আমি যেমন যে অন্যকিছু, আমার সুকৃতি সকল বিনষ্ট, অতঃপর স্খলিত পদে চলিতেছিলাম, অবলীলাক্রমে আপনকার নভঃমণ্ডলের চিত্র আমার চোখে পড়িল, আমার দিক-নিশ্চয় হইল; আমি সন্ধানে প্রবৃত্ত হই। ইতিমধ্যে বালক আসিল, আপনার বিবাহ শব্দ তাহাকে কিস্তৃত করে, তখনই আবার যেন সে সেই চীৎকার করিতে চাহে, কিন্তু আপনার সলিতা কথা তাহাকে বড় আতান্তরে ফেলে, সে নিজে সলিতা গড়ন জানে, অথচ ইহার মানে কি, অথচ বর্ষীয়সী মহিলা ইহাতে যারপরনাই খুসী; সে সুঘরাই আবার নীল ছবিখানির দিকে তাকায়…তাহার গতিবিধি কি আপনি…!
.
শিবগঙ্গার পশ্চিমে যেখানে আছার নাপিতগণের চোখ কভু ছোট কভু বড়, কেহ বা চুল ছাঁটে, কেহ খেউরী হয়, কেহ চক্ষু বুজাইয়া উৰ্দ্ধবাহু বগল কামায়, কেহ মস্তক মুণ্ডন করায়; মনিব মহাশয় স্বাভাবিক ধারণায় এই সুদীর্ঘপথব্যাপী কর্মতৎপরতা ঈষৎ কৌতূহলে নজর করিলেন, এখন নিকটস্থ এক ক্রন্দনের শব্দ বহুত কাঁচির আওয়াজ ভেদ করত আসে, দেখিলেন একটি বালক যাহার দন্তে কুটা যাহা পাছে পতিত হয় তাই তাহা এখন দন্তে চাপিয়া কাঁদে, নাপিত সান্ত্বনাবাক্য বলিতেছিল,–ছিঃছি কান্দিও না, তিনি শিবের কাছে গিয়াছেন, তাহা ব্যতীত এরূপভাবে কান্দিলে অঘটন হইবে!
সুঘরাই অবাক চোখে পিতৃহারা বালককে দেখিল। বালকও সুঘরাইকে দেখে!
এই নাপিতের কাজের শেষে মনিব মহাশয় প্রশ্ন করিলেন, হে নাপিত একটি বালক যে অনেকক্ষণ যাবৎ গুরুদশা প্রাপ্ত (পিতৃবিয়োগ) এখনই যে ছেলেটি চুল ফেলিতেছিল তাহার ক্রন্দনে স্বীয় নয়নের অশ্রু মোচন করত অভিনিবিষ্টচিত্তে তাহাকে দেখিতেছিল।
ও যে সেই সময়তে, ক্ষৌরকর্মের মারাত্মক করাল শব্দ শুনিতে থাকিয়া চালনা কৌশলও অনুধাবন করিতেছিল, যে এবং এই সকল সূত্রে আশ্চৰ্য্য এতাদৃশও ভাবে যে, হায় আমি কি পৰ্য্যন্ত বঞ্চিত! আমার কোনই খেই নাই, এমন কোন আমার উর্দ্ধতন কেহ নাই, যাহার নিমিত্ত আমার মস্তক মুণ্ডনের সুযোগ আসিবে! হায় আমি ঝড়ের মুখে এঁটো-পাতারও অধম! হে নাপিত, ইহা লোকপ্রসিদ্ধ যে, তোমরা দারুণ চতুর, এখন তোমার হাতের ক্ষুর চালনা রাখিয়া, একটু ভাবিয়া দেখ ত, কেন না বালককে তুমি খদ্দের ভাবিয়া থাক, এখন মনে কি হয় সে কি রিখিয়ার রাস্তার দিকে গিয়াছে।
হায় যদি মনিব মহাশয়, সুঘরাই যখন এখানে, তখন এক বিলাইতী বাজনা একটি ব্যাগ-পাইপসহ ঢাকের শব্দ শুনিতেন, নিশ্চয়ই তিনি মুগ্ধ হইয়া দ্রুত সেই দিকে লক্ষ্য করিতেন, কিন্তু আদতে বাজনার হেতু দর্শনে-সুঘরাই অবিকল এখন যেন দেখিল–তিনি মুহ্যমান, একধারে আশা ও দুঃখ তাহারে কালো করিল, এ কারণ যে উহা এক শবযাত্রা, চারপাইটি অদ্ভুত সাজান বাঁখারি নির্ম্মিত ছোট ছোট খিলান করা, উপরে চেলি-ঢাকা (পাটের কাপড়) যাহার আবির রঙ সকলকেই মোহিত করে।
মনিব মহাশয় বুঝিলেন সম্ভবত ইহা ডোম জাতির মৃতদেহ, ইহাদের সহিত কি সুঘরাইএর সাক্ষাৎ হইয়াছে; হয়ত ইহাদের মধ্যে সুঘরাইএর কোন জ্ঞাতি সম্পর্কের লোক থাকিতে পারে, তথাপি তাহাদের তিনি প্রশ্ন করেন না, নিশ্চয়ই তিনি সুঘরাইএর বিকার বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে যদি ইহা বাঁশ বাঁধা শব হইত তাহা হইলে সুঘরাই নিশ্চয় অনুসরণ করিত, ভাগাড়ে যাইত, সেখানে সে দাঁড়াইয়া থাকিত, স্বজাতি তাহাকে দেখিয়া ঘোট এক হাড় ছুঁড়িয়া মারিত–হিঃ রে! সেও আহ্লাদে অধীর হওয়ত একটি হাড় ছুঁড়িয়া জানাইত যে, সেও খুসী। দুজনেই আনন্দিত খুসী আত্মীয় দর্শনে। তখনই শিশির দেখা যাইবে। বাজনা শ্মশান অভিমুখে চলিল, মনিব মহাশয়ের মস্তক উন্নীত হইল, তিনি অদূর শ্মশান হইতে উখিত কুণ্ডলীকৃত ধূমরাশির গাম্ভীর্য্যের পানে তাকাইলেন, নিশ্চয় কোন জিজ্ঞাসা তাঁহার ছিল না।
