সত্যই দুঃখের কথা বটে, তবে ইহা ত অনায়াসেই হইতে পারে…যে সে এখানেতে পাখীটা রাখিয়া যাইতে পারে। এখানেই ত থাকে ও হারামজাদা! ওর পাখী থাকিবে!
ও বাবা এখানে! ঐ মালী বেটা তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, শনিচারোয়া (চাকর), বামুন ঠাকুর সব্বাই ওকে হিংসে করে, বলেছে তুই চলে গেলে পাখীটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসব’খন…সহিস পৰ্য্যন্ত, আর আর সবাই বলেছে…!
ইহা কি একটা কথা হইল, ঐ সব কথা মস্করা মাত্র, তাহারা আমাদের ভৃত্য, কখনও সাহস করিবে না…বৃথা চিন্তা করিও না…।
কি যে বল, সে কথা কি আমি বুঝি না, তবে যদি বল কেন, তাহলে বলি…তা’ উত্তুর এই, যে, দেবস্থানে গিয়ে ও ছোঁড়া শান্তি পাবে না, হরি কথা শুনতে এসে পুঁই আড়ায় (মাচায়) মন; তাতে পাপ হয়, ও’র ত হবেই আমাদেরও…রিলি মধুর ও…।
দেখ, তুমি দেখি বড়ই মায়াপ্রবণ, তুমি যাহাতে দুঃখ না পাও তাই সুঘরাই ডোম জানা সত্ত্বেও অর্থাৎ ইহা জানিয়াও যে, যদি ঐ হারামজাদা পাপকে কেহ যদি আঘাত দেয়, ছোট করে, তাহা হইলে নিশ্চয় আমরা দুজনেই মরমে মরিব…ইহা বুঝিয়াও রাজী হই, কোন আপত্তি করি নাই, কিন্তু পাখী কোথায় বহিবে…আচ্ছা পাখীটি গাড়ীতে যদি…।
খেপেছ, গাড়ীতে সে ছোঁড়া রাজি হইবে না…সে শিবগঙ্গার জল ছিটুবে, মন্দির দেখাবে…কত সাধ ওর!
সত্যই তুমি দেখিতেছি, স্নেহে অন্ধ হইলে, আমারে ভুল বুঝিও না, উহাকে মন্দির কি কথা, সে রাস্তায় প্রবেশ করিতে দেয় কি না দেখ, এতদ্ব্যতীত ঐ ঢাউস পৰ্ব্বতপ্রমাণ পিঞ্জর লইয়া, সেই জনারণ্যে, ভীড়ের চাপে কি খেলার কথা, কোথায় ঘুরিবে… ।
অবশ্য যে সে পাখীটিকে লওয়ার জন্য আর পীড়াপীড়ি করে নাই। এখন বুঝিল যে সে ভালই করিয়াছে এবং ইহা ভাবিতেই অচিরাৎ অলৌকিক বিবাহ, মিলন, যাত্রা দেখিল, মুহুর্মুহুঃ আমলকী আদি পুষ্পবৃষ্টিও হয়, জয় ভগবতী তনু জয় জয়, এবং তখনই আচম্বিতে পাহাড় ধ্বসিয়া পড়িল, যে বন্যফল হরিতকী আমলকাদি ছিন্ন হইয়া উৎক্ষিপ্ত হইল, খাঁচাটি হস্তচ্যুত হইল, বিদ্যুতেই পায়ের চাপে ভাঙ্গিয়া নয়ছয় নিশ্চিত, পাখীটি থরহরি, বিশেষত মুখোসটির ভৌতিক গতিবিধি দেখিয়া, এখন মুখোস পরিহিত ভিক্ষুক ও হরিজন ও নেতৃবর্গের পায়ের চাপে সে পাখীটি মরিতই, পালাইবার পথ পাইত না, আর যে অন্যপক্ষে সুঘরাইও সরিয়া আসিতে বাধ্য হইত, এবং সে ক্ষেত্রে মনিব মহাশয় কি বলিয়া খুঁজিতেন; সুঘরাই কোন কথাই গঠনে সফলকাম হয় না।
ক্রমে ইহাও বিচারিত হয়, যে যদি সে অনন্য উপায়ে মোহিলির গাড়ীতে রাখিত যখন সে মোহিলি রিখিয়া প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত তখন পাখীটিকে রাখিয়া আসিত, তাহা হইলে নির্ঘাত বৈকালে রিখিয়ায় পৌঁছিয়া শুনিত, মোহিলি লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলিয়া চলাফেরা করত, এক অঘটন বর্ণনা করিয়া, পরে শান্ত কণ্ঠে উপসংহারে বলিত, সিটা ভুলাই গে রে। ইহাতে বনস্পতি অসুখী হইতেন, এবং বরং বারবার ইহাই তদ্বারা অনুমিত হইল যে পাখীটি হাতে থাকিলে মহারাষ্ট্রীয় তীর্থযাত্রিণীদের অঞ্চলে অঞ্চল যেরূপ বাঁধা, সেইরূপ এই বন্ধনের ছবিত্বটি, তত্ত্বটি যাহা তাহাদের, তাহার ও মনিবদের মধ্যে অলক্ষ্যে জাগিয়া থাকিত, এমন যে আঁধি উঠিলেও সূৰ্য্য ডুবিলেও তাহা কভু ভ্রান্ত হইবার নহে!
