সে ধীরে চলিতে থাকিল, যে সে তির্যকভাবে একদল দুবৃত্ত পদবাচ্য যুবকদের দেখিল, ইহারা মলিন বস্ত্র পরিহিত, ইহাদের রাশিকৃত চুলে তেল নাই, এখন ইহাদের হাতে হাতে তাস, যে ইহারা জুয়া খেলিতেছে। নিশ্চয়ই মনিব মহাশয় এখানে আসেন, ইহাদের প্রতি তিনি যারপরনাই ঘৃণাভরে তাকাইলেন, যে ছিঃ এহেন শ্ৰীসম্পন্ন শহরে যেখানে শিব নিজে বর্তমান, যেখানে সেদিন গতবছর (১৯৩৪) ভূমিকম্পে যাহার ক্ষতিসাধন করিতে পারে নাই, এই স্থানের সব কিছু শিব, তোমরা কেন সেই পুণ্যকে পরিহাস কর! এই মনোভাব এই জন্য যে ইহারা কেহ তাস ফেলিতে সময়ে শিব জয়ধ্বনি দিয়াছিল।
তত্ৰাচ তিনি কিন্তু যেহেতু আপন দায়ে বাধ্য; তাই উহাদের অতিশয় নম্রভাবে, ইস কি লজ্জা! জিজ্ঞাসিলেন,–ভাই যে ছেলেটি তোমাদের তাস খেলা দেখিতে আগ্রহশীল হয়, এ কারণ যে সে মনস্থ করে যে, তাহার ভাগ্য যাহা ইতঃপূৰ্ব্বে গণৎকারকে সে প্রশ্ন করিতে পারে নাই, এখন তাহার অভীষ্ট কল্পিত দান দর্শনে, যাহা নিশ্চয়ই তোমাদের কেহ ফেলিবে, তাহাতে স্থিরীকৃত হইবে।
সে জানে না এইভাবে সময়ক্ষেপ হয়, সম্ভাব্যের খেলার মধ্যে নিয়ত ঋতুপরিবর্তনের আঙ্গিক চরিত্র রূপ আরোপ করা বৃথা, যখন সে বুঝিবে তখন সে তাই ক্রোধপরায়ণ হইবেই, যেমন স্বীয় যুক্তি খণ্ডিত হইলে, যেমন আশা ভগ্ন হইলে, যেমন মানুষে বিকারপ্রাপ্ত হয়! তোমরা তাহাকে বলিলে, তোমাকে কি দারোগাবাবু পাঠাইয়াছে।
সে, সুঘরাই, উত্তর দিয়াছে, তাহা নহে, ঐ যে তোমাদের পিছনে যে ঢাকী ঢাক আঁকড়াইয়া ঘুমাইতেছে, তাহার ঘুম ভাঙ্গিলে, মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাঙ্গিবে, কেন না উহার পায়ের ঘুঙুর ইতস্তত নড়িতে আছে, ঘুম ভাঙ্গিলে জিজ্ঞাসিব যে, বিসরিয়ার বাপ যে ডোম এবং ঢাকী, নিবাস রিখিয়ায়, যে নিত্য এখানে আসে তাহারে দেখিয়াছে কি না। ইতিপূৰ্ব্বে কর্মব্যস্ত ঢাকীরা কেহ বলিয়াছে জানি না।
তোমরা কহিলে, উহার, সেই ঢাকীর এখন জাগিবার সম্ভাবনা নাই, আমরা জানি, সে অহিফেন সহযোগে মদ্যপান করিয়াছে। ইহার পর তোমাদের একজন ঘুমন্তর নাসিকার নিকট উৎকট চরসের ধোঁয়া ছাড়িলে তাহার পর বালকের উদ্দেশে কূট মুখ খারাপ করিলে–বালক যেন তোমাদের স্বরে। আপন চীৎকারের আওয়াজ পাইল, সে তাই মাথা ঘুরাইয়া আত্মরক্ষা করে যেমন, বলিতে পার সে কোনদিকে গেল।
আঃ বেচারী মনিব মহাশয়!
