তিনি, মনিব মহাশয়, অতঃপর চলিতে থাকিয়া আপন প্রসারিত করপুটে ঐ মিছরি ও মেওয়া দর্শনে অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিলেন না, ইহাতে অত্যাশ্চর্য্য ভালবাসা ছিল। এ কারণ যে পশ্চিমের পত্রভেদী সূর্যরশ্মিতে স্ফটিকতুল্য মিছরিখণ্ডে অজস্র রামধনুর আশ্রয় হইয়াছে, কিসমিসগুলিতে রঙ ধরিয়াছে, ইহারা বহু পুরাতন হইয়াছে।
এবং যে ইহা হইতে চক্ষু তুলিতেই তিনি থ, হস্ত হইতে তখনই প্রসাদী সকল মাটিতে পতিত হইল, যে সেইদিকে তাকাইবার সময় পর্যন্ত পাইলেন না, অথচ যে তিনি প্রসাদ পতিত হওয়ার অপরাধে আপন জিহ্বা দংশন করত আপন কর্ণদ্বয় মলিতে থাকিলেন, কেন না এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখিলেন: এক। মৃত ব্যাঙ, যাহারে লইয়া দু একটি কাক ছিন্ন করিতেছে, তিনি ইহা যে তীর্থক্ষেত্র তাহা ভুলিলেন, কোন। শিব জয়ধ্বনি আর শুনিতে পাইলেন না।
যে এহেন দৃশ্য তদীয় গৃহদ্বারকে পৰ্য্যন্ত আঘাত করিল, সাঁওতাল গৃহদ্বারে কত লতাপাতা, বাঙ্গলার গৃহদ্বারে এস মা আনন্দময়ী–এহেন দৃশ্য তদীয় মমত্ববোধকে পরিহাস করিল। এবং যে তিনি নির্ঘাত, তিনি নির্ঘাৎ হঠাৎ, যেন মনে মনে কলের গানের কাছে যাইলেন, আপন আসবাবপত্র জামাজুতা দেখিলেন, স্ত্রীর ফটোগ্রাফের নিকট দাঁড়াইয়া খানিক, তৎপর যেন পাইপ ধরাইয়া একটি টান দিয়া সিদ্ধান্ত করিলেন, যে ঈদৃশী নির্দয় দুষ্কৰ্ম্ম অভ্রান্ত যে সুঘরাই কর্তৃক সংসাধিত হইয়াছে।
তখনই তিনি স্রিয়মাণ ইহাতে; অবিলম্বেই বুঝিলেন যে সে যেন দারুণ শিক্ষিতের মত রূপান্তরিত, যে তাহার নিজের মস্তকের করোটি সম্পূর্ণরূপে বদল হইয়া গিয়াছে; যে সে নিজের উপর ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়াছে, একের পর এক সংস্থান সে ক্রমাগত আশাতে, কখনও কৌতূহল প্রবর্ত্তীত হইয়া ভাঙিয়াছে ও যে ইত্যাকারেই ক্রমবর্ধমান রাগে, বিশেষত নিজেরে অপাঙক্তেয় ক্কচিৎ জানিয়া, কভু নিরুপায় বুঝিয়া, সে মারাত্মক আধুনিক হইয়াছিল; অধুনা সে যে ডোম ইহাও বিস্মৃত; যে এবং সে মানসিক বৈগুণ্যে পথের কুকুরকে ঢেলা দ্বারা আক্রমণ করিয়াছে, যে অনেক নিরীহ কাঠবেড়ালীকে ক্রুর সর্পের হিস শব্দে খেদাইয়াছে।
যেমনভাবে সে তদ্রূপ বিষাক্ত আওয়াজে তাহার আপনকার প্রাণপ্রিয় জীবিত স্বরূপ তিতিরটিকে একদা ভয় প্রদর্শন ক্রমে খুসী হয়, মনিব মহাশয় বুঝিলেন, সেই প্রবৃত্তির নাশ হয় নাই, অথচ কিন্তু ঐ ব্যাপারের জন্য সে, সুঘরাই, তখন অপ্রতিভ হয়, তখন অধোবদন হয়; যাহা এইরূপ ঘটে: শনিচারোয়া সেদিন না আসাতে সুঘরাই ভিতরের বারান্দা ঝাঁট দিতেছিল, তদীয় পাখীটি নিকটেই এবং উহার গাত্রে সকালের রোদ খেলিতেছে, যাহা সহসা সুঘরাই অবলোকনে আবিষ্কার করিল; যাহাতে সে অতিশয় তন্ময়; এতদ্ভাবাপন্ন রহিতে ক্রমে, তাহার সারা দেহ এক যাদু আবেগে তছনছ হইল, রোমকূপে ঘোর শব্দ উঁচাইয়া হৈ দিয়া উঠিল।
