অদূরে খাবার ঘরে মনিব পত্নী ষ্টোভেতে খানিক বাসি মুরগীর-মাংসর তলা-পুড়াইয়া পাক করা সকাল-বেলাকার জলখাবারের জন্য প্রস্তুত তদারক করিতেছিলেন, এবং নিজে ময়দা মাখিতে ছিলেন। ঐ শব্দে তাঁহার কান খাড়া হইল; সেই মারাত্মক ধ্বনি স্টোভ অথবা জাতীয় অন্য কোন আওয়াজের সহিত মিশিয়া যাইবার না, উহাতে নিয়তির পায়ের খস খস ধ্বনি আছে! শ্মশানভূমি যেন ফুঁসিতেছে!
অন্য ঘরে যে শব্দে, মনিব মহাশয় রাত্র-আঙরাখা পরণে পাইপ মুখে কলের গানে কমলা ঝরিয়ার গান শুনিবার মধ্যে পরিষ্কার অভিধানে বুঝিয়া থাকেন; ফলে দুজনেই, মনিব পত্নী ময়দার তাল সমেত হাতে ত্রস্ত হওয়ত দরজার গোড়ায়, ও যে মনিব মহাশয় শঙ্কিত পদে বারান্দায় আসিলেন–এখন ইনি হিস শব্দের কারণ নির্ধারণে অতি স্বাভাবিকভাবে পাইপ-ধৃত দাঁতেই কোনমতে হেই দিয়া উঠিলেন।
যাহাতে মনিব পত্নী অধিক উম্মামতি হন, তাহারে সুঘরাইকে, সাতিশয় তাড়নাপূৰ্ব্বক এই কথা বলেন, বলি পোড়ার মুখো নচ্ছার শয়তান বলি হচ্ছেটা কি, আবার দাঁত বার করে হাঁসছিস, লাজলজ্জার বালাই নেই, এই সাতসকালে বেচারা পাখীটার ‘পোঁদে’ লাগা, কি কাণ্ড! আমি ত ভয়ে কাঁটা, আর কাজ পেলি না, ঐ এক রত্তি পাখী, ছেলেমানুষ অবলা জীব, তাকে ভয় দেখাতে তোঃ বাধল না, তোঃ মতন শয়তান ত কখন দেখিনি, সাপ হয়ে হিস্ হিস্ হচ্ছে ছ্যা ছ্যা…দেখবি’খনে আঃ-জন্মে সাপ হয়ে জম্মাতে হবে…তোঃ ভালবাসার মুখে ঝাড়ু, তোদেঃ ছোট জাতের কি মায়া মমতা বলতে কিছুঃটি নেই র্যা, সাত সকালে ইকি কাণ্ড! ও ঘরে না ঁমা রয়েছেন, বুঝলি অনেক পুণ্যে মানুষ জন্ম, অনেক পাপে ছোটজেতের ঘরে জন্ম হয়, ডোম চাঁড়াল হয়, ওঁর আদরেই তুই এত বাড় বেড়েছিস্!
এবং ইহার সহিত আপন স্বামীর উদ্দেশে কহিলেন, তুমি ওরে কিছুটি বলনা বলেই ত এত আস্পদ্দা, ইস ভাবলে গা হিম হয়, কতবড় পাজি, তুই শয়তান না মানুষ, নিশ্চয়ই ডাকাত হবে…আবার ওকে তুমি বন্দুক সাফ করতে দেবে বলেছিলে (!) তুমি কিছু বল না বলেই ত…কি নরক যন্ত্রণা!
মনিব মহাশয় গান শুনিতে থাকিয়া উত্তর করিলেন,বলিলাম ত, এই সব রুক্ষু ঝামেলায় আমাদের কোন প্রয়োজন নাই, আমরা বেড়াইতে আসিয়াছি, আমরা খামখা পাদরীগিরির জন্য বরাত লইয়া আসি নাই, অতশত হুজুতে কোন কাজ নাই, আজ হিস করিতেছে, সেদিন পাখীটিরে পদাঘাত করিল, উহাকে এই মুহূর্তে এক কাপড়ে পাখীশুদ্ধ বিদায় কর, পাপ! তাড়াইয়া দাও হারামজাদাকে।
স্নেহশীলা মনিব মহাশয়া ইহাতে বিব্রতচিত্ত মর্মাহত হইয়া কর্ণে অঙ্গুলি প্রদানে প্রায় উদ্যত হইতে চাহিলেন, একদা তাহার খাঁচার প্রতি নজর গেল, যাহা তিনি সাজাইতে সাহায্য করিয়াছেন, ইনি শিহরিত আছেন!
