তোমাদের এতাদৃশ মেহবচনে সেই বালক সুঘরাই যেন এই মাত্র স্নান করিতে চাহিল, কেননা সে চীৎকারে শিবকে পতিরূপে পাইবে, বাক্যকে তছনছ ইতিপূৰ্বেই করিয়াছে, সে কম্পিত, সে তোমাদের নমস্কার করে, তাহারে কোন দিকে যাইতে দেখিয়াছ।
অনবরত পুণ্যকামী আর ঢাকের শব্দে মনিব মহাশয় স্বতঃই বিভ্রান্ত, নূতন করিয়া যে এখন তাঁহার কোথাও গিয়া শুধাইতে ভয়ঙ্কর রাগ হইল; বিশেষত মোহিলির ব্যবহারে বৃথা ভয়ের জন্য–যে সেই কলেরা ইনজেকশন ক্যাম্প রোহিণীর ঐ দিকে না অন্যত্রে উঠিয়া গিয়াছে–গরুর গাড়ীটি থাকিলে কোন গোলই ঘটিত না, সুঘরাই অনায়াসে তাহাতে ঘুমাইতে পারিত; ওষ্ঠদংশন করত তিনি চারিদিকে চাহিলেন, নাঃ একবার শেষ চেষ্টা করি, যদি সে রিখিয়ায় ফিরিয়া গিয়া থাকে; কিন্তু ইহাতে তাঁহার অবশ্যই মনে পড়িবেই যে সুঘরাই কোন উপায়েই একা একা রিখিয়ায় ফিরিতে পারিবে না, অবশ্য যদি কোন সহায় সম্বল পাইয়া থাকে, ভিখারীদের কথা উঠে না, যদি অন্য কাহাকেও পাইয়া থাকে তাহা হইলে সে আর এক কথা।
এমনও যে বিসরিয়ার বাপ, যে প্রত্যহ শহরে পায়ে ঘুঙুর এবং বিরাট ঢাক ঘাড়ে আসিয়া থাকে, ঢাক বাজানই তাহার ব্যবসা, ক্রমাগত তীর্থযাত্রীদের সমক্ষে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ঢাক বাজাইয়া শুভ অভিনন্দন জানায়, এবং এইভাবে শিবগঙ্গা পর্যন্ত যায়; তীর্থযাত্রীদের কি আদরের স্মৃতি সে, ভারতের দিকে দিকে চন্দন গন্ধের পাশেই সে; তাহার মত অনেকে। সে ফাষ্ট ট্রেন ধরিবার জন্য রাত থাকিতে আসে, অদ্য তাহারও সাক্ষাৎ নাই।
তবু তিনি অবশেষে এই রিখিয়া তত্ত্ব করিবার স্থির করিলেন; তিনি দুমকার চৌরাহা গিয়া পর্য্যবেক্ষণে জানিলেন, সকাল বেলাতেই বহু কাঠের ভারী, বহু দুধওয়ালা বিষণ্ণ চিত্তে ফিরিয়া গিয়াছে। ও যে দু-চারজন সুদূর ভাগলপুর হইতে বা গঙ্গার নিকটবর্ত্তী এলাকা হইতে গঙ্গাজল, বাবা বৈদ্যনাথকে তদ্বারা পূজা করিবার মানসে আনয়ন করে, তাহারাও শহরে প্রবেশ করে নাই, ক্ষুণ্ণ মনে বালসরাইএর দোকানে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে; যে আজ ঐ পথে একেবারে লোক চলাচল নাই, সর্বৈব নিশুতি; এখন এরূপ পথ সুঘরাইএর পক্ষে অতিক্রমিয়া যাওয়া আষাঢ়ে, কিছুতেই ঘটিবার নহে, সেরূপ সাহসও সে পাইবে না–কেন না লকড়!
.
