যে, আয়নাতে যে সে-ই, নিজেই, যে যাহাকে সুঘরাই নামে ডাকিলে সাড়া দেয়, যে জাতিতে হয় ডোম, গোত্র যাহাদের নাই, অতীব স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিকভাবে সে হয় ডোম, যাহার দৈবাৎস্পর্শে পূজার্থিণী গরদ পরিহিতা করুণাময়ী সৰ্ব্বদা স্নেহশীলা মনিব পত্নীশিহরিত, জয়দেব পাঠ স্তব্ধ, হস্ত হইতে পুষ্প সাজিচ্যুৎ হয়, পুনরপি তিনি স্নান করেন–এই তিলেক পরিচয়ে অবধি লিখিত নাই সে বিজাতীয় ঘৃণা হইতেও বঞ্চিত হইয়াছে–আর উচ্চবর্ণের ঘৃণা যাহা তাহার জীবনই যে, যাহার পিতা নাই, মাতা নাই, ভ্রাতা ভগ্নী নাই, পত্নী নাই–যে যাহার মহান-হৃদয় মনিবরা আছেন; যে যাহাদের সমভিব্যাহারে এখানে আসিয়াছে; যে সে অধুনা হারাইয়া গিয়াছে; কিন্তু কিছুই বিশদ হইল না।
যে সে-আয়নাতে নেহারিল মাত্র যে এক ভূমিকৰ্ষণকৃত জমি, পূৰ্ব্ব ফসলের গোড়া পর্যন্ত যেখানে নাই, এইবার খর অকর্ষিত জমি মতন রঙের কাহাকে কোন অবয়বকে দেখিল, আশ্চর্য্য যে সে জল চাহিতেছে, ইহাতে সুঘরাই ঢোক গিলিল,-জল!
জল ত দান করা হইয়াছে–জল পিতৃলোকে গিয়াছে! কিন্তু সে এতই তৃষ্ণার্ল্ড–তৃষ্ণার্ত না ভীত– আয়নায় প্রতিভাত মূর্তি দেখা গেল ঢোক গিলিল, ইহাই তাহার পূর্বপুরুষ; যে উহা কাহার প্রতিবিম্ব, ঈদৃশ প্রশ্নে সে বিস্ফারিতনেত্রে প্রৌঢ়শীলা সদৃশ; এমনও সুতরাং ফলে মানে, অর্থাৎ, যে উহা আমিই ত, এহেন বাক্য নিশ্চয়ত্মক করিতে, বাস্তবিক করিতে, যে, স্বভাবত লোকে নিজ বক্ষে হস্ত স্থাপনে, অথবা এক্ষেত্রে অঙ্গুলি দ্বারা যেমন নির্দিষ্ট নিজেকে করে তেমনই এখন তাহার, সুঘরাই এর, সেই বৃত্তির অভাব। থাকে; আরও যে, ‘উহা’ এই শব্দ ব্যবহার করিতে আপনকার অজ্ঞাতেই সে মূঢ়মতি–আর যে ইহা অবিশ্বাস্য নহে। সম্মুখে তাহার শনৈঃ সংজ্ঞাবিধ্বংসী নিঃশব্দ!
চেঞ্জাররা যে কোন তুচ্ছ কিছু নিরখিয়া কহিল–ভাবা যায় না কি গ্র্যাণ্ড! ইহারা তাহারা যাহারা স্বপ্নের ভার বহে! যাহারা স্থাবরকে সংবেদনশীলতা দিয়াছে।
ইতঃমধ্যে সুঘরাই আপনার পিছনে তাকাইল, সেখানে কেহ নাই, সেখানে ধূলা উড়ে, সেখানে পাতা বিদ্যমান; তখনই সে সভয়ে নেত্রপাত করিল, অদূরে বিভিন্ন তিলকধারী লোকেরা একের পর এক সাধক যায় ও আসে, ইহাদের দর্শনেই বুঝা যায় যে কে কোন সম্প্রদায়ভুক্ত, সে অবাক নয়নে তিলমণ্ডিত ললাট লক্ষ্য করিল, এমনভাবে করে যাহাতে বুঝায়–যে তাহার আক্ষেপ হইল, যে সে তিলক পাঠে অপরিজ্ঞাত, ইহা ঠিক যে বিবিধকণ্ঠের জয়ধ্বনি তাহাকে এখন চালিত করিল এবং আবার সে আয়নায়, ইদানীং সে নিজ হাতের উল্কীকৃত নীলাভ ডাং-উদ্ধত কিদিম কাঠকোম-টি ভারী অঝাঁপসা দেখিল; এখনও উল্কী বিধায়ে তদীয় হাত কিঞ্চিৎ ফুলো, কেননা ঐ বিছা উল্কী দুই হাটবার আগে, হাটেতেই করান হয়; ইহা তাহা স্মরণেই আঁকান যে, ঠিক সেদিনই সকালবেলা তাহার তিতির, তাহার ভগ্নীপতির গায়ের প্রায় এক আঙুল নিকটে উপস্থিত এক কাঁকড়া-বিছাকে পড়িমরি করিয়া দৌড়াইয়া আসিয়া ঠোঁটে ধরিয়া লইয়া ঠুকিয়া তৎক্ষণাৎ খাইল।