.
এই সময় কোন পাণ্ডাঠাকুরকে, বগলে যাহার খেরোর খাতা, যে যাহাকে এক যাত্রীর পশ্চাদ্ভাবনে মহা উত্ত্যক্ত করিতে দেখিল, এবং অন্যত্রে ইহা, যে আর একজন পাণ্ডাঠাকুর স্বীয় বাম উরুদেশ উপরে ঐরূপ এক খেরোর খাতা খুলিয়া ছড়া-পড়া সুরে এক যাত্রীবর্গের বহুপূর্ধ্বতন পুরুষের নাম সাকিম। শাখাপ্রশাখার নাম ইত্যাদি পাঠ করিতেছে, শ্রোতৃবর্গ সকলে একে অন্যের মুখ অবলোকনে অদ্ভুত গৌরবান্বিত, তাহারা সকলেই প্রীত, যে তাহারা বহুদিন এই পৃথিবীতে বসবাস করিতেছে, তাহাদের বংশধারায় সময়ের অবাক ঐশ্বৰ্য্য, সৌরমণ্ডলের প্রতিটি নক্ষত্র তাহাদের চিনিতে পারে, তাহারা কুসুমের জন্ম দেখিয়াছে, নদী যখন প্রথম ধাবমানা হইল সে কথাও মনে পড়ে, তাহাদের পরিচয় অতীব মহান, অত্যন্ত সুন্দর।
শ্রোতা সমুদয়ের মুখ নিরীক্ষণে সুঘরাই সনিষ্ঠ হইতেই এক চমৎকার ক্ষুরের আওয়াজ শুনিতে পাইল এবং যে, হায় তাহাদের পাণ্ডা হয় না এমত খেদ তাহাতে আসিয়াছে, এবং তৎক্ষণাৎই ইহাও যে দুঃখের কিছু নাই এরূপ তাহাতে দৃঢ়তা দেখা দিল; এ কারণ যে তাহার পাখী আছে যাহাই তাহার নিজস্ব, তাহাই বংশধারা, সেও শ্রোতাদের মতই, যাহারা মধ্যে মধ্যে মহা শূন্যতায় আপনাদের ধারা দেখে, তেমনই সেও যেন পাখীটিরে লক্ষ্য করিল যে এবং তখনই দেখিল পথপার্শ্বে কোন মাতা সন্তানকে স্তন্যদান করিতেছে।
সুঘরাই এখন বুঝিল সে ক্লান্ত; একদিকে রিখিয়ার রাস্তা অন্যদিকে এই ধৰ্ম্ম উদ্দাম শহর তাহারে যেমন চাপিয়া ধরিয়াছে, দক্ষিণ দিক ধরিয়া মীনাবাজারের দিকে বা ইস্টিশানের দিকে যাওনের ভরসা। কখনই পায় নাই, যেহেতু তবু এদিকে গাছপালা, তবু এদিকে ঝিঁঝির শব্দ, ইহারা তাহার বড় জানাশুনা, বেশী করিয়া হারাইবার সম্ভাবনা এখানে নাই, আর কারণ যে এই পথেই মনিবদের রিখিয়ায় ফিরিতে হইবে; যে অনবরত মাথা ঘুরাইয়া দৃষ্টি ফিরাইতে তদীয় ঘাড়ে ব্যথা, এতক্ষণ এই পথে ডাক্তারবাবুর গাড়ী ব্যতীত অন্য ভাড়াটে গাড়ীও যায় নাই; এদিকে ক্রমে বেলা পড়িয়া আসিতেছে, ইদানীন্তন পাখী ব্যাপারে সমাধান সত্য, তবু অন্তঃস্থল ঝি, হাতে ঘাম হইয়াছিল।
