মা বলল, “খেয়েছি। তোর চিন্তায় আমার ঘুম হয় না ভালো করে। প্রেশার সুগার সব বেড়ে যাবে।”
উদ্দালক বলল, “চিন্তা করার কিছু নেই মা। আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি, চাকরি করছি, খাচ্ছি ঠিকঠাক। কত লোক আছে খেতেই পায় না ঠিক করে। চাকরি পর্যন্ত পেতে তাদের কত কষ্ট। তাদের থেকে তো ভালো আছি। অকারণ চিন্তা কোরো না। নিজের খেয়াল রাখো। রাখি?”
ফোন রেখে উদ্দালক শ্বাস ছেড়ে বই পড়তে শুরু করল। জিনিয়া বলল, “আমি এই অ্যালবামটা নিয়ে যাব।”
উদ্দালক বলল, “ঠিক আছে। ওঁরা কিছু মনে করবেন না তো? ওঁদের বলে নেবেন।”
জিনিয়া একটু থমকে বলল, “তা ঠিক, না বলে নেওয়া যাবে না।”
উদ্দালক সোফার ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। সকাল সকাল ট্রেনে করে কলকাতা আসার ক্লান্তিতে ঘুম পেয়ে গেছিল তার।
জিনিয়া বলল, “আপনি খাটে শুতে পারেন।”
উদ্দালক বলল, “না ঠিক আছে। আপনার হয়ে গেলে ডাকবেন। আমি একটু ঘুমাই।”
শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্দালক ঘুমিয়ে পড়ল।
৬
শেয়ালদা স্টেশন থেকে তারা ট্রেনে উঠল বিকেল নাগাদ। অফিস টাইমের ভিড়। জিনিয়াকে বসিয়ে তার সামনে বসে উদ্দালক বলল, “ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে পারবেন?”
জিনিয়া বলল, “পারব। পারতে হবে। না পারলে হবে না, চাকরি ছাড়তে পারব না।”
উদ্দালক বলল, “ঠিক আছে। প্রথমদিকে নাহয় ট্রেনে তুলে দিয়ে আসব।”
জিনিয়া বলল, “না না পারব।”
উদ্দালক আর কিছু বলল না।
সন্ধে সাতটা নাগাদ তারা ট্রেন থেকে নামল। অটো নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখল পল্টু দাঁড়িয়ে আছে। উদ্দালক জিভ কাটল, “দেখলেন, পল্টু আসবে ভুলেই গেছিলাম।”
দরজা খুলল উদ্দালক। পল্টু বলল, “স্যার, কাল স্কুলে যাবেন তো?”
উদ্দালক বলল, “হ্যাঁ। কেন রে?”
পল্টু বলল, “মিষ্টি নিয়ে যাবেন স্যার। সব স্যাররা বলছিল আপনি এলেই খাওয়াতে বলবে। আপনি আগে থেকেই মিষ্টি নিয়ে যাবেন।”
উদ্দালক জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল, “এখানকার নিয়ম এটাই। রিটায়ারমেন্ট থেকে বিয়ে, সবেতেই খাওয়াতে হয়। এদিকে দেখুন এখানে সবাইকেই বিয়েতে বলেছিলাম, কেউ গেলেন না। জানে অত দূরে গিয়ে কী হবে, সেই তো স্কুলে খাওয়াদাওয়া হবে।”
জিনিয়া হাসল। উদ্দালক পল্টুকে বলল, “যা স্টাডিতে গিয়ে অঙ্কগুলো করতে শুরু কর। আমি আসছি।”
পল্টু স্টাডিরুমে গিয়ে বসল।
উদ্দালক ফ্রেশ হয়ে পড়াতে বসল। জিনিয়া কিছুক্ষণ টিভি দেখল। তার খিদে পাচ্ছিল। সেই দুপুরের পরে আর খাওয়াও হয়নি।
উদ্দালক ঘর নক করল। জিনিয়া খুলে দেখল উদ্দালকের হাতে রোল। উদ্দালক বলল, “এখানকার রোল। কলকাতার মতো লাচ্চা পরোটার রোল না, তবে খেতে ভালো। আপাতত এই খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করুন, পল্টু দেশি মুরগি নিয়ে আসছে, রাতে রুটি দিয়ে সেই খাওয়া যাবে। আপনি দেশি মুরগির ঝোল খান তো?”