কোন এক সাংঘাতিক সুচতুর লকড়ের উপদ্রবে রিখিয়ার আশপাশ অনেক মৌজা সৰ্ব্বদা আতঙ্কিত হইয়া আছে, যে সেখানে ঘুম নাই, ক্রমাগত নিদারুণ ফেউএর ডাকে সকলেই শঙ্কিত, কুকুররা গ্রাম হইতে বাহির হয় না, কোথাও পাতালতা তূপীকৃত করিয়া আগুন দেওয়া হয়; সকলেই একযোগে ভয় পাইয়াছে–একে অন্যকে কাছে টানিয়াছে–ঢাকীরা ঢাক ও অন্যান্যেরা, ছোট-রা, ক্যানেস্তরা টিনের কৌটা ইত্যাদি ঘুম চোখে বাজাইয়াছে, এই সঙ্গে সকলেই থরহরি! রাত্রিগামী গরুর গাড়ীর চাকার শিকে একটি কাঠের সহিত লাগিয়া যাহাতে শব্দ হয়, তজ্জন্য তাহাতে আড়ভাবে চালকরা কাঠ বাঁধিয়াছে, ইহাতে চলাকালে উৎকট আওয়াজ হয়, ফলে কোন জন্তুই গাড়ীর সমীপে আসে না। ঐ লকড় হেতু এমন কি চেঞ্জার বাবুরা কেহ কেহ বন্দুক হস্তে সান্ধ্য ভ্রমণ করেন।
কয়েকদিন হইল এই লকড় এতেক দুর্ধর্ষ হইয়া উঠিয়াছে যে দিনমানেও তাহাকে দেখা যায়, মাঠে গরু পর্য্যন্ত চরান ভাবনার হইয়াছে, তাই অড়হর ক্ষেত যদি পশ্চিমে হাওয়ায় নড়িল, যুগপৎ সকলেই লাফাইয়া উঠিয়াছে, ও হো হো হৈ লকড় হে-হাঁক পড়িয়াছে!
বিদ্রাবিত অসহায় গ্রামবাসীরা গাছের গায়ে নূতন করিয়া সিন্দুর দিয়াছে; বিশেষত এ কারণে যে বালসরাইএর রাস্তার কাছেই কয়েক ঘর ডুমনীর বাস, যে ঠিক সেইখানেতে দিন তিনেক পূৰ্ব্বে এই লকড় দ্বারা এক নৃশংস ব্যাপার সঙ্ঘটিত হয়।
ঐ সকল ডুমনীদের ঘরের সামনে রোজই রাত্রে একটি বোবা ভিখারী ঘোরাফেরা করিত, যে ডুমনী মাগীদের সঙ্গে তাহার ভাব ছিল; ডুমনীরা তাহাকে মহুয়া বা গাঁজার কল্কী দিত; বোবা সারারাত এখানেই তাহাদের ঘরের কাছে ঘোরাফেরা করে।
কোন ডুমনীর ঘরে খদ্দের (বাবু!) আগমনে যখন ঝাঁপ বন্ধ হইত, সেই ক্ষেত্রে ঐ বোবা ঝাঁপের ফাঁসা ফুটো দিয়া আভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ দেখিতে ভালবাসিত; বোবা সে বটে কিন্তু লালা ত ছিল! যেদিন তাহার কাল হয়, সেদিন কোন কোন ডুমনী তাহারে রাত বারোটার ট্রেন যখন যায় তখন দেখিয়াছে, একজন ডুমনী তাহাকে একটু মহুয়াও দেয়, যেহেতু সে কাছেই ছিল মানে ঐ ডুমনীর ঘরের ঝাঁপে আড়ি পাতিয়াছিল; যে ইহার পর যখন সে হয়ত পুনরপি ঐ ভাবে ঝাঁপের ফাঁক দিয়া দেখিতে একমনা তখনই নির্ঘাত লকড় কর্তৃক আক্রান্ত হয়!
বেচারী বোবা!
লকড়টি, ইহা জীবিতরা ধারণা করে যে, গরুর গাড়ী বা অন্য কিছুর নিমিত্ত বোবার খানিক-খাওয়া। দেহ রাখিয়া চম্পট দিয়াছে, এবং উহার মর্মন্তুদ চীৎকার পশু পাখীর সহিত এক! যে সেই কুৎসিত বিভীষিকা সারাদিন রাস্তায় রহে–দূর দূর গ্রামে এই হিম দুঃসংবাদ পৌঁছিয়াছে; যাহারা অনেক পথ ভাঙ্গিয়া আসে এহেন বীভৎস দুর্দৈব প্রত্যক্ষ জন্য, তাহাদের অন্তর আত্মা পাঁশুটে হইয়াছিল; সুঘরাই উহাদের সঙ্গে খানিক পথ যায়–এই ঔৎসুক্যের হেতু মনিব পত্নীর নিকট বকুনিও খাইয়াছে!
উহাদের দর্শকদের মধ্যেই কেহই সেই মর্মন্তুদ দেহ অবলোকনে ‘বেচারী’ পৰ্য্যন্ত বলিতে পারে নাই; যে অন্যপক্ষে কোন নীতিজ্ঞান আব্রাহ্মণ কেহই তাদৃশ দুর্দশা হইতে মন্থনে শক্ত হয় নাই। সকলে কাতর নয়নে শকুনির পরিক্রমণ দেখিতেছিল।
