ঘুম ঘুম গলায় জিনিয়া বলল, “আমি আজ যাব না। টোটোওয়ালাকেও বারণ করে দিন। ঘুম পাচ্ছে।”
উদ্দালক আর কিছু বলল না।
জিনিয়া ঘুমাচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দশটা বাজল। দেখল উদ্দালক স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। তাকে দেখে বলল, “সারাদিন একা একা কী করবেন? বই পড়তে পারেন, টিভি দেখতে পারেন। মাসি রান্না করে দিয়ে গেছে। খেয়ে নেবেন। সকালের জন্য রুটি আলুর দম আছে।”
জিনিয়া বলল, “খবরের কাগজ নেন না আপনি?”
উদ্দালক স্টাডিরুম থেকে কাগজ এনে দিয়ে বলল, “এই যে। আমি চেষ্টা করছি লাঞ্চ টাইমে একটু উঁকি দিয়ে যাওয়ার। যে-কোনো অসুবিধা হলে ফোন করবেন।”
জিনিয়া বলল, “ঠিক আছে।”
উদ্দালক বলল, “স্কুল থেকে সবাই মিলে ডাইনিং সেট, আরও কী কী সব দিয়েছে। টেবিলের ওপর রেখেছি। দেখে নেবেন। ওদের আবার খাওয়াতে হবে। আমি আসি। সাবধানে থাকবেন। বাড়িওয়ালা কাকিমাকে বলব আপনার সঙ্গে কথা বলতে?”
জিনিয়া ঘাড় নাড়ল, “না, আমি আর-একটু ঘুমাতে চেষ্টা করি বরং।”
উদ্দালক বলল, “ফাইন। সেটাই বেস্ট হবে। আসি?”
জিনিয়া ঘাড় নাড়ল।
উদ্দালক বেরোতে জিনিয়া অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিল যেতে পারবে না।
কিছু কাজ পেন্ডিং আছে জানালেন সুপ্রতিম। জিনিয়া জানাল ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে যতটা সম্ভব করে দেবে সে। টিভি চালাতে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখল জানলা দিয়ে পল্টু উঁকি মারছে, “আজ স্কুল ডুব দিয়েছি। স্যার জানেন না। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। দেখি জানলা খোলা। আপনি অফিস যাননি বউদি?”
জিনিয়া হাসল, “না, যাইনি। তুমি স্কুল ডুব মারলে কেন?”
পল্টু মাথা চুলকে বলল, “স্কুল আমার ভালো লাগে না। স্যারের ক্লাস ছাড়া একটা ক্লাসও ভালো না। আচ্ছা আপনি ডাব খাবেন?”
জিনিয়া বলল, “কোত্থেকে আনবে তুমি?”
পল্টু বলল, “একটু অপেক্ষা করুন, নিয়ে আসি।”
সাইকেল বাঁই বাঁই করে চালিয়ে পল্টু চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে দুটো ডাব এনে বলল, “এ নিন। আমাদের গাছের। আমি মাঝে মাঝে এসে খবর নেব। চানাচুর খাবেন? দিয়ে যাচ্ছি!”
জিনিয়া হেসে ফেলল। এ ছেলেটা এক্কেবারে পাগল তো!
১১
দুপুরবেলা।
জিনিয়া বই পড়ছিল উদ্দালকের স্টাডিরুমে। টেনিদা সমগ্র। পল্টু আমের আচার দিয়ে গেছে। আচার খেতে খেতে বই পড়তে বেশ ভালো লাগছিল। ফোন বাজতে শুরু করল তার। দেখল মা ফোন করছে। ধরল, “বলো।”
মালতী বললেন, “কি রে, অফিসে আছিস মা?”
জিনিয়া বলল, “না, আজ অফিস যাইনি।”
মালতী বললেন, “ও। জামাইও যায়নি?”
জিনিয়া বলল, “কে জামাই?”
