শুধু মাত্র ভীতি! ভীতি তাহাদের–গ্রামবাসীদের অমোঘ অহংতা; আর যে বিশেষত তাহারা যাহারা পূৰ্ব্বজন্মজনিত পাপ বিধায় অতীব নিম্নশ্রেণীর এই জন্মে, ইহা ধ্রুব যে ভীতি তাহাদের পুণ্যও; সুঘরাই ঐ ঘটনাস্থলের খানিক পথ হইতে ফিরিয়া সৰ্ব্বপ্রথম খড় কুড়াইয়াছে, যে একটি সুদীর্ঘ দড়ি তাহার চাই, খড় দ্বারা একটি কদাকার, রশি বানায় ও যে পাখীর খাঁচাটিকে মটকায়–খিলানের লোহাতে তুলিতে চাহিয়াছিল।
.
যে, লকড় হইতে ভীতি, ভীতি চড়াই উত্রাই-এর নিঃসঙ্গতা পার হইয়াই পাখী! যে চকিতে ইহাতে সুঘাইএর নেত্র অভাবনীয় বিস্ফারিত যে যাহাতে একাধারে উদ্বেগ ও অপ্রত্যাশিত পাখী না থাকার দরুণ আপশোষ বিদ্যমান; যে সে এতাবৎকার অনভ্যস্ত মানসিকতা হইতে অধুনা সে মুক্ত, অত্রাহি ভাবান্তর এখন ধূলিসাৎ হইয়াছে, তাহার ডোমত্ব ঘুচিয়াছে।
ইহা যথার্থ যে সে নাড়ীর যোগসূত্র পাখী শব্দে প্রাপ্ত হইয়াছে; যে সে আতা গাছকে আতা গাছ। বলিয়া চিনিয়াছে, যে সে রিখিয়ার কোন সিন্দুর-লাঞ্ছিত মহুয়া গাছকে এখান হইতে নমস্কার করিল; আশ্চৰ্য্য যে এক কুকুর তাহারে দেখিয়া অজস্র চীৎকার পাড়িয়াছে কেন না সে সুঘরাই নাচিয়া উঠে যাহাতে ইহা সিদ্ধ হয় যে সে অব্যর্থ, সে আছে!
এবং এখন, সে মনিবের প্রিয় দাস, সে স্পষ্টত শুনিল, এই হারামজাদা!–আঃ হা পাপ কাহাকে বলে! এবং যে তাবৎ বিশ্বাস যে সে আছে, এই বিশ্বাস তখনই সম্যক, যখন তাহার পাখী আছে, তখনই স্থাবর জঙ্গম সবই সংখ্যায়ে, যে যাহা মননে তদীয় অব্যবস্থিত প্রকৃতি ইদানীং সাধারণ।
আর যে ঐ লকড় কারণে ভয় হইতে শহরের এতক্ষণকার যে একাকিত্বের ভয়ে সে দিকভ্রান্ত থাকে, তাহাতে আর সেই বৈলক্ষণ্যের তেমন চেহারা নাই; এখনই সুঘরাই আপনার দেহ হইতে হাতের পানে চাহিল, ইহা নিমেষেই ওতপ্রোত যেমন যে সেই হস্তে একটি খাঁচা আছে এবং আদতে নিজের গেঞ্জীটি তাই ডান হাতে লয়, যাহা যেন খাঁচা আর যে তবুদ্ধিতে নাচাইলে, যে সে এমন কি খাঁচার ভার অনুভবিয়াছিল; আশ্চর্য্য সে কি পাগল! এত সময়, হায় সে এক রকম নিজ নাম হইতে, এবং যে মাথায় সে এমন অর্থাৎ উচ্চতায় এতখানি যে এরূপ তাহারে দেখিতে হইতে, শুধুমাত্র স্থানবাচক হইয়া সর্বত্রে ব্যাকুলভাবে দৃষ্টি সঞ্চালন করিয়াছে! আঃ তাহাতে বৃত্তি আসিল, সৎসাহস আসিল যে সে চিবাইতে জানে।
এই প্রকার আক্ষেপে সুঘরাই স্বীয় বক্ষে চাপড় মারিলেক, যে হায় যদি পাখীটি থাকিত! ইহাতে তাহার ডোমত্ব নিশ্চিহ্ন হইল; আর একদিকে সে দশাসই ডোম যদি অপি, তবুও সে এখন অনায়াসে ফুল চয়ন করিয়া কানে পরিতে পারে, কোন বাধা নাই এবং সে সেই-যে ছেলেটির সহিত একটি পাখী আছে, যাহাতে সে বাস্তব, যাহাতে সে এই জড় পূর্ব পশ্চিমাদি দিকের অপেক্ষা নহে।
