আবার মনিব মহাশয়ের স্বর শুনিল–এই হারামজাদা…
মনিব পত্নী বলিলেন–কি পাপ!
এ শহরে ধূলা উড়ে, পলাশ পত্র যত্রতত্র হইতে আছে; এ শহর মুহুর্মুহুঃ উৎকৃষ্ট ঘণ্টাধ্বনি নিনাদিত, পুষ্পমাল্য দীপ দেদীপ্য, ধূপ কর্পূর চুয়া চন্দন গন্ধ এই স্থানে আছার, তীর্থযাত্রীদের কণ্ঠস্বর সুললিত; তাঁহার সেই একের সৰ্ব্বব্যাপিত্ব এই তীর্থ দ্বারা অস্বীকৃত হয় নাই! এ শহরে ব্রাহ্মণগণের গাত্রবর্ণে জৌলুস চিকন দিব্য।
এই শহরে, নিকটে কোথাও যেমন বা নিঃশঙ্কচিত্ত মৃগশিশু সকল পরিভ্রমণ করে, যে শিবগঙ্গায় অনেক চক্রবাক সকল, আর উন্মুখী পদ্ম কম্পন, আর যে সেই শহরে সে এতকাল পিতৃহন্তা পাপীর তুল্য অশরীরী ছিল! সম্প্রতি বালক এই শহর তীর্থকামীর চোখে দেখিল, যে সে সজীবতা, যে ঈদৃশী পুণ্যভাক নগরে তাহার হারাইয়া যাওয়ার কারণ যাহা আদত তাহা নির্ণীত হইল, যাহা আমি ও আমার সম্বন্ধ, তাহা বোধগম্য হইল– মানুষ এই নোংরা লইয়া দেশ-দেশান্তর করে!
যদিস্যাৎ তাঁহারা, মনিবরা উক্ত ধরণের সংজ্ঞা, যে তাহার একটি পাখী আছে, নির্ধারণ করিতে পারিতেন, অর্থাৎ কিনা তাহার ব্যাপারে সংজ্ঞা রচনার সুযোগ ঘটিত, তাহা হইলে কাহারও প্রশ্ন এতশত করিবার কথাই আসিত না, তাঁহারা মন্দির হইতে বাহিরে আসিয়া, সুঘাইকে না দেখিয়া, এদিক সেদিক চাহিয়া, পাণ্ডাঠাকুরের পরামর্শ শুনিয়া, নিশ্চয় ডাহিনে অতঃপর বামে এঁদো দুগন্ধযুক্ত সঙ্কীর্ণ গলি, ও যে কতিপয় জীর্ণ ফাটা দেওয়াল অতিক্রম করত যে রকে ছাগল ঝিমায়, তাহার পাশ দিয়া বড় রাস্তায় চর্বিত চর্বণকারী ষাঁড়কে–ইহারা নমস্কার করিয়াই দেখিতেন অসংখ্য কবুতর উড্ডীয়ান হইল এবং আলোছায়ার পর পুনরায় আলো ঘটিল, আর তথায় সুঘরাই, ওষ্ঠে তাহার স্মিত হাস্যরেখা ও সে তাহার পাখী লইয়া স্থিতবান, এই সেই সুঘরাই যে কখনই মন্দিরে হাঙ্গামাকারী হরিজনদের সহিত জিগীর দেয় নাই, ইহা এক ছত্র ডাগর দৃশ্য, আর পিছনে শিবগঙ্গা!
.
সুঘরাই এখানে বৈদ্যনাথে, পাখী আনিতে বায়না ধরিয়াছিল, মনিব মহাশয়কে এই কথা–সুঘরাইএর ইচ্ছা–তদীয় পত্নী নিবেদনও করিয়া থাকেন, কিন্তু তদুত্তরে তিনি, মনিব মহাশয় বলেন,–দুর,–তুমি কি উন্মাদ হইলে, একে উহা দেবস্থান মানে আমরা দেব দর্শনে যাইতেছি সেখানে কোন হুজ্জত লইয়া যাওয়া যায়…!
তাতে কি হয়েছে, ছোট ছেলে বলছে, আহা বেচারী পাখীটাকে এক মুহূর্তও ছেড়ে থাকতে পারে না…আর জমে নিশ্চই কেউ ছিল ও ছোঁড়ার…এক মুহূর্ত কাছছাড়া করতে পারে না…ছোঁড়া দেখ না বাহ্যে যাবে তাও পাখী…ওগো অমত কর না, ওর ভারী সাধ পাখীটাকে বোদ্দিনাথ দশ্শন করিয়ে আনে…।
না না তুমি বড়ই উহারে আহ্লাদ দাও–কোথাকার এক ডোম ছোঁড়া, তাহার জন্য…উহাকে রাখিয়া দেখিতেছি মহা বিপদে পড়িয়াছি…।
.