যে আর, সে এরূপ বাক্যে আপনাকে, সে উচ্ছাসকে, প্রকাশিল,–ওরে আমার সোনার পক্ষী দেখ, দেখ, এখন আমার সর্বশরীর তোমার প্রীতিবর্ধন নিমিত্ত, তৃপ্তিসাধন হেতু, সম্পূর্ণ পতঙ্গরূপ ধারণ করিয়াছে, হে রে পক্ষী তুমি আমারে সত্বর খাও, হে রে তুমি আমারে বিনা লবণেই খাও, আমি সার্থক হই! ইহা বলিবার পর মহা আদরে গদগদভাবে সোহাগাত্মক ভাব জানাইল ও তৎসহ সে নিজ হস্ত প্রসারিত করিল, যাহাতে তাহার প্রিয়তম পাখীটি চঞ্চদ্বারা উহার হাতে মৃদু টোকা দেয়।
সে ভারী খুসী, যে এবং ইহাতে অঢেল উফুল্ল হওয়ত আপন দেহ, উপস্থিত তদীয় দেহ যাহা চতুষ্পদ ভঙ্গীতে ছিল, তাহাতে যেন গোপন কোন দুর্লভ কিছু ভোজ্য বস্তু পাকিয়া আছে, তাহাই দেহ। হইতে, অদ্ভুত ভাবে আন্দোলনে সুঘরাই উৎক্ষিপ্ত করিয়া তিতিরটিকে দিতে চাহিয়াছে, কি-যে-নিবেদন করে তাহা ব্যক্ত করিতে অনেকই বাস্তবতা, অনেক প্রাচপ্রত্যক্ষ প্রতীয়মানতা সে স্মরিয়াছে।
ও যে অবিচারিত চিত্তে অসাধনেই ডোমবুদ্ধিতে বলিয়াছিল,–ওরে পক্ষী, এখন আমি নিজেই ঐ যে দুইটি পাহাড় স্পর্ধাভরে একে অন্যের প্রতি চাহিয়া আছে সেই দুইটিই আমি, এখন আমি ত্রিকূট, এখন আমি ডিগরিয়া পাহাড়, এবার ইতোমধ্যে যে দিক সকল, যে রহস্য ব্যাপ্ত, তাহা কজা করিয়াছি, তুমি সত্বর তাহা গ্রহণ কর গ্রহণ কর, খাও আমি সুখী সার্থক ও ধন্য হই।
পরক্ষণেই বলিল, আয় আমরা কামড়াকামড়ি করি, কুকুররা যেরূপ করে! আমার ভগনীপতি ও তাহার স্ত্রীলোক যেরূপ করে।
এবম্প্রকার বচন সুঘরাইএর নিজেরই, হৃদয়ঙ্গম হইতেই সে হরষে কণ্টকিত, সে অতিকায় সুবিশাল, এখানেই এই দেহে সূৰ্য্য উঠে ডুবে ইহা প্রমাণিত হইতেই সে অধীর আছে; ভাগ্যে পক্ষী দূরে যায়, ভাগ্যে ঝাঁটা নিকটেই আছে, আর যেটি ধরিতেই সে প্রকৃতিস্থ হইল! তাই সাব্যস্ত হইল যে, সে ভীত ও যে এহেন ভীতি সম্পর্ক সুঘরাই একদমই অপরিজ্ঞাত ছিল; নিশ্চয়ই ইহা সর্প বিছা ব্যাঘ্র অন্ধকার ঝক্কা বজ্রপাত প্রেত পেয়াদা ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণ হইতে,বা ঠকিবার ভীতি হইতে ইহা, মোটর গাড়ী হইতে ইহা হয় অধিক কূট, বাঁকা!
এখন, সম্মুখে কোন কিছু কম্পনে অনুভবের পূৰ্বেই যে ঝাঁটার জলদি শব্দ কিন্তু তাহারে আকৃষ্ট করে, এখন দেশীয় ঘৃত মিশ্রিত মুরগীর মাংস পাকের গন্ধ তাহাকে প্রলুব্ধ করে নাই; যে অন্যবিধ গন্ধ হইতে ঘৃতগন্ধ যে স্বাদু তা বুঝে ইদানীং! ঝাঁটার আওয়াজে সে আর এক হইল; ফলে ত্বরিতে উহা অনুসরণ প্রাবল্যে অচিরাৎ কালান্তক গোখুরা সর্পের হিস্ সুঘরাইএর জিহ্বায় ঘটিল, আর সে তখনই পরমাশ্চৰ্য্য ভালবাসাতে ঐ বিভীষিতকারী করাল হিস্ শব্দে তিতির পাখীটিকে, আতঙ্কগ্রস্ত করিতে বাহাদুর! মহা আহ্লাদ তাহাতে, সে আপন কৌশল দেখাইবার নিমিত্ত চারিদিকে দেখিল, পরক্ষণেই হিস্ শব্দ খেলিয়া উঠিল, ইহাতে সকালের হাওয়া বজ্রাহত, মানুষের রক্ত নিস্তেজ প্রাপ্ত হইল।
