আজও মহালয়া এলে সেই মৃত্যুর কথা মনে পড়ে আমার। সেই ভোর। গুরুদশা, হাতে কঞ্চি ও কম্বলের আসন, দুই ভাই বসে আছে বারান্দায়। গ্রামের অনেক মানুষ জন বসে আছে হেথাহোথা। মহালয়া এলে একটু মন খারাপ হয় সত্য। বাবা কাকারা কেউ নেই এখন। তাঁদের তর্পণ করা হয় এইদিন। আমি ভোরে বিছানায় শুয়ে সেই গোধুলীবেলার কথা ভাবি। বাবার সঙ্গে আমি কয়েকবার গঙ্গায় গিয়েছি। শেষে বাবা আর গঙ্গায় যেতেন না, বাড়িতে করতেন পিতৃপুরুষ স্মরণ। নিজে চণ্ডীপাঠ করতেন। বাবার প্রয়াণ হয়েছিল ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে। তারপর আমরা তিন ভাই একসঙ্গে তর্পণ করেছি বেশ কয়েক বছর। হ্যাঁ, বাড়িতে। গঙ্গায় সেদিন বড় কলরব, হৈ হৈ। বাড়ি অনেক শান্ত। একবার মহলয়ার আগের দিনে আমি ছিলাম সিউড়িতে এক সাহিত্যের এক অনুষ্ঠানে। লেখক রমানাথ রায়, জয়ন্ত দে, অরিন্দম বসু ছিলেন। পরদিন ভোরে আমরা চললাম ময়ুরাক্ষী ব্যারেজে। ময়ুরাক্ষীতে পিতৃতর্পণ করব। ব্যারেজে যা হয়, একদিকে জল টলটল করছে, অন্যদিকে ধুধু বালুচর। কী অপরিসীম শূন্যতা! সেই ভোরে সেখানে মানুষজনও বিশেষ ছিল না। হয়তো নদীর অন্য কোথাও হয় তর্পণ। নিঃঝুম প্রকৃতিতে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছিলাম প্রিয়জন না থাকার বেদনাটি। বাবার আগে তাঁর দুই ভাই চলে গিয়েছিলেন। সকলের কথা মনে পড়ছিল আমার। খা খা বালুচরে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত পিতৃকুল, মাতৃকুল যেন জল চাইছিলেন। ধোঁয়া ধোঁয়া তাঁদের দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। আমরা সকলেই ব্যারেজের জলের কাছে গিয়ে সেই জল হাতে ছুঁয়ে স্মরণ করেছিলাম পরলোকবাসী আত্মজনদের। প্রয়াত বান্ধব, অবান্ধবদের। চেনা অচেনাদের। আমাদের শাস্ত্র বলি দর্শন বলি তা কবি-কল্পনায় পরিপূর্ণ। বিশ্বাস এই যে মহালয়ার দিনে প্রয়াত সকল মানুষের জীবাত্মা মর্ত্যে আসে তৃষিত হয়ে। তাদের জলদান করতে হয়। শুধু আত্মজন নন তাঁরা, অনাত্মীয়, অচেনা, অবান্ধব, সন্তানহীন আত্মারা আসেন জল গ্রহন করতে। ময়ুরাক্ষী ব্যারেজের যেদিকে জল, সেইদিকে গভীরতা অনেক বেশি। বিপজ্জনকও। স্নান করা হয়নি। কিন্তু জল দিয়েছিলাম তাঁদের। তাঁরা তা নিয়েছিলেনও জানি। আমি ফিরে আসতে আসতে দেখেছিলাম ধূ ধূ বালুচরে দাঁড়িয়ে আছেন, পিতা, পিতৃব্য, পিতামহ, পিতামহী, মাতামহ, মাতামহী, প্রপিতামহ…।
মহালয়ার পরদিন থেকে শুক্লপক্ষের শুরু। আমাদের উৎসব শুরু হয়ে যায় মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্ঠধ্বনিতে। বাণীকুমার প্রযোজিত আকাশবানীর ওই অনুষ্ঠান পুজোর অঙ্গ হয়ে গেছে বুঝি এখন। ঐ কণ্ঠই যেন ঘোষণা করে শারদোৎসব সমাগত। কতকাল ধরে, সেই বাল্যকাল থেকে শুনছি, কিন্তু এখনো যেন নতুন হয়েই আসে তা বৎসরান্তে। সুপ্রীতি ঘোষের কন্ঠে সেই গান, “বাজলো তোমার আলোর বেণু, মাতলো রে ভুবন” ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। তারপর বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্ঠে মহিষাসুর মর্দিনী। ঘুম আর তন্দ্রার ভিতরে কানে আসে সেই অমৃতবাণী। হ্যাঁ, আকাশবাণীর এখানে জিত। টেলিভিশন কিছুই করতে পারেনি মহিষাসুরমর্দিনী সাজিয়ে গুজিয়ে দেখিয়ে। এখানে যে কল্পনা আছে, টেলিভিশনে তা নেই। মুক্তা ফলের মতো নীলাভ ঊষাকালে সেই কল্পনাকে আর কিছুই ছাপিয়ে যেতে পারে না।