মালতী একটু থমকে বললেন, “উদ্দালক।”
জিনিয়া বিরক্ত গলায় বলল, “এরকম জামাই জামাই বলবে না। শুনতে ভালো লাগে না। নাম ধরে ডাকো।”
মালতী বললেন, “আচ্ছা। বলব না। উদ্দালক স্কুলে যায়নি?”
জিনিয়া বলল, “গেছে।”
মালতী বললেন, “কাল কী হয়েছিল?”
জিনিয়া বলল, “সৌপ্তিকের বাড়ি গেছিলাম। ওখানেই ছিলাম। রাতে জানালাম তো।”
মালতী বললেন, “সেটা তো জানি ওখানে ছিলি। কিন্তু গিয়ে ঠিক কী সমস্যা হয়েছিল সেটা তো বলতে পারিস?”
জিনিয়া বলল, “সৌপ্তিকের কথা মনে পড়ছিল। কী করব বলো? ভালোবেসেছিলাম তো। এত সহজে তো ভোলা যায় না।”
মালতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “উদ্দালক রাগ করেনি?”
জিনিয়া বলল, “জানি না। করতেও পারে। তাতে আমি কী করব?”
মালতী বললেন, “দেখ তিন্নি, কোনও ছেলে অন্য কারও অস্তিত্ব মেনে নিতে চায় না। তুই উদ্দালকের সামনে বেশি সৌপ্তিকের কথা বলিস না। ঠিক আছে?”
জিনিয়া কোনও তর্ক না করে বলল, “ঠিক আছে। তোমার আর কিছু বলার আছে? রাখলাম।”
মালতী কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে দিল জিনিয়া।
উদ্দালক ঢুকল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। বলল, “খেয়ে নি চলুন। বাহ, ভালো বই পড়ছেন তো। ‘তপন চরিত’ পড়ে দেখতে পারেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের। বেশি লোক পড়েনি। ভালো লাগবে দেখবেন।”
জিনিয়া উঠল। বলল, “আচ্ছা, আপনি আমাকে একটা কথা বলুন।”
উদ্দালক বলল, “কী কথা?”
জিনিয়া বলল, “আমার মা বলল কোনও ছেলে অন্য কারও অস্তিত্ব মেনে নিতে চায় না। আপনার সামনে সৌপ্তিকের কথা বললে আপনি মেনে নিতে পারেন না?”
উদ্দালক বলল, “ধুস, আমার কেন ওসব হবে? আমরা তো কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ করেছি। ওসব যারা সারাক্ষণ প্রেম প্রেম করে লাফায় তাদের মধ্যে হতে পারে। আমাদের বাঙালিদের সমস্যা হল, আমরা সারাজীবন প্রেমটাই করে যাই। প্রেম ছাড়াও অনেক কিছু করার আছে। তার মধ্যে সবথেকে উপরের দিকে আছে পড়াশোনা। সর্বক্ষণ রিলেশন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে করে আমরা পড়াশোনার বারোটা বাজিয়ে দি। ক্লাস এইট-নাইন থেকে পাবলিক আজকাল প্রেম করতে শুরু করে। এই তো পল্টুদের ক্লাসের বিনোদ নাকি এখনই প্রেম করে। কী হবে প্রেম করে? নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা মার খাবে। আর কম বয়সের মেয়ে বাচ্চা কোলে ঘুরে বেড়াবে। ভালোবাসা জিনিসটাই বোগাস বুঝলেন?”
জিনিয়া বলল, “আপনি এত কিছু কী করে বুঝলেন? আপনি কোনও দিন কোনও রিলেশনে ছিলেন?”
উদ্দালক জোরে হেসে উঠল, “খেপেছেন? আমাকে পাগল কুকুরে কামড়েছে যে আমি রিলেশনে যাব? আমার বরাবর পাখির চোখ একটাই। আরও পড়াশোনা করে যাওয়া। আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট ইন রিলেশনশিপ। আশা করি আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন?”
