ইনি বলিতেছিলেন, রাম নামে আঁখি ঝুরে…! এই সূত্রে, যদিও ঐ উপদেশ-ইঙ্গিত চমৎকার।
তবু বলি একদা, আমার পরমারাধ্য মাধব আমায় বলিয়াছেন, ‘ভগবানের নামে, আমার নামে শিশু গাত্রগন্ধ যে না পায়, সে আমারে পায় না’ আঃ শিশু গাত্রগন্ধই রাম!
কথকঠাকুর এমনভাবে, রাম উচ্চারণ করেন যেন চিরঞ্জীব হনুমানের চোখে জল আসিল।
ঐরূপ রাম উচ্চারণে যে সুঘারইএর অদ্ভুত রোমহর্ষাদি লক্ষণসমূহ উপস্থিত হইলেও, ওষ্ঠ এখন আর্দ্র হইলেও, কোথাও যেমত বা আড়ষ্টতা জড়তা সঙ্কোচ জাড্য কুণ্ঠা অপ্রতিভ, মেদাটে বৈলক্ষণ্য আছিল, এবার হঠাৎ সে ক্ষোভে অনুতাপে ক্ষিপ্ত, কেননা নেতৃবর্গশিক্ষিত কীদৃশী কদর্য্য, কি পর্য্যন্ত প্রমত্ত হিংসাপ্রযুক্ত, জগতের-নীচতম বৃত্তি সেই রাজনৈতিক রোলে তাহারই সুঘরাই স্বজাতিবৃন্দ বেচারী হরিজনরা, এহেন সুন্দর রাম নাম মধ্যে মধ্যে করে, তাহাদের সেই চীৎকারের সহিত তাহাদের উৎকট গাত্রগন্ধ স্থানকে অপবিত্র করে।
এবং সে হঠাৎ ‘আমি ডোম’ ‘আমি ডোম’ ইত্যাকার অনাৰ্য্য চীৎকারে–এখান হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়, এইকথা মনে পড়িতে ‘আমি ডোম’ ‘আমি ডোম’ বলিতে ইহাই ধৰ্ম্মত অর্থাৎ ব্যক্ত হয় যে মনুগণের পূৰ্ব্বে বহুকাল হইতে আমি হারাইয়াছি!–তাহার পশ্চাতে সঙ্গে সঙ্গে রাম নাম নিশ্চিত গিয়াছিল। এবং মনিব মহাশয় যে ব্যক্তির নিকট সংবাদ লইতে এতেক বর্ণনা করেন, তাহাকে সুঘরাই বিষয়ে আরও প্রশ্ন করিলেন–এবং তৎসহ তাহার অন্তরে প্রার্থনা শ্রুত হইল, যে, হায় ঠাকুর তুমি অন্তৰ্য্যামী তুমি তাহার । শুভাশুভ সবই জান, তবু…।
.
অনন্তর তিনি, মনিব মহাশয়, যারপরনাই অবসন্নচিত্তে, পরিশ্রান্ত হওয়ত শিবগঙ্গার ধারে আসিলেন, এখানে তাঁহার গায়ে আদ্র মসৃণ বাতাস কিয়দংশে তাঁহার ক্লান্তির অপনোদন করিল, দেখিলেন উদ্বেলিত জলস্তর, অদূরে জনৈকা লোলচৰ্ম্মাঙ্গিণী অশীতিপর বৃদ্ধা, দেহ যাহার নজ, এখন জলে রহিয়া মুখ প্রক্ষালনে নিয়োজিতা, যে এবং তজ্জন্য তদীয় বিশুষ্ক কদাকার প্রলম্বিত নিৰ্বাপিত স্তনদ্বয় জল-ছোঁয়া, সুতরাং জলস্তরে ভাসমান ফুল ও পাপড়ি যাবতীয় উহাতে আসিয়া লাগিয়া ঠেকিয়া সরিয়া আঘাতিয়া । বিলি কাটে, অতএব এতাদৃশ সমাপতন, যদি অপি এলেবেলে, বড়ই কৌতুকপ্রদ, স্রেফ ফাজিল।
ইহা প্রত্যক্ষেও যে তিনি কোনই মজা আহরণ করেন না, এ কারণ যে সদাই তাঁহার মনে ইহা আঁচড়াইতে আছিল, ‘পুষ্পদন্তের’ শ্লোক আমার কণ্ঠস্থ করা বৃথা, কোথায় শিবই মদীয় অদ্বিতীয় স্মরণ মননের বিষয়ভূত হইবেন, না, কোথায় আমি ডোমপুত্র সুঘরাইএর সন্ধান করিয়া ফিরিতেছি। এই কি আমার নিয়তি।
