যে এবং, যে সে অবলোকন করে, এক অপূৰ্ব্ব কন্যাকে পদব্রজে আসে, যাহারা ধর্ম্মতাত্ত্বিক সাধক সন্ন্যাসী যাহারা নিজ নিজ স্তব ‘মহামহিম্ন’ ও ‘নির্ব্বান ষটক’ পাঠ করিতেছিল তাহারা কন্যাদর্শনে উহা থামাইয়া—’অহো ভগবতী তনু ভগবতী তনু’ উচ্চারণে আকাশ বিদীর্ণ করিল, যাহারা এখানে সেখানে পদ্মাসনে বসিয়া নিমীলিত নয়নে ধ্যানস্থ ছিলেন তাহাদের গাত্রে ঐ শুদ্ধ শব্দে মুহুর্মুহুঃ রোমাঞ্চিত হইতে থাকে, এমত সময় নেতৃবর্গসহ হরিজনরা আসিল, প্রলয় কাল আসিল, কন্যা ন যযৌ ন তস্থৌ হইলেন কিয়ৎক্ষণ, অতঃপর শুভমিলনের কারণে ধাবিত হইলেন, এ সব ব্যাপার অনেকক্ষণকার, এখন নিশ্চয় শাস্ত্রমতে বিবাহ কাৰ্য্য চলিতেছে! আর সেই দুবৃত্তরা অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে, তাহারা দন্তঘর্ষণ করিতেছে, তোমরা আর কালবিলম্ব করিও না, অদ্য অনেক দুগ্ধ ঘৃত পূজা উপচারাদি নষ্ট হইয়াছে, হোমকাষ্ঠের অভাব, সত্বর যাও, ভোগের আর বেশী দেরী নাই, জয় বাবা বৈদ্যনাথ!–সেই বালকটির কথা, যে আপন হঠকারিতায়ে অধোবদন, অনুতপ্ত যে সে-ও হরিজনদের সহিত চীৎকার করে, সেই বালকের কথা তোমরা বলিতে পার…!
হায় আমার চক্ষুর মধ্য দিয়া নিয়ত বাদুড় প্রবেশ করিতেছে, হায় আমার নাম সুঘরাই, যাহা ক্রমাগত শিব জয়ধ্বনির মধ্যে ডুবিতেছে, হায় এ পৃথিবীতে পচাগলিত দুর্গন্ধ কিছু নাই, ঐ ধ্বনি সকল কিছু গ্রাস করিতেছে, যে আওয়াজ ভেদ করত আমিও বহুসময় শালা বলিয়াছি, যেহেতু আমি ডোম, কিন্তু তাহারা আরও পাপ করে যাহারা উচ্চৈঃস্বরে বৈষয়িক কথা ঐ ধ্বনি সময় কহে, আমি শুনিয়াছি; আমিও ত আমার নাম ধরিয়া অনেক অনেক বার ডাকিয়াছি! হায়! মনিব মহাশয় যদি ঐ ব্যাঙটি দেখেন তাহা হইলে কি ভাবিবেন, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমা করিবেন, যে আমি মহা আক্ষেপে আপশোষে ক্রোধে উহারে আহত করিয়াছি!
