যে ঐ শব্দে যুগপৎ পাখীটিতে কীদৃশী মনোরমত্ব উজাগর! কি এত অব্যর্থ অভয়, কি গৌরব, কি এক পেশী, ঝামরাইয়া তখনই উঠিল, ইহা যাহা অপরিসীম দিব্য, ইহা যাহা খাসা, কি ঘটা! সেই মুহূর্তে ঐ কাল সদৃশ ঘোর হিস আওয়াজে তিতিরটি চমকে উৎকর্ণ সচকিত হইল, কি যেমন তাহাতে! মাল্য মৃত্তিকা কুসুমাদি পতঙ্গ জুড়িয়া এক তুমুল কিছু প্রকট হইল, করতাল ঝাঁজিয়া উঠিল; সুঘরাই যেমন বনমধ্যে। আঃ পক্ষীর গ্রীবা কৌস্তুভ মণিময়, অখণ্ড তেজে দীপ্তদৃপ্ত সটান!
অয়ি শীর্ষস্থতা!
এরূপ দেখা, এই দেখার জন্য আত্মপ্রত্যয়, সুঘরাইকে ঐ দিবস বহুক্ষণ যাবৎ শ্ৰীযুক্ত, প্রজ্জ্বলিত রাখিয়াছিল; অনেকবারই সে সগর্বে পাখীটিরে কিয়ৎদুর হইতে অবলোকন করিয়াছে আর তখনই সেই শীষটান, ঐ লতেব গ্রীবার,–কোন প্রহেলিকার কম্পনে, তির্যক গতি ঝটিতি নিরেট সোজা উহাতে– যাহা তাহাকে নির্ভীক করে, সেও অজ্ঞাতে উহা রপ্ত করিতে অধ্যবসায়ী হইল।
যে এবং এই প্রথম, ডোম জীবনে যে এতাবৎ ভীত, সে জিজ্ঞাসু হয়, তন্নিষ্ঠ যখন সে –কুঞ্চিত করে, তৎক্ষণেই যে সে এক অনৈসর্গিক বিকট, ইহা প্রেততাড়িত-র অধিক, ভয়ে সে চেতনা বিনা; ইহার মধ্যে কি যেন মাথা চাড়া দিয়া উঠিয়াছিল; আবার গর্বে সে ডোম! অবশ্য সেই দিন পুনৰ্ব্বার ঐ কাণ্ডের জন্যই বড়ই অবায়ুখ তাহারে হইতে হইয়াছিল, যখন সে হিরণার টিলায়।
৩. সকালে বিকালে সাঁওতাল পরগণা
আমরা জানি সকালে বিকালে সাঁওতাল পরগণা, তথা জঙ্গল মহলের প্রায় স্থান, বিশেষত রিখিয়া, অভাবনীয় রূপ ধারণ করে–ইহার যে কোনও স্থানে দাঁড়াইলেই, এই বিশ্বাস হইবেই, যে মানুষের বড় কাছে দূরত্ব সকল; তাই সকালে এখানে রেখাব খেলিয়া উঠে, কেননা অমরতার দেখা দিবে, সন্ধ্যায় শুদ্ধ ষড়জ জাগর হয় কেননা অমরতা এখনই আসিবে; শুকতারা আশ্চৰ্য্য হরিণ যেমন বা।
ইহার আকাশে চির ব্রাহ্মণ্য, মৃত্তিকা বিস্তার হয় উৎসবময়ী ফোয়ারা! এমনই বৈচিত্র্যের মধ্যে সকালে চেঞ্জাররাই ভ্রমণে বাহির হয়, বস্তু সমুদয় কিছু অবাক মুহূৰ্ত্ত হইয়া উঠিতে থাকে, ভ্রমণকারীরা তাহার সেই মুহূর্তের সহিত করমর্দন করে।
সুঘরাইও মনিব মহাশয়েদের সহিত রিখিয়ার হাট পার হওয়ত উত্তরে হিরণার টিলায়, এখানে হাওয়া বড় বেশী, এখানে মনিবরা আঃ বলিয়া উঠিলেন।
মনিব মহাশয় তাঁহার পাইপে মিকচার ভরিতে থাকিয়া কহিলেন,–দেখ, ফাঁকা কথাটি এই স্থান সম্পর্কে যথার্থ নহে, ইহা আরও কিছু, কোন স্রোত এখানে নাই ফুল নাই–এখানে আমরা আবার নূতন–স্লেট আমাদের পরিষ্কার। এ স্থান এমনি যে, যে এই হিরণার টিলা এমনি যে ইহার জন্য সহজেই আমি তোমার শয্যা ত্যাগ করিতে পারি।
