে মানুষটিতে মনঃসংযোগ করিয়াছিলেন; এখন সুঘরাই বিশদ, যে বহুদূরস্থিত অভিমানী ত্রিকূট নিঃসঙ্কোচে উহার কাছেতে আসিয়াছে, যে বহুদূর হইতে বন সমারোহ–তাহাও, যে ধান ক্ষেতের ঝরণার শুধু মৃদু-শব্দ-গান ইহাও, যে এবং খাঁচা হস্তে বালকের পশ্চাতে অনেক অনেক লাল পথ সকল ছুটাছুটি করিতে আছে!
আরও যে, দেখা যায়, যে এই সময়েতে সুঘরাই আপন জিহ্বা দ্বারা ছোট করিয়া আপন ঠোঁট লেহন করে। স্রোত উহার বাল্যকাল, ষড়ঋতু উহার ভবিতব্য হয়! যে এবং ঈদৃশ জ্ঞানে এমনও যে মনিব পত্নী নীল পালকটি ভুলিয়াছিলেন কেননা বিশ্বাস এখন হইয়াছিল যে সে বালক নিঃশঙ্কচিত্তে প্রদীপ জ্বালাইতে ও নিভাইতে পারে।
নিরহঙ্কার মনিব মহাশয় পাইপে মৃদু টান দিতে থাকিয়া, সহধর্মিণীর উচ্ছাসহেতু সপ্রশংস প্রবণতায়ে আপনকার প্রিয় ভৃত্যের প্রতি নজরেতেই, এইটুকু তাঁহাতে ঝটিতি খেলিয়াছিল, অভিনবতম ব্রতকথার উদ্দীপনা দেখিয়াছিলেন, যাহার উপচার ঐ পৰ্বতশীর্ষের বৃক্ষপত্র, কেননা সেখানেই প্রথম বৃষ্টি হয়, কেননা সেখানেই প্রথম দিন দেখা দেয়। এই ভাঙা পদটুকু বড় আপনার, যে ইহা বড় বৈদিক! আর সম্মুখে সুঘরাই, যে আর তাঁহার চক্ষুদ্বয় ছোট হইল এবং যে তিনি খুসী সহকারে দমকা উচ্ছল হইলেন,…হা! লাল লা! সন আফ এ বিচ, হারামজাদাকে সত্যি চমৎকার স্পেইলনডি দেখাইতেছে…মিসিং লিঙ্ক! মিসিং…।
মিমি-সিং লিংক!…ও হ্যাঁ হ্যাঁ কৈ?–বলিয়া মনিব পত্নী ঐ সূত্রে সুঘরাইকে নূতন করিয়া বুঝিতে উদ্যোগী, তাঁহাতে অপ্রার্থিত বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হইল: উহার পশ্চাতে কোথাও গেরি, কোথাও হরিৎ, কোথাও বা কমলা রঙ, কোথাও বা চলমান-রঙ অর্থাৎ যাহারা চেঞ্জার তাহারা ভ্রমণ করে; যাহা তাহাদেরই বস্ত্র ছটা!
এবং ঐ সকল রঙ প্রভাবে বিচরণের কালো মহিষগুলিও রঙীন; যে আর যাহাদের ইতঃমধ্যে তীক্ষ্ণ তছনছে হাওয়া–ইহাতে এহেন ছবিতে, তাঁহার বাম আঁখি স্পন্দিত হইল, ক্রমে ইতঃপূৰ্ব্বকার উপলব্ধি হইতে তিনি কোথায় যেন বাঃ বনরাজি যেন সুঘরাইএর গা শুকিতেছে।
তিনি মনিব পত্নী কিয়ৎ অপ্রতিভ যে স্বামীর সংজ্ঞা বোধগম্য হয় নাই, ও বিনীতভাবে প্রকাশিলেন,–সে কি গো আমি ত ছোঁড়াতে শুধু অন্ধকার দেখছি! এই অন্ধকার কথাতে তিনি নিজেই যেন সত্যযুগে, ক্লাসিক পৰ্য্যায়ে চলিয়া গিয়াছেন।
আ! যথার্থ ধরিয়াছ, উহাই ত মিসিং লিংক!
ইহাতে এখন সত্যই মনিব পত্নী বহুদূর নিঃশব্দতায়ে অন্তর্হিত হইয়া থাকেন, যে তথাপি স্বামীর উচ্চারণের রকমে, যে স্পষ্টতই স্বভাবতই অনুধাবন করিলেন, যে তাহাতে-মনিব মহাশয়ের চোখে, মিসিং লিংক প্রাপ্তির কোনও আত্মম্ভরি উদ্বেলতা আহ্লাদ আদৌ ছিল না, বরং তাঁহার চক্ষুর্ঘয় যেমন বা কোন দিব্য বিগ্রহে আকৃষ্ট হইয়া আছে।
ও এ কারণেই তাঁহার পানে মনিব পত্নী এমত নিরীক্ষণরত, যে যাহাতে, যেন ইনি উহারে বুঝিয়া লইতে চাহিয়া কিছু দিন ইহাই যেন বলিয়া চলিয়াছেন যে যথা: সেদিন এই হিরণার টিলায়–এখানে উড়িতে থাকা কতক কাগজ-টুকরা প্রত্যক্ষে তুমি থমকাইলে, চমকিলে, তুমি স্তোভযুক্ত হও, তুমি আতঙ্কিত। ক্রমে তোমার নিরীহ ওষ্ঠ সংপুট স্ফীত হইল, এতই যে তুমি যেমন দারুণ হুঙ্কারে প্রতিবাদে দিচরাচরে দৃষ্টিসঞ্চালন করিয়াছিলে, দূর হইতে জেঙ্গীল পক্ষী তোমার রোষযুক্ত ভাব অনুমানে আমাদের মাথার উপরকার আকাশ অতিক্রম করে নাই, একমাত্র টিলার যে দেবতা–টিলার অন্তর আত্মা যিনি, তোমার ঐ বৈগুণ্যে নির্ঘাত হৰ্ষযুক্ত হইয়াছিলেন।