এ পর্যন্ত যত কিছুকে–মানে যাহাতে তাহাকে সহজে খুঁজিয়া পাওয়া যায়–সে আপন শরীরের অঙ্গীভূত করিতে আপ্রাণ ছিল, তৎসমুদয়ের ঠিক লইল এবং তাহাতে বুঝে, দেহ তদীয় সীমা আর নহে–দেহে সে আটকাইয়া নাই, ইদানীং সমস্ত কিছু মিশিয়া মিলিয়া এক অত্যদ্ভুত রূপ ধারণ করিয়াছে, যাহা দেখার তথা অনুভবের সঙ্গেই সে বলিয়া উঠিল যে, ছেলেটির সহিত একটি পাখী আছে।
এই দৈব সমাধান অহহা কীদৃশী বিস্ময়াবহ! যে সুঘাই নিজেকে নিজেই জবর ডাগর রূপে প্রস্তুত করিতে থাকে এই বাক্যাবলী: যে ছেলেটির একটি পাখী আছে, তুমুলভাবে উচ্চারণ উদ্দেশ্যে সুমহান স্বর তাহার কণ্ঠে গঠিত হইল, ঝটিতি ধ্বনিত উহা হইল, যাহাতে ধৰ্ম্মত ইহাই, ন্যায়ত ইহাই, ভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, ঐ পাখীটি কোন একদিনের, সত্যযুগের, যেক্ষণে দেবতা মানুষ অভেদ! ও সুঘরাই যাহার সূত্র ইহাতে, ঝটিতি সুঘরাই-এ চাকচিক্য ছটা ধরিল, যে সে সুদারুণ নির্ভয়ে সে পুনরায় কহিল, যে, ছেলেটির একটি পাখী আছে। আর যে ইহাতে সে এই বসুন্ধরাকে অভয় দান করিল! যে তুমি ভীত কেন–আমি আছি!
.
ইহা এখানকার অবিশ্রান্ত স্তব স্তোত্র মন্ত্র পাঠে, গম্ভীর জয় বাবা বৈদ্যনাথজী জয়ধ্বনি মহিমাতে, অধুনা, যাহা সুদূর কুম্ভকাণম আগত তীর্থযাত্রী কর্তৃকও শব্দিত, এহেন পরম শুদ্ধ উদাত্ত স্বরবিভঙ্গে, এবমুক্তবচন যাহা সে বলে, যে ছেলেটির একটি পাখী আছে, চিরতরে আটকাইয়া গেল, সংমিশ্ৰিত নহে, কদাচ ডুবে নাই!
এবং সে কান পাতিয়া শুনিতে যাহা উদগ্রীব, ঐ সকল তপোলভ্য উচ্চারণে তাহার আপনকার নির্ম্মিত সঙ্গীতময় পদবন্ধ বিঘোষিত শুনিল, যাহার অনুরণন দেহে হওয়া মাত্রই, তাজ্জব যে, ইহা যেমন সংস্কার, যে সে মোটেই উৎচকিত ছিল না, এ যাবৎ কিঞ্চিত্র সে হা হা রবে কাঁদে নাই।
এখন গেঞ্জী যাহা খাঁচাতে পরিণত–যাহা সে বহুক্ষণ পূৰ্ব্বে গাত্র হইতে খুলিয়াছে, এমন ভাবনায় যে উহা পরিয়া থাকিতে তাহার নিশ্চয়ই চেহারার পরিবর্তন ঘটিয়াছে, কেন না ইহা খুব ফর্সা, আর তজ্জন্য মনিব মহাশয় তাহাকে, কিছুই অবিশ্বাস্য নহে, চিনিয়া লইতে পারিতে অসমর্থ নির্ঘাত, আর সে তদীয় দুর্লভ ঘৃণা হইতে বঞ্চিত!
সেই গেঞ্জী উপস্থিত বড় খুসী মনে পরিয়াছে! সে পূর্ণ! গেঞ্জীর আর্দ্র স্থান নিজ ত্ব সংস্পর্শ হইতেই সে হাসিল; অধিকন্তু খাদ্যসামগ্রীর যাবতীয়, ও দোকানের বোতলগুলি দূরে থাকিয়া দর্শনেও সে সাবধান, প্যাঁড়ার গন্ধে সে অধীর, চমৎকৃত।