মনিব মহাশয় ইদানীন্তন বৈচিত্তপরতন্ত্র সর্বত্র শ্যেনদৃষ্টিতে বিশ্লেষিত করিতে এক মহা আনন্দময় অগ্নিতুল্য দেদীপ্যমান যোগীকে দেখিলেন, দর্শনমাত্রই বিশ্বাস ইনি মহাপুরুষ, ইনি যে পরমহংস তাহাও নিশ্চয়, কেননা ঠাকুর রামকৃষ্ণ ইহাদের লক্ষণের কথা বলিয়াছেন; সেই মহাপুরুষের নিকট বেশ কিছু সবস্ত্র ও প্রায়ই উলঙ্গ বালক বালিকা; যাহাদের তিনি নিশ্চয়ই তদীয় সুদীর্ঘ ধীরনেত্ৰ মেলিয়া একদৃষ্টে দর্শনে আপনাতে বালকস্বভাবে আরোপ করিতেছিলেন, এবং মধ্যে মধ্যে মেওয়া মিছরি বিলাইতেছিলেন; তিনি নবাগত দেখিলেই,–ওঁ তৎ সৎ, এস এস আমার সমক্ষে দাঁড়াও, তোমারে আমি নয়ন ভরিয়া দেখি, খেলা কর, কথা বল, আমি শুনি, ওঁ তৎ সৎ।
মনিব মহাশয় সাষ্টাঙ্গে প্রণামের পর নিবেদন করিলেন,–ভগবান, আপনি করুণাময় ক্ষমাশীল, আমার অপরাধ মার্জনা করিবেন, যেহেতু আপনি বালকবালিকারে সাধন আদর্শ বলিয়া মান্য করেন, জ্ঞান করেন ও তদ্বারা অদ্ভুত সরলতা নির্মাণ ও তদ্বারা, ঐ সরলতার দ্বারা, অদ্ভুত রঞ্জু নির্মাণ করেন, তাই নির্ভয়ে আপনারে জিজ্ঞাসা করি, এক বালক–এই পৰ্য্যন্ত বলিতেই সেই মহাপুরুষ, মৃদু হাস্যে, ইহাতে সৃষ্টিতত্ত্ব যেন নড়িয়া উঠিল, কাব্যবৃত্তি বিকচ হইল এবং কহিলেন যে,–সে কাছে আসে নাই, প্রত্যেক বালকবালিকা তাহারে অভয় দেয় তবু,–আহা আমি তাহা দেখিয়াছি এক বালক যখন আর এক’কে অভয় দেয়–সে এক বলিহারি ছবি!…
তিনি সহাস্য বদনে আরও বলিলেন সম্ভবত এত ছোটদের মধ্যে যাহারা মাথায় ঘোট সেই সকলের উলঙ্গদের মধ্যে কি যাইব, ভাবিয়া সে চলিয়া গিয়াছে, আমার নিকট সে’ও ইহাদের মতই, তবু সে আমার আহ্বান বুঝে নাই…এখন এই মিছরি লও, মেওয়া লও, বেচারীর মুখ শুকনা। লও, তাহার মঙ্গল ইচ্ছাময় করিবেন।
মনিব মহাশয় সশ্রদ্ধায় করজোড়ে মেওয়া মিছরি গ্রহণ করত মহাপুরুষের পদাৰ্চ্চনার পর ধীরে কহিলেন,–প্রভো, আপনি সেই যিনি পত্র উদগম রহস্য দেখিয়াছেন, আপনার হাস্যে অচিন্ত্যনীয় শ্লোকপ্রবাহ, আপনার চাহনিতে শত বাত্যাতেও দীপশিক্ষা অস্পন্দ হয়, আপনি জ্ঞাত যে সেই অভাগা কেন আপনার সন্নিহিত হয় নাই; সে ঐ সময় এক দাঁড়কাকের রব শুনে যখন আপনি তাহারে আহ্বান করিলেন, সে দেখিল যে এখানেই আপনার নিকটেই বাঘেরা খেলোয়াড়ের ঘুম ভাঙ্গিল, অর্থাৎ আপনার নিকটেই উহার ঘুম থাকে, যে সে দেখিল এক উন্মাদ তুলা পিজিতেছে, এবং পরক্ষণেই আবার মহানন্দে অচেনা আকাশ লইয়া খেলা করিতেছে, আমার বুদ্ধি বলে, ইহা আপনি তাহারে দর্শাইলেন। সে অথচ ভীত হইল। সে কাষ্ঠচ্যুত কূৰ্ম্মবৎ এক অভিনব জীব, তাহারে রক্ষা করুন, হায় সে অবশ্যম্ভাবিতার দিকে ছুটিল!