মহালয়ার দিন থেকে আর মন থাকে না কাজে। আর তো কয়েকটা দিন। মহালয়ার আর এক স্মৃতি আছে, সেবার পিতামহের অসুখের চিকিৎসার জন্য বাবার হাত খালি। পুজোর জামা প্যান্ট হয়নি। কাঁদছি। বাবা আমার মামিমার হাতে দশটি টাকা দিয়ে বললেন, শ্যামবাজারে গিয়ে কিনে দাও যা হয়। ফুটপাথের হকারের কাছ থেকে দশ টাকায় জামা, প্যান্ট, অলিম্পিক হাওয়াই…। আহা কী আনন্দ। সেই আনন্দ টিকিয়ে রেখেছি এখনো। মহালয়ার দিনে সেই সন্ধ্যার কথাও মনে পড়ে খুব।
বিশ্বচরাচরের আনন্দ
সারা বছর কায়ক্লেশে বেঁচে থাকি, উৎসব নিয়ে আসে তা থেকে মুক্তি। বাঙালির জীবনে বারো মাসে তের পার্বণ। এর ভিতরেই বড় উৎসব হিন্দুর দুর্গোৎসব আর মুসলমানের ইদুল ফিতর, খুশির ইদ,আর ক্রিস্টানের বড়দিন। তিন মহোউৎসব বাদ দিয়ে ধর্মীয় এবং লোকপুরাণের সঙ্গে যুক্ত আরো কত যে উৎসব, টুসু, ভাদু, নবান্ন থেকে নানা ব্রত, শবেবরাত, পীর-ফকিরের উরস সব। সমস্ত উৎসবই আনন্দের, সমস্ত উৎসবই আত্মীয় বান্ধব, অবান্ধবে মিলনের। দুর্গোৎসবের পশ্চাতে শরতের চালচিত্র, ভয়ানক গ্রীষ্ম আর তিন মাস বর্ষার পর শরত কাল আশ্বিন মাস আসে আনন্দের ধ্বজা উড়িয়ে। ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা, আকাশ নীল বরণ, তার ভিতরে পুঞ্জপুঞ্জ শাদা মেঘের ভেলা, নদীর তীর খোলা মাঠের ধারে কাশবন, পুজো আসছে। প্রকৃতির ভিতরেও মুক্তির আনন্দ। যদি শহর থেকে দূরে যান, ঢাকের শব্দ ভেসে আসবে। শারদোৎসব জানান দেয় ঢাকিরা। কত দূর থেকে ভেসে আসে ঢ্যাম কুড়কুড় কুড়, ঢাকের শব্দ। আমাদের এই উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির যোগ। প্রকৃতিই আনন্দ নিয়ে আসে, উৎসবে তা পূর্ণতা পায়।
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ,
আমরা বেঁধেছি শেফালিমালা,
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।
এস গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,
এসো নির্মল নীল পথে।
মানুষের জীবন প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতি এই জীবন-জন্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। শরত এলে তা স্পষ্ট হয়। মনের ভিতরে নীলাকাশ, কাশের বন আর শেফালি ফুল ছায়া ফেলে। আনন্দের দিন এসেছে বলে প্রস্তুত হই আমরা। আমাদের পুরাণ, যা কি না শাস্ত্র বলে মানা হয় তা কবি কল্পনায় পূর্ণ। সেই পূর্ণতার ছায়া এসে পড়ে দৈননন্দিনতায় ক্লিষ্ট মানুষের জীবনে। শারদোৎসব যতটা না ধর্মীয়, ততটাই হয়ে উঠেছে লোক জীবনের। অন্তত এখন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারি পাওয়া জমিদার গৃহে দুর্গা পুজো মহারানি ভিক্টোরিয়ার বন্দনা কি না সেই কূট তর্কে না গিয়ে বলি সদর-মফস্বল এখন দুর্গোৎসবকে জনমানসের উৎসব করে তুলেছে। এমন আনন্দের উৎসব আর নেই। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে দুর্গোৎসবে নিজেকে সামিল করতে চায়। দেবীর চালচিত্র, দেবীর সঙ্গে দুই পুত্র দুই কন্যা, আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যে যে প্রাণী জড়িত তারা তাঁদের বাহন। মহিষ, ইঁদুর, হাঁস, পেঁচা তো এই বঙ্গ জীবনের সাথী। আর ময়ূর তো বাঁকুড়া পুরুলিয়ার জঙ্গলে দেখা যায়। ছেলেবেলায় পেটমোটা হাতির মাথা বসান গণেশ ঠাকুর ছিল সবচেয়ে আনন্দের। অতবড় গণেশ ঠাকুর, তার চেলা ঐটুকুনি মুষিক। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী আছে। বাল্যকালে মা দুর্গা, লক্ষ্মী সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ – সকলকে প্রথমে প্রণাম। তারপর রক্তাক্ত নিহত মহিষাসুরকে প্রণাম, তারপর সিংহ হয়ে পেঁচা, হাস, ময়ূর এবং ইঁদুর ঠাকুরকে। বিশ্বাস হতো না মহিষাসুর সত্যি সত্যি নিহত হতো। তাহলে পরের বছর কী করে আসেন? মা যেমন আসেন তাঁর সন্তানাদি নিয়ে, তেমনি আসেন মহিষাসুরকে নিয়েও। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। আমাদের এপারের গ্রামের নাম দণ্ডীরহাট। সেই গ্রামে ছেলেবেলা কেটেছে। পুজোর আনন্দ শুরু হতো সেই রথযাত্রার দিনে কাঠামো কাটা শুরু হতে। বসু জমিদার বাড়ির চন্ডী মন্ডপে ঠাকুর তৈরি আরম্ভ হতো সেই রথযাত্রার দিন থেকে। আমাদের ইস্কুলের পাশেই সেই চণ্ডীমণ্ডপ। প্রতিদিন ইস্কুলের ছুটির ঘন্টা পড়ে গেলে দেখতে যেতাম আনন্দের জন্ম। কাটামোয় খড় বাঁধা হচ্ছে, আনন্দ। মৃৎ শিল্পীরা বসে গল্প করছে, আনন্দ। কাঠামোয় মাটি পড়ছে, আনন্দ। খড়ের কাঠামোয় দেখতে পাচ্ছি মায়ের আদল, আনন্দ। বর্ষাকাল চলছে, তার ভিতরেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে মা দুগগার পরিবার। সমস্তটাই আনন্দ। মৃৎশিল্পীরা যদি একবার বলেন, খোকা ওটা দাও, এটা ধরো, জীবন ধন্য, আনন্দ। আমাদের সহপাঠী রমানাথ পণ করেছিল ঠাকুর গড়ার শিল্পী হবে। সে একবার, তখন ক্লাস সিক্স, সরস্বতী ঠাকুর গড়েছিল। মূর্তি যা গড়ার গড়েছিল, কিন্তু মুখখানি তো পারেনি, কেন না ছাঁচ কোথায় পাবে? থ্যাবড়া মতো হয়েছিল, মোঙ্গলয়েড মুখ, তাও নয়, শ্রীহীন, কিন্তু “নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা”, সেই মূর্তিতেই কত আনন্দ। রমানাথ পরে এই লাইনে আসেনি। ঠিকেদার হয়ে প্রভূত আয় করেছে। ঠাকুর না গড়ে পুজোর প্যান্ডেল বানিয়েছে কি না আমি জানি না। যাই হোক, খুড়তুতো ভাই বোন মিলে দশ দশ কুড়িজন। তার ভিতরে বড়জন অধ্যাপনা করেন রানিগঞ্জে। আমরা তিনজন, পবন, ডাকু ও আমি কাছাকাছি বয়সের। আমাদের তিনজনের জন্য একই থান কেটে জামা, একই রকম হাফ প্যান্ট। ইউনিফর্ম। পুজোর আনন্দ নতুন জামা কাপড়ে।