মনিব মহাশয় ও মনিব পত্নী এখানে আসিয়া এক গ্রাম্য বালকদের ভোজন দেন, ইহাতে কেয়ারি করা বাগানের কিছু নষ্ট হইয়াছিল–কিন্তু ব্রাহ্মণ হইতে সকলেই আসিয়াছিল, মনিব মহাশয়ের খাদ্যাখাদ্য বিচার নাই জানিয়াও খুব হৈ হট্টগোল হয়, তবু আসিয়াছিল! উচ্চবর্ণের বালকরা একটি বালকের সংস্পর্শ এড়াইয়াছে–যেহেতু সে ডোম, উহারা হাড়িয়াল ডোম।
এই বালকের চেহারায় নিদারুণ দুঃস্থতার ছাপ ছিল, অভাবিত নির্জনতা তদীয় অঙ্গে আছে, এখানকার জংলী বৈচিত্র্যও ছিল এবং তাহার হাতে একটি পাখী ছিল–ফলে সেই বালককে উপস্থিত উচ্চবর্ণের ঘৃণা অন্যদিকে তাহার ইহাদের প্রতি মায়া এক অপূর্ব দুঃখ বোধ দিয়াছে, আঃ তাহার দাঁড়াইবার ভঙ্গীও চমকপ্রদ, যাহাতে পশ্চাতের অজস্র মৌসুমী ফুলের চরিত্রকে সে আটকাইয়াছিল। অন্ন নহে, বহুদিনের ঘুমের পুষ্টি তাহার চোখে ছিল। সে একান্তে নিজেই বসিয়াছিল–মনিব পত্নী জিজ্ঞাসিলেন, তুমি এখানে কেন।
সে দাঁড়াইয়া উত্তর দেয়,আমি ডোম।
মনিব পত্নী তৎক্ষণাৎ আঃ মাধব আঃ ঠাকুর বলিয়া উঠিলেন।
মনিব মহাশয় কহিলেন–এই ব্যাপারের পঙক্তি ভোজনের তুমি আমি কিছুই করিতে পারিব না! তাহাকে একান্তে খাইতে দেওয়া হয়–মনিবপত্নী পরিবেশন করেন, সে যখন খাইতেছিল তখন তাহার পাখীটিও তাহার পাতেই খাইতে আছে, এই ছবি গ্রাম্য বালকদের কলরোল, রন্ধনের গন্ধ, পাখী কুকুরের চেঁচামেচি ছাড়াইয়া উঠে–ইহাতে শাস্ত্রের উদাহরণ দেখিয়া মনিব পত্নী তদীয় পতিকে উহা প্রত্যক্ষ করিতে ডাকিলেন! ঠাকুর আঃ তুমি দেখাইলে! তাহাদের সাধন নির্দেশে প্রত্যেকের পাতা ফেলিয়া দিলেন–মনিব পত্নী ঐ ডোম বালকের উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করেন।
.
মনিব মহাশয় কহেন–না, না, ইহা হইবার নহে, পাখী লইয়া কোথায় যাইবে। ঐ ভীড়ে তুমি ক্ষেপিয়াছ দেখি…।
না, কেন ভীড় তাতে কি, পাখীটা নিক্ না বাপু, ওর দিদি ত মরে ভূত হয়ে গেছে, সেখানে যে ওটা কার কাছে রেখে যাবে দেখভালের জন্যে, ফিত্তে কত বেলাই না হবে কে জানে–আর ঐ পাষণ্ড ভগনীপতি লোকটাও ভাল নয়, শুধু বাড়ীতে থাকতেই যা ঐ লোকটা ছোঁড়াকে দেয়, সেও পাখীটাকে দেখতে পারে না…আর তা’ যে মাগী এখন যারে ওর ভগনীপতি রেখেছে, সে’ও পাখীটাকে দেখলে পরে কাঁইমাই করে, তা’ সঙ্গে সঙ্গে মিনষে মুখ পোড়াও ধুয়ো ধরবে খনে… সিদিন নাকি বলেছে বাবুরা চলে যাক্, তুই ফিরে ত আসবি, পাখীটা আর একটু বড় হোক…তখন একদিন খুব মহুয়া তাড়ি মিশিয়ে খাব, খুব বমি করব, বৌকে, মানে মাগীকে, খুব মারব আর পাখীটাকে কেটে, কাঁচা কাঠে ঝসে খাব…অথচ ও ছোঁড়া রোজ দুপুরে ভাত নিজে কম খেয়ে ওদের জন্যে নিয়ে যায়…হ্যাঁগা পোষা তিতির আবার খায় নাকি…এখন বেচারা…বেচারী ভয়ে কাঁটা…।
