সাদারল্যান্ড এলেন। এলেন রেজাউল করিম। এলেন দুই মহিউদ্দীন।
ক্যাপ্টেন জাফর বললেন, স্যার, আমি কি এখন বিদায় নিতে পারি?
অবশ্যই। শেখ মুজিব বললেন, এয়ার মার্শাল, আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, সে জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার মানুষেরা এসে গেছে। আমি হলাম জনগণের নেতা। এখন আমি আমার মানুষের সঙ্গে মিলব। আপনাকে ধন্যবাদ।
এয়ার মার্শাল জাফর চৌধুরী বিদায় নিলেন।
সাদারল্যান্ড বললেন, স্যার, আপনার জন্য হোটেল ক্ল্যারিজস বুক করা হয়েছে। হোটেলে যাওয়ার জন্য লিমুজিন প্রস্তুত।
মুজিব বললেন, রেজাউল, এরা কী করেছে? আমি টাকাপয়সা পাব কোথায়? ক্ল্যারিজস হোটেল অনেক দামি। অনেক টাকা রুম রেন্ট। আমাকে তুমি রাসেল স্কয়ারের সেই হোটেলটাতে রাখার ব্যবস্থা করো, যে হোটেলে আমি ৬৯ সালে এসে উঠেছিলাম।
রেজাউল করিম বললেন, স্যার, ওই হোটেলে বেকার স্টুডেন্টরা ওঠে। আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আপনার নিরাপত্তার বিষয়টা সবার আগে। আপনার ক্ষতি তো আমরা হতে দিতে পারব না।
আর শোনো। এরা লিমুজিন ঠিক করছে। আমি লিমুজিনে উঠব না। এরও ভাড়া অনেক বেশি। আমি রাষ্ট্রপতি। তবে গরিব দেশের রাষ্ট্রপতি।
এর মধ্যে সাংবাদিকেরা এসে ভিড় করেছেন। টেলিভিশনের ক্যামেরা চলে এসেছে।
পাইপে অগ্নিসংযোগ করে মুজিব বললেন, আমি ক্লান্ত। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, আমি বেঁচে আছি এবং ভালো আছি। আমি পরে আপনাদের সঙ্গে কথা বলব।
মুজিব লিমুজিনে উঠলেন না। উঠলেন রেজাউল করিমের গাড়িতে। ড. কামাল, তার স্ত্রী-কন্যারা উঠলেন লিমুজিনে।
গাড়ি চলতে লাগল ক্ল্যারিজস হোটেলের দিকে। রেজাউল করিম গাড়ি চালাচ্ছেন। লন্ডনের সকাল। একটু একটু বৃষ্টি হচ্ছে। রেজাউল করিমকে গাড়ি চালাতে হচ্ছে সাবধানে, যাতে কিছুতেই কোনো রকমের দুর্ঘটনা না ঘটে।
শেখ মুজিব তাঁর পাশে। মুজিব বললেন, রেজাউল করিম, এটা কি ঠিক যে আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি!
জি ঠিক। পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। নয় মাসের যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। অগণিত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নারীকে রেপ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কামান দাগানো হয়েছে। শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। লন্ডনের কাগজে বড় বড় হেডলাইন হয়েছে : জেনোসাইড। মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বি, ডাক্তার আলীম চৌধুরী–এ রকম শত শত বুদ্ধিজীবীকে মেরে ফেলা হয়েছে। এক কোটি মানুষ ইন্ডিয়াতে শরণার্থী হয়েছে…
শেখ মুজিবের চোখ বেয়ে দরদর করে অশ্রু গড়াতে লাগল।
১২৫
ব্যাঙ্গমা বলে, শেখ মুজিব লন্ডনে দারুণ অভ্যর্থনা পাইছিলেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, ক্ল্যারিজস হোটেলের সামনে ভিড় হইয়া যায়। নিরাপত্তাচৌকি বসাইতে হয়।
শেখ মুজিব ফোনে কথা বলেন তাজউদ্দীনের লগে। তিনি বলেন, তাজউদ্দীন, তোমরা চমৎকার কাজ করেছ। চমৎকার কাজ।
তাজউদ্দীন ফোনে কাঁদতে থাকেন।
মুজিব বলেন, শোনো, একটু পরে সংবাদ সম্মেলন করতে হবে। টকিং পয়েন্ট কী হবে?
তাজউদ্দীন বলেন, আমাদের স্বাধীন দেশের প্রধান নীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা…
.
১৮ নম্বরের বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করছে। শেখ নাসের এসেছেন, বঙ্গবন্ধুর চার বোন এসেছেন ছেলেমেয়েসহ। শেখ মণি তো এই বাড়িতেই থাকেন। তাঁরা বিবিসি রেডিওতে কান পেতে রাখেন। সবার চোখে অশ্রু।
এর মধ্যে বেজে উঠল ফোন। এই টেলিফোন সেটটা সরকারি উদ্যোগে সম্প্রতি এই বাড়িতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফোন ধরলেন কামাল। হ্যালো। প্লিজ হোল্ড অন। শেখ মুজিবুর রহমান উইল স্পিক।
হ্যালো। আব্বা, আমি কামাল।
হ্যালো, তোরা বেঁচে আছিস তো? তোদের মা কেমন আছে?
আব্বা, নেন, মার সাথে কথা বলেন। রেনু এগিয়ে এসে ফোন ধরলেন। হ্যালো, হাসুর আব্বা…
রেনু, তোমরা সবাই বেঁচে আছ তো?
হ্যাঁ। সবাই বেঁচে আছে…তুমি কেমন আছ? তোমার শরীর কেমন আছে…আমরা সবাই আছি…আল্লাহর রহমতে ভালো আছি…। কথার চেয়ে কান্না বেশি। কবে আসবা তুমি?
আমি কবে আসব, এটা এখনো ঠিক হয় নাই। ঠিক হওয়ামাত্র তোমাদের জানাব…
রাসেল ফোন নিল। বলল, আব্বা, তোমাকে কি ওরা ছেড়ে দিয়েছে? আব্বা, তুমি কবে আসবা? আব্বা, ওরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।
ঘরের সবাই দাঁড়িয়ে আছেন টেলিফোন ঘিরে। সবাই কাঁদছেন….
শেখ মুজিব বুঝে নিলেন রাসেলের এক কথা থেকে হাজার কথা। ওরা আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, শেখ মুজিব ফোনে কথা কন ইন্দিরা গান্ধীর লগে। ভারতীয় কূটনীতিকরা তার লগে দেখা কইরা তারে পরিস্থিতি বুঝান।
ব্যাঙ্গমি বলে, তার লগে দেখা করতে স্রোতের মতো মানুষেরা আসতে থাকে। তিনি বাঙালিগো পাঁচটা প্রতিনিধিদলের লগে সাক্ষাৎ করেন। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস আসেন, ডেভিড ফ্রস্ট আসেন। খানিকটা সময় মুজিব তাদের দেন। আসেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হারল্ড উইন্ডসন। আসেন সাবেক মন্ত্রী পিটার শোর। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তখন সাপ্তাহিক ছুটি কাটাইতেছিলেন গ্রামে। খবর পাইয়া তিনি ছুঁইটা আসেন। শেখ মুজিব ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে যান। হিথ নিজে বাইর হইয়া আইসা গাড়ির দরজা খুইলা দিয়া মুজিবরে ভিতরে নেন।