এখন তিনি অসংখ্য ভিখারীদের সামনে, যে সুন্দর রৌদ্র উহাদের এড়াইতে পারে নাই, যে শুধুমাত্র একের ছায়ায় অন্য ভারী কালো, একদম উদ্ভীজ, বিবিধ ভাষায় আশীৰ্বাদ কল্যাণ বচনে ইহারা বিকট, অবিলম্বেই আবার ম্লান, তিনি এই নিকৃষ্ট অবহেলিতদের নম্র বচনে প্রশ্ন করিলেন,–বাবা বৈদ্যনাথ তোমাদের মঙ্গল করুণ, বিশেষ যে, তোমাদের জিজ্ঞাসা করি যে চীৎকাঠ নিবাসী বজ্রাহত ভিখারী যাহার নাম জাঙকী সেই অষ্টবক্র বিকলাঙ্গকে চেন কি না…তাহারে কি স্মরণ আছে? বোবা ভিখারীটি যে বালসরাইএর, তাহার কথা নিষ্প্রয়োজন! অবশ্যই অগণিত তীর্থযাত্রী তোমাদের আশ্চর্য্য নেত্রে নিরীক্ষণে করজোড় করে, বুঝে তোমরা জাঙকীর মতই পূৰ্ব্বজন্মকৃত পাপ বহিতেছে; যে এবং সুঘরাই সিদ্ধান্ত করে, যেহেতু পাপ সে করে নাই তাই তাহার দেহ নিখুঁত, যদি ভবিষ্যতে কখনও সে কোন পাপ সঙঘটন করে, তন্নিবন্ধন সঙ্কল্প করে, সে আপনার হাত পদদ্বয়কে সংযত করিবে, কেননা হাতে নোনা আছে–উহারাই নচ্ছার! এমন যদি, কভু অজ্ঞানে সে পাপ করে তাই আগামী পৌষ সংক্রান্তিতে ভাগলপুরের গঙ্গায় স্নান করিয়া তাহা স্খলন করিবে।
যদিও তাহারা ডোম, নানান বিচার আচার তাহাদের নাই, তথাপি যে এবং আরও, এই মানসিক করে যে যখন সে আধ সের চাউল প্রত্যহ খাইবে তখন তোমাদের নিমিত্ত প্রতি হাটবারে এক পালি চাউল (!) আনিবে, গামছাও দান করিবে, তাহারা ডোম, যদিও তাহাদের ভিক্ষা গৃহীত হয় না, তবু। মুহূর্তের জন্য সে উচ্চবর্ণের হইবে, সেই দেশওয়ালী বালক সহসা অদ্ভুত সঙ্কুচিত হয়, এ কারণ যে। অচিরাৎ কাহারও সম্ভ্রান্ত করে ভর্ৎসনা তাহার কানে আসে; শনৈঃ ঐ তিরস্কারবাক্য সে অনুধাবনেই ত্বরিতেই নিদারুণ চমকৃত, যে ক্ষণেক ইহা সংস্কার জন্মে যে, যে সে যেমন বা হারাইয়া যায় নাই।
সে দেখিয়াছিল যে, অনতিদূরে জনৈকা উচ্চবংশসস্তৃতা গৃহিণী বোধ হয় তদীয় নাতনী, যে ফ্ৰকপরা, তাহারেই তিক্ত সমালোচনায় বলিতেছিলেন,–ছি ছি লজ্জা রাখিবার জায়গা পাই না, ইহারা (ভিখারী) সাক্ষাৎ নারায়ণ! ইহাদের ঘৃণা ছি ছি তোমার ঐ বাপটিস মিসনে এই বুঝি শিক্ষা, ছি ছি, নরকেও স্থান হবে না, ভিখারী বলিয়া…ছুঁড়িয়া ঘুড়িয়া অবজ্ঞা করিয়া দেওয়ার মত পাপ আর নাই; শতজন্ম তপস্যার ফলে মানুষ ভিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাইয়া থাকে, উহারা কানা খোঁড়া কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত কি ইচ্ছা। করিয়া হইয়াছে! বলে কুকুর বিড়ালরে অবধি হুঁড়িয়া কিছু দিতে নাই। ছি ছি! উহাদের নমস্কার কর…!
ইত্যাকার কথার সহিত গৃহিণীর উৎকৃষ্ট স্বর্ণালঙ্কারগুলির মৃদু অনুরণনও মিশ্রিত হইতে থাকে, যে। উপস্থিত সুঘরাই সদ্যস্নাত সুন্দর দেখিতে কন্যার জন্য তটস্থ হয়–এবম্বিধ উক্তিতে তাহার ডোম জন্মে আশ্চৰ্য্য এক অপরাধ জানিয়েছিল; আর তোমরা হে ভিখারীগণ, গৃহিণীর রূঢ়তায়ে বালিকার জড়তা বুঝিয়া, তোমরা গৃহিণীপ্রতি বালিকার নিমিত্ত সমবেদনায়, ক্ষমাপরবশ, অতীব করুণায়ে আশ্বাস দিয়াছিলে, থাক থাক্ উহাতে দোষ বিচ্যুতি ঘটে নাই, সে বালিকা, আমরা তিন সত্য করিতেছি উহার অপরাধ আমরা লই নাই, যে বালিকারে আমরা আশীর্বাদ করি, সে শিবলোকে যাইবে, শিবকে পতিরূপে পাইবে, উহার জীবন আমরণ দেবসেবায় ধন্য হইবে, অজস্র দান ধ্যান করিবে, উহার সন্তানরা ত্রিলোক-বিখ্যাত ধার্মিক হইবে, অমর হইবে মাগো!