তেমনই ম্যাজিকওয়ালাকেও একটি বালককে দর্শাইয়া নিবেদন তিনি করিয়াছেন,–এইরূপ একটি বালক ক্রমাগত বলদ চোখে অনেকক্ষণ ধরিয়া তোমার নৈপুণ্যে একদম নিঃসাড় জড়; এমনও যে, যে সে হারাইয়াছে তাহা সে ভুলিয়াছে; অবশ্য যখন মাঝে মধ্যে সম্বিৎ আসে, সে তোমায় সিদ্ধ মহাপুরুষ জ্ঞান করিতেছিল, অগোচরে সেও অলৌকিকতাকামী; যে এবং তুমি তাহারে তোমার কোন বিশেষ ছল–হাতসাফাই, প্রদর্শন জন্য দর্শক সাধারণের মধ্যে তাহারে মনোনীত করত আহ্বান করিতেই, বালক ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠে। তুমি অভয়দানে কহিলে,–আরে ডরো মৎ, ডর কেয়া। ডর এই যে, প্রথমত তাহা গ্রাম্যভীরুতা, এবং যে চিরতরে নূতন করিয়া সে হারাইতে চাহে নাই, সে কান্দিতেছে কেন না এখানকার সমবেতকণ্ঠে, তদীয় কান্নায়, হাস্যরোলের মধ্যে শুনে যে,যাও এখনই ভেড়া হইয়া যাইবে। বালকরা পুনৰ্ব্বার যোগ দিয়াছে,যাও না উহাতে ঐ মাথায়, স্থাপিত কঙ্কালটিতে মিলাইয়া যাইবে। এই বলিয়া সকলেই ভূমি উপরে রক্ষিত চমকপ্রদ করোটি কঙ্কালের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়াছে। আর যে সে বোন্ধান চোখে, সেই করোটি কঙ্কালের পানে লক্ষ্য করে, প্রত্যক্ষ করে যে তাহার ঘরপথ সকল, সে নহে, বোকার মত উহাতে ক্রমান্বয়ে ঢুকিয়া যাইতে আছে। যে এবং ব্যাকুলভাবে কান্দিতে ব্যক্ত করিল যে,–সে বড় হতভাগ্য, সে দুঃখী, সে মনিব হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে।
কিন্তু ইহার পূর্বাহে মানে এই খেলা দেখার আগে–যে সে বনপ্রদেশে একদা হঠাৎ আতা ফল দর্শনে যেমন চিনিয়া লইতে অপারগ হয় এখন তেমনই তাহার ভাবান্তর, যে সে হারাইয়াছে কি না ইহাও বিস্মৃত; কিন্তু এখন সে হারাইয়াছে; তাহার কথা শুনিয়া সমবেত ভীড় হাসিয়া উঠে; যে সে খুসী, সে খুসী।
হে ম্যাজিকওয়ালা,–তুমি তাহারে অব্যাহতি দিলেও সে কোনক্রমে তোমারই পাশ বরাবর আসিয়া দণ্ডায়মান থাকে, এখানে সে ঐ পূৰ্ব্বদৃষ্ট সন্ন্যাসীর মতই নিশ্চিন্ত, ইহার আসল কারণ এই যে, আমি তাহার মনিব, তাহার খোঁজে আছি, এখানে যদি আসি, স্বভাবত আমি ঐ নরকপাল হেরিয়া কি খেলা চলে তাই ধারণার নিমিত্তই, তোমা পানে তাকাইব ইহাই মানুষের প্রকৃতি মানুষের চরিত্র, হৃত বস্তু সম্পর্কে নূতন করিয়া অবহিত হইব আর যে তাহাকে দেখিতে পাইব। সে অনেক সময় যাবৎ ঐ ভাবে ছিল, যেহেতুও সেখানে সম্ভবত হাড়ের খানিক ছিল। কখন সে চিন্তার রহস্য ছাড়াইয়া–বদ্ধজীব ডোম।
ইহা এক গূঢ় কারণেই যে সে এই পরিবেশ ত্যাগ করিতে চাহে নাই। তোমার বাঁশীতে তাহার মন ছিল না, সে শুধু এই স্থলকে কজা করিয়া দাঁড়াইয়াছিল, কেননা কিছুক্ষণ আগে তাহাতে কোন প্রকারের, ইহার সর্বথা উকট, কীদৃশী কুটিল, অভিনব অমানুষিক বিভীষিকার সঞ্চার হইয়াছিল।
এবং ইহা তৎকালেই ঘটিল, যে মুহূর্তে সে আমাদের প্রমত্ত হইয়া অন্বেষণের মধ্যে অবলীলাক্রমে, ঐ সুসাজান পানের দোকানের সৌখীন উৎকৃষ্ট আয়নাতে এক মায়াবী প্রতিফলন সাক্ষাতে নিশ্চল, যে সে ব্যামোহাবিষ্ট, যে সে পূর্ণ সম্মোহিত হইয়া থাকে; অবশ্য খানিক বাদেই এবার তাহার হৃৎপিণ্ড কাঁপিল, এবার তাহার তালু শুষ্ক হইল এবং যে সে পদমেক পশ্চাতে হটিল।
