তৎকালে পানের দোকান হইতে, হে ম্যাজিকওয়ালা তোমার ডম্বরু ও বাঁশী শ্রবণে সেই উচ্চবর্ণের ভাবনার দ্বন্দ্বের ছেদ পড়িল। ম্যাজিকওয়ালাই তাহার উত্তর। সঠিকভাবে বলিতে গেলে বলা যায় যে সে যেন বাঁচিল; ভাগ্যশঃ সে বালক, তাই তোমার ম্যাজিক দর্শন জন্য ঔৎসুক্য-পরতন্ত্র দৌড়াইয়া আসিতে এক নিমেষ ত্রিকূট পাহাড় তাহার চোখে পড়িল; তোমার এখানে সে অব্যাহতি লাভের পর একদিকে বড় স্বস্তি বড় স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে, তেমনই তোমার নৈপুণ্য দেখিতে তাহার মনে হয়, হায় মনিব মহাশয় ও তদীয় পত্নীর কত জিনিষ খোয়া যাইতে সে নিজে তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া বাহির করে, আর অদ্য সে নিজেই হারাইয়া গেল!
এবং লকড়কে সে যথেচ্ছা গালাগাল দিল; তাই সে ক্রমে পুনরায় বিমর্ষ এবং তজ্জন্যই তুমি যখন খেলা দেখানোর পর মহাচাতুরিতে নরকপালটি স্বীয় মুখের সন্নিকটে উন্নীত করত, তোমার বিড়ির ধোঁয়া, যাহা নীল, ঐ নর কপালের ছিদ্র দিয়া বালখিল্যতাবশত পাচার করাও, ফলে, কপালের করাল। দন্ত বহিয়া ধূম অনর্গল বহির্গত হয়, ইহা প্রত্যক্ষেও সে অন্যান্য সবস্ত্র ও উলঙ্গ বালক বালিকাদের মত হাসে নাই, সে কোন দিকে গেল জান! সে ম্যাজিকের কৌশল হইতে, জট হইতে, ক্রমশঃ খুলিয়া সহজ হইয়াছিল।
ইহা ধ্রুব বটে যে, আপনারে সনাক্তকরণে অকৃতকার্য হওয়াতে এবং যে আমার একটি পাখী আছে–এখন, উপস্থিত যাহা নাই ইহা ভাবিতে সে অধিকন্তু মুষড়াইয়া পড়িল, যেমত সে দ্বিগুণ হারাইয়া গিয়াছে; তাহাতে বিজাতীয় আক্রোশের ধমক উদগত হইতে চাহিল, সে দুবৃত্ত যেমন, কাহার উপর যে রুষ্ট সে ইহা বুঝিতে চাহে নাই; এমনও যে এখানে সেখানের মোটা নিম ডাল দিয়া পাথরে সিদ্ধি পেশাই করা দর্শনে প্রলুব্ধ হওয়ত, প্রসাদের নিমিত্ত কিয়ৎ দূরে দাঁড়াইতে সম্প্রতি কোন সুমধুর পাঠের আওয়াজে সে আকৃষ্ট হইল; এবার পাঠ বন্ধ হইয়া গীত হয়, যথা–
তুলসী উহাঁ যাইয়ে যাঁহা আদর ন করে কোই।
মান ঘটে মন মরে রাম কো শরণ হোই ।৷
আসমুদ্রহিমাচলে যে যেখানে রোমাঞ্চিত হইল, তাহার এই শুদ্ধ গীতের শব্দতরঙ্গই কারণ; এখানে অনেকের পুলকাতে নয়নযুগ সজল, অনবরত রামনামে স্থান সুন্দর হইয়া উঠে; ইহাতে সুঘরাই বুঝে যে সম্মুখে রামায়ণ গান হইতেছে, কিন্তু তদীয় মানসিকতা অত্রাহি সত্ত্বে সে স্থান পরিত্যাগ করে নাই, প্রথমত সে মর্মে মর্মে জানে, যে তাহার সন্ধানের মধ্যে দেবালয়, সন্ন্যাসী, অবধূত, গীতা বা রামায়ণ পাঠ আমাকে চুম্বকের মতনই টানিবে, যেহেতু আমি ও মদীয় পত্নী অতীব ধর্ম্মপরায়ণ, যদিও জানি সে নীচকুলোদ্ভব এবং এই ব্ৰণবিরহিত পবিত্র রামকথা যাহা মোক্ষ ও প্রীতিদায়িকা, তন্মিমিত্ত অবশ্য তাহার কোনই মতি নাই,–উহার বয়ঃক্রম ইহার কোন হেতুই নহে,–তবু তাই সে কিছুকাল বাধ্য হইয়া যাপন করিবে; এখন উক্ত গীতে সে আলোড়িত বিশেষত কথকের বিন্যাসই তাহার অনুপ্রেরণা হইয়াছে।