‘নারায়ণ নারায়ণ’ এবং ‘তারা ব্ৰহ্মময়ী মাগো’ বলিয়া ‘আনন্দময়ী মাগো’ বলিয়া, আনন্দময়ী ঁশ্রীশ্রীমায়ের চরণ স্মরণে স্বামীর জন্য ক্ষমা চাহিয়া অত্রাহি হইয়া কহিলেন,–ছি ছি তোমার কি জ্ঞানগম্য হবে না কোনদিন, মাঠাকরুন কি ভাববেন! বকতে বললুম বলে ঐ সব অলুখুনে কথা, তোমায় বলতে যাওয়াই আমারই ঝমারি হয়েছে…সাত সকাল। এতবড় কথাটা কি করে তুমি মুখে তুললে; ছোঁড়া নয় ভুলই করেছে…।
যে এবং ঠিক এমত সময়ে তাঁহার কথার মধ্যে তিতিরটি মনিব পত্নীর পায়ের নিকট আসিয়া নখে ঠোকা মারিল, ইনি যন্ত্রচালিতের ন্যায় হস্তধৃত ময়দাপিণ্ড হইতে, কিঞ্চিত মাখা ময়দা লইয়া তাহারে দিয়া সুঘরাই উদ্দেশে ইহা বলিয়াছিলেন,–আঃ মরণ দশা! তুই অমনতারা হাঁ করে মূর্তিমান পাপের মত দাঁইড়ে রইলি যে, নে নে ঝটপট ঝাঁট দিয়ে, এরে, পাখীরে খাবার দিগে, দ্যাকদিকি কি খিদেটাই পেয়েছে…।
এবং পাখীটিকে আপন শিশুর ন্যায় সম্বোধনে কহিলেন ‘আহা খিদে পেয়েছে তোমাল বেচারী!’–এই সোহাগ বাক্যে পাখীটি আশ্চর্য যে, অদ্ভুতভাবে যে, মুখোনি তুলিয়াছিল।
বটেই উহাতে, ঐ হিস্ ধ্বনিতে, ভক্তিমতী মমতাময়ী সেই রমণী যারপরনাই ভীতা হইয়া থাকেন; যে কিন্তু অন্যপক্ষে, সুঘরাই এই তীব্র বকুনিতে ভারী জবুস্থবু!
কিন্তু যে এ পর্যন্তও তাহার সুঘরাইএর মুখে নীচজাতিসুলভ বাঁদুরে হাসি বিদ্যমান রহে, তত্রাচ এক সুদারুণ আত্মশ্লাঘা তদীয় সুন্দর নিটোল ললাটে প্রতিভাত, যাহা যেমন যে, এই পক্ষী হয় আমার, উহার যে পালক সকল অদ্যাবধি হাওয়াতে উড়িয়া গিয়াছে তাহাও, তাহাও; উহার হাঁটা চলা ঠোকরান ডাক্, উহার দুর্গতি, উহার কম্পন, উহার চাঁদ সর্বৈব কিছুই আমার, উহাতে অভ্রান্তই মদীয় প্রভুতা থাকে!
ও তৎপ্রভাবিত সুঘরাই আপনার প্রাণ অপেক্ষা বুকের পাখীকে মহা আহ্লাদে হেদাইয়া তির্যকে লক্ষ্য করিল; করিতেই, তন্মুহুর্তেই ঐ ভ্রম অদৃশ্য হইল; তৎপরিবর্তে পৃথগ্নিধ এক গম্ভীর চমক তাহার যুগে বৰ্ত্তাইয়াছে, তাহাতে ক্ষণেকজন্যই সে কুহকাম্বিত হইলেক, ও ঝটিতি পুনরপি সর্প হিস দিতে সে অধীর হইয়া থাকে; এই কারণেই যে, তৎকৃত ভুজঙ্গশব্দের ফলে অদৃষ্টপূৰ্ব্ব এক দুর্ধর্ষ ঘটনা ঐ পক্ষীতে, নিরীহতা মধ্যে, উদঘাটিত তদ্বারা আবিষ্কৃত হইয়াছিল; আর যাহা সাক্ষাতেই তাহাতে ভাব লাগিয়াছিল, যে সে, সুঘরাই, অবিনাশী গোপনতা সেইক্ষণে নেহারিয়াছে, ইহাতে সে নির্ঘাত আর ডোমপুত্র নহে!