মনিব মহাশয় সত্যই নিরাশ হইয়াছেন, সামান্য এক ভৃত্যের জন্য এত তল্লাস কেহ করে না, কিন্তু যেহেতু ইনি পরম ধার্মিক তাই এতেক ব্যগ্রতা; যখন তিনি অবনত মস্তক চলিতেছিলেন, তখন সহসা শিব-জয়ধ্বনি উঁচাইয়া অস্বাভাবিক স্বরে গীতের বিস্তার হইল, এই গান নিশ্চয় সর্দার পাণ্ডাঠাকুর লিখিত যাহা–
‘আজু জাগরণে রাতিয়া বিতল সখী যে ভৈল ভোর গে, হায় রাম’–
এই মাঙ্গলিক সুললিত পদবন্ধ শ্রবণে তাকাইলেন–যে এবং কিয়ৎ রশি দূরে দৃশ্যমান হইল, ঘোর লাল পাটের সাড়ী পরিহিত, কালো তেলাল চুলে পাতাকাটা ও পাতায় চুমকী, নাকে ফাঁদি নথ ও নানাবিধ পিতলের অলঙ্কারে ভূষিত পাঁচটি হিজড়া একজন স্ত্রীলোককে, যাহার মাথায় বটপল্লবসহ ঘট, তাহাকে, মণ্ডলাকারে খেমটা নৃত্যে পরিক্রমণ করত, ঐ গীত সহকারে ক্রম অগ্রসর হয়; এই দলের পিছনে এক সুরম্য ডুলি ও যাহার অনুগমনে কুসুম-রঙ-ছোপান বস্ত্র শৌভিত আর রৌপ্য অলঙ্কার সজ্জিত দাসীরা যাহাদের হস্তে পূজা উপচার রহিয়াছে। সুঘরাইও ঐ সকল কিছু এইভাবেই দেখে! তার পর শোভাযাত্রা এক কারণে থামিয়াছে বসিয়াছে, হিজড়ার দল চুটা ধরায়। ঐ এখন আবার চলিতে সুরু করিল।
মনিব মহাশয় সবিস্ময়ে এহেন চমৎকার দলকে পর্য্যবেক্ষণ করিলেন যে তাঁহার ইদানীন্তন বৃত্তি বশবর্ত্তী তাহাদের কাছে খবর করিতে ইচ্ছা হইল; তিনি নির্ঘাত যে সুযোগ অপেক্ষায় তাহাদের অনুসরণে খানিক পথ যাইলেন, শিবগঙ্গার নিকট যখন পুনরায় সেই দল রুখিল, তৎকালে তিনি তাহাদের, ঐ হিজড়াদের কাছে–যেহেতু শোভাযাত্রার অন্য সকলেই মৌনী–সুঘরাইএর সংবাদ জানিতে গিয়া অস্বস্তিতে ইতস্তত অন্যত্র মনস্ক হইলেন। অনেকটা দূরে খোলার চালের বাড়ী, খোলার পলা-রঙা চালা ও তদুপরি পরমদ্ভূত দর্শন পোড়ামাটির হাতী ও পায়রা তদীয় দৃষ্টি ব্যাহত করে, সহসা এইগুলিতে তাহার বুকে আশ্চর্য পথে ভরসা আনিল। যে তাঁহার সঙ্কোচ আর নাই, তিনি মধুর বচনে হিজড়াদের কাছে ইহা উল্লেখে বলিলেন,–তোমরা কি আমার কথার উত্তর দিবে, যে বালক আপন গাত্র হইতে গেঞ্জীটি উন্মোচিয়া সেই গেঞ্জী দ্বারা আপন চক্ষু মুছিতে কালে তোমাদের প্রত্যক্ষ করে, এবং ভাবিয়াছিল, অনেক সময় যাবৎ তোমাদের দেখিলে মঙ্গল হয়, এবং সে আমাদের সাক্ষাৎ পাইবে এরূপ বিশ্বাসেই সে স্বাভাবিক! মনিব আরও বলিলেন, যে তোমাদের কুহকময় অঙ্গুলি আছে যেটি তোমরা আপন সুপুরু ওষ্ঠদ্বয়ে স্থাপনে আমাদের নিমিত্ত কর, মানুষের নিছক ধারাবাহিকতা পরোক্ষে স্মরণ করাও, যে তোমরা চম্পক অঙ্গুরীয় বৈপরীত্য; অঙ্গুরীয় আলো, তোমরা চমকপ্রদ স্তব্ধতা!…এখন সেই বালক, তোমাদের বিশ্রামের কারণ বুঝিয়া আপন পাপস্খলনের জন্যও মানুষের গলাতে ও স্বরে কি নোনা আছে–বলিল, যে সে মন্দির সমীপস্থ অঘটন দেখিয়াছে, যে সে চন্দ্রকলা ভূমিতে-বাঁকাচাঁদ এককলা জ্ঞানের প্রতীক যেমন শিবের মাথায় থাকে–পতিত হইতে দেখিয়া বৃক্ষে উঠিতে চাহিয়াছে, ঐ কীৰ্ত্তির চন্দ্রকলার মনোরমত্ব তাহাকে মুগ্ধ করে, সত্যই যাহা মননে যে কোন হিন্দুজনম সার্থক তখনই!