মনিব পত্নী ঐ বাক্যের প্রতি কোনমতে চাহিলেন,–উহা কঠিন উহা আমোদের!–এই জন্য কোনমতে যে, ইদানীং তিনি কশ্চিৎ নীল পালকের হাওয়াতে ভর করত নামিয়া আসা দেখিতে আছিলেন, তাই চক্ষুযুগতে, যাহা পান ও গুবাককে সংজ্ঞাতে পরিণত করিয়াছে, মৎস্যকুমারীর গল্পর সংযম যাহাতে থাকে এবং উনি উৎসাহিত ছিলেন, যে, আঃ কে জানিত ঐ পালকে মদীয় নির্ভরতা থাকিবে।
আর যে সেই আশ্বাসে হৃদ্বয় সটান, এখন কহিলেন,–আহা বেচারী পালকটা! দেখ দেখ পালকটা, কি সুদোর! ইহা প্রকাশিতে তাঁহার দেহলতা এরূপ কম্পিত তিনি যেমন বলিয়াছেন–এমন একটি নীল আসন হয়…যাহাতে বসিয়া শ্রীশ্রীমা জননীকে ডাকি (স্বর্ণমৃগ দর্শনে সীতা স্বভাবত এইরূপ বলিয়াছিলেন); অথবা এখন সন্ধ্যা হইবে, শঙ্খ বাজিবে তাই।
স্বামীর কথা তাঁহার কানে ছিল, উত্তর করিলেন,-ব্রাকেটে উচ্চৈঃস্বরে (!) হাস্যধ্বনি! এবং বুঝলুম মশাইয়ের আমার উবরি মমতা অঢেল! এখন এই নীল পালকটার জন্যেই আমার মনে হচ্ছে…এ জায়গাটা বড় আত্মীয় সমান!
.
এমত সময় একদল সাঁওতাল সারিবদ্ধভাবে ঐ টিলা অতিক্রম করিতে ক্রমে উঠিল, তাহারা নির্জন প্রবাহ, তাহারা অদ্ভুত, পায়ে চলিতেছে, তাহারা তাঁহাদের ইতিমধ্যে দিয়া যায়, ইহাতে তাহাদের মধ্যে এক আজব আড়াল সৃজিত হইল, সম্ভবত এই ক্ষণিক বিচ্ছেদ হওয়ার জন্য ভবিষ্যতে কখনও তাঁহারা উৎকণ্ঠিত হইবেন।
এখন সাঁওতাল দল তাঁহাদের দুজনকে দুজনের কাছে স্পষ্ট করিতেই, দুজনেই চমৎকারভাবে হাসিয়াছিলেন, চেনা-মানুষকে দেখার হাসি যাহা! এবং ইহার অবিলম্বেই, খানিক ইহাতে সলজ্জ মনিব পত্নী স্বভাবতই সুঘরাইএর কারণে এখানে সেখানে দৃষ্টিপাত করিলেন; দেখিলেন সাঁওতাল দলের লাইন এবার বাঁকিয়াছিল; এবং শনৈঃ সানোয়ার পথে নামিতেই খাঁচা-হাতে সুঘরাই প্রতিবিম্বিত হইল, ইহা এক দৃশ্য বটে!
মনিব পত্নী তাহারে দেখিয়া বিস্ময়ে কহিলেন, ও মা তুই ওখানে, আমরা ভেবে মরি!…দেখ দেখ। ছোঁড়া যেন সদ্য জঙ্গল! সুঘরাই তখনও সেইভাবে আছে, তাহাতে মনিব পত্নীর সাধ হইয়াছিল, চেঞ্জারদের মত বলিয়া উঠিবেন, কি গ্র্যাণ্ড দেখাচ্ছে না! কিন্তু ইহাতে, ত্বরিতে আগাইয়া-র (গ্রাম)…বাবুর বাড়ী আগত মোক্ষদা ঘোষালের গিন্নীর কণ্ঠস্বর জিহ্বায় থমকাইল, যাহা মনিব পত্নী শুনিয়াছিলেন।
নিজ বাড়ীর উঠান হইতে মোদাবাবু, ইনি সদাশিব তুল্য, ইহার বক্ষঃদেশে নস্যর দাগ, হাতে একটি নস্য-মলিন ন্যাকড়া, ডাকিলেন,–চাঁপার মা শুনিতেছ! বলি ও গো শীঘ্রই আইস একবার।