আর যে ইহা দর্শনে গর্বিত সুঘরাই উল্কীকরণের সঙ্কল্প করে: যে একটি তিতির ও তাহার ঠোঁটে একটি বিছা! কিন্তু দুইটির খরচা ছ’ পয়সা, আপাতত অগত্যা শুধু বিছাতেই সন্তুষ্ট থাকে; তিতির সে আঁকাইবেই, আঃ! তাহার চঞ্চপুট দ্বারা বিছা আক্রমণ, আঃ তাহার পক্ষদ্বয় কি মনোহর প্রসারিত হয়, আঃ! যেমন তাহা অনাদিকাল যাবৎ অমনই অফুরন্ত পক্ষ মেলিয়া আছে।
এখন আয়নাতে সে ওতপ্রোত, এবং বিছা উল্কী সত্ত্বেও এখনও কিম্ভুত সন্দেহ তাহাতে বর্তমান; যে সে কিছুতেই কোন উপায় ঠাওরেও সে চিনিতে পারে না ঐ প্রতিবিম্বকে; কেবলই আরবার আপনকার নিরীহতা, ইনোস্যান্সএ ভ্র সটান করে। আবার অন্যপক্ষে নিজেকে নিশ্চয়ই “উহাই’ শব্দে অভিহিত করিতে, সনাক্ত করিতে, সে নিজে ভীতিপ্রদ প্রহেলিকা।
কি হেঁয়ালীপূর্ণ আবছায়া! অঙ্গভঙ্গী মুখবিকৃতির প্রয়াস সবই বিদ্রুপাত্মক অন্ধকারে পরিণত; ক্রমে ইহা তাহার মনে পড়ে মানে অস্বস্তি হয়, যাহা এই যে, তাহার কেহই, এমনও যে তাহাদের জাতের মোড়ল, এমনও যে অনেক–তাহাদের অপেক্ষা উচ্চবর্ণের, যাহা এই জল-চল জাতের লোক যেমন আপন বয়ঃক্রম জানে না, ঠিক তেমনই, তেমন সেও যেমন নিজ বয়স জানে না, তেমনই নিশ্চয়ই সেও আপনার চেহারাবিষয় কিছুই জ্ঞাত নহে, যে চেহারা কুয়োর কাঁচ-জলে প্রতিবিম্ব, আর অন্যসূত্র হইতে তাহার শোনা-দেখা নহে!
সুঘরাই এর মনে হইল, সে যেমত ভাসিয়া আছে, তাহার দেহ নাই, মৃত্তিকা নাই, এবং হঠাৎ সে আপনার বিছা-আঁকা হাত আঘ্রাণিল; যুগপৎ দেখিল ঐখানে, আয়নাতে যে উহা, যে সে সে-ই, যে হারাইয়াছে, ইতিমধ্যে একদা যে মনে হয় আমার চেহারা নাই, তবে আমি হারাইব কেমন–এবম্বিধ ধারণা সর্বৈব বলদ!
আমি উহা, আমিই উহা এবং ইত্যাকার বলিতে ও ভূমিতে পাবাজাইয়া কবুল করিতে, সবিশেষ আত্মপ্রত্যয়-নিবন্ধন সে মরিয়া হইল; আমি ও উহা যে অলৌকিক বিবাহযাত্ৰা আমি দেখিয়াছি, সেই চৈতন্য সত্তা তাহার জড়তা ভাঙ্গিল; ইতিমধ্যের ঘোর ব্যবধানকে সে পান করিল, সে ইহাতে বেসামাল হইল; সহসা শ্রুত হইল যে সে, সাদরে ‘আতিতি-তি’ শব্দে উহাকে তথা আপনাকে ডাকে; আবার আচম্বিতে ঘোষিয়া উঠিল,–আমি সেই যাহার এক পাখী আছে। ইহার সঙ্গেই জয় বাবা বৈদ্যনাথ ধ্বনি তুলিতে চাহিলেও বেচারা পারে না। যে এবং ধীরে কহিল,–উহা সেই আমি যাহার এক পাখী আছে। অথচ স্বরে কেন যেন মনে হয় পাখীটি বেহাত হইল।