কথক ঠাকুর বলিয়াছিলেন, রে পাগল মন, ওরে তুলসী তুই ছায়া ত্যাগ করে রৌদ্রে যা; তুমি ভুজালিঙ্গন ছাড়িও, এমন স্থানে যাইও যেখানে অহঙ্কার অহরহ দলিত হয়, যেখানে তোমায় উচ্ছিষ্ট দেয়, লোকে দূরদূর করে, আগুনটুকু চাহিলে হাঁ হাঁ শব্দে তাড়না করে, কাহারও প্রজ্জ্বলিত দীপ হইতে দীপ জ্বালিতে যাইলে সে ভাবে আমি সর্বস্বান্ত হইলাম–সেখানে মন যাও, যেখানে মরমে তুমি ম’র, তোমার কেহ নাই, পরিজন নাই, তুমি একা সম্পূর্ণ তুমি যখন আপন বোঝা তখনই যখন ঠিক ঠিক দুঃখ পাইবে; তখনই রাম স্মরণ হইবে, অবশ্য দুঃখ অনুভবের মধ্যেও আমি আছে; তবে, এই আমি’র দোষ নাই, সেই আমি’তে রাম নাম স্মরণ হইবে। তেমন দুঃখের মধ্যে তেমন দুর্ভাগ্যের মধ্যে স্বতঃপ্রবৃত্ত হওয়ত হে মানুষ তুমি যাইও। রামের কথা স্মরণ হইবে। হায় রাম বলিতে পারিবে।
যথা ভূমি সব বীজময় নখত নিবাস আকাশ।
তথা রাম নাম সব ধরমময় জানত হি তুলসী দাস ॥
সুঘরাই এই গীতে ডোমসুলভ চোখে, বালক-উচিত ভঙ্গীতে গায়কদের মুখপানে চাহিয়া থাকে, ইহা অলোকসামান্য কাব্য, কাব্যত্ব ইহা তাহার নির্বুদ্ধিতা বশত সরলতায়ে নহে, তবু সে অন্যমনে দেখে। সরলতা যাহা ভক্তির বীজ, অবশ্য কোন শিশুরই সরলতা নাই, তাহার অপরিণত স্বভাব আছে, সরলতা সন্ন্যাসধৰ্ম্মের, সরলতা সন্ন্যাসীর, অবতারাদির ভাবই সরলতা–ঐ সুর উঠা পড়া দার্ভঙ্কুর রোমন্থনকারী মৃগশিশুর ন্যায় ক্রমে এখন দেখিতে লাগিল।
অবশ্য সে ডোমপুত্র, গীত শুনিতে ডিগরিয়ার পাহাড়, যেখানে সূর্য ডুবে তদবধি শঙ্খচিল যেখানে বিন্দুবৎ, পদ্মের কোরক যে পর্যন্ত গিয়া কুৎসিত, তদবধি ‘ভূমিতে পরিবর্তিত হইতে পারিল না, হায়! আমি ভূমি, বলিতে বিবেক তাহার হয় নাই; অন্যপক্ষে অবশ্য, আকাশ কথাতে, তদীয় শরীরমধ্যে বিপরীত পাকে, কি এক কিছু যেমন বা ঘুরিতে থাকে, কিন্তু ঐ প্রক্রিয়া অভাবনীয় ধীরে; সে অবশ্যই মশাল তৈয়ারী করে যদ্বারা আকাশকে দেখিবে, যে সে তখনই নিজেরে ঐরূপ কর্মে ব্যাপৃত অবস্থা বুঝিয়া ধড়েতে আর ছিল না, তাহার ওষ্ঠ শুষ্ক হইয়াছে, কেননা মধ্যে কোথাও, এই ব্যোমের, মেঘাশ্রয় নাই,–ক্রমান্বয় সন্ন্যাসীর দৃষ্টিতে নিশ্চিহ্ন হইয়াছে যাহা।
হায় সে ঐ পদবন্ধের যথা’র নিয়ন্ত্রিত, আনীত বাস্তবতায় আতান্তরে তাহাকে নিক্ষেপ করিল, সে গণৎকারের গলা যেন পাইল, যে এবং ইহাতে আরও মূঢ় সে হয়; তবু কোনওক্রমে কথকঠাকুরের দিকে দৃষ্টিপাত করিল।