জিনিয়া বলল, “হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ পরেই রান্নাঘরে ছাত্র শিক্ষকের চূড়ান্ত তৎপরতা শুরু হল। পল্টু মাংস ধুয়ে নিল। উদ্দালক একটা বারমুডা আর গামছা পরে রান্না শুরু করল। জিনিয়া বলল, “আমি কিছু করে দেব?”
উদ্দালক বলল, “আপনি? না না, আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমরাই করে নিচ্ছি।”
পল্টু গম্ভীর গলায় বলল, “স্যার, বউদি আটা মেখে দিতে পারবেন?”
জিনিয়া বলল, “হ্যাঁ পারব। দাও।”
উদ্দালক বলল, “না না, কী দরকার, আমরা করে নিচ্ছি।”
জিনিয়া বলল, “না ঠিক আছে। আমি রুটি করতে পারি। কটা রুটি করতে হবে?”
উদ্দালক বলল, “আপনি কটা খাবেন?”
জিনিয়া বলল, “তিনটে।”
উদ্দালক বলল, “আমিও তিনটে। আর পল্টুর জন্য বারোটা। মানে আঠেরোটা রুটি করতে হবে।”
জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, “পল্টু বারোটা খেতে পারবে?”
উদ্দালক হাসল, “ও হল বাংলার দামাল ছেলে। এই সাঁতার কাটছে, এই দৌড়োচ্ছে, সারাক্ষণ ওর খিদে পায়। আপনার অসুবিধে হলে থাক। আমি রুটি করে দিচ্ছি।”
জিনিয়া বলল, “না না, আমি করে নেব। কোনও অসুবিধা নেই। করছি।”
তিনজনে মিলে দেড় ঘণ্টার মধ্যে রান্না হয়ে গেল। বেশিরভাগ মাংস পল্টুই খেল। খাওয়ার পর পল্টু বলল, “স্যার রসগোল্লা নিয়ে আসব? এরকম সুন্দর রান্নার পর রসগোল্লা ভালো লাগবে।”
উদ্দালক বলল, “থাক। তোকে আর বেরোতে হবে না। আমি সাইকেল নিয়ে গিয়ে নিয়ে আসছি। তুই বউদির কাছে বস।”
উদ্দালক বেরিয়ে গেল।
পল্টু বলল, “বউদি আপনি জামরুল খাবেন? আমাদের বাড়িতে দারুণ জামরুল হয়।”
জিনিয়া হাসল, “ঠিক আছে। নিয়ে এসো।”
পল্টু উৎসাহ পেয়ে বলল, “আমি ভালো গাছও বাইতে পারি। ডাব হলে পেড়ে নিয়ে আসব।”
জিনিয়া বলল, “তুমি এইটুকু বয়সে এত সব কিছু পারো?”
পল্টু দাঁত বের করল, “হ্যাঁ বউদি। সব পারি। স্যার পারেন না। আমি একদিন স্যারকে বললাম স্যার চলুন নারকেল গাছ বাই, বললেন ওরে বাবা, ওসব আমি পারব না। নারকেল গাছ বাওয়া কী এমন কঠিন বলুন?”
জিনিয়া বলল, “সেটা তো আমিও জানি না। আমিও কোনও দিন নারকেল গাছ বাইনি।”
পল্টু হাত-টাত নাড়িয়ে গাছ বাওয়া নিয়ে জ্ঞান দিতে শুরু করল। জিনিয়ার শুনতে মজা লাগছিল। এই কৈশোরের স্বাদ তারা পায়নি। কংক্রিটের জঙ্গলে আর মোবাইলের যুগে এখনও এই কৈশোর বেঁচে আছে, এটাও কম নয়।
উদ্দালক এসে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যে। বলল, “রসগোল্লার সঙ্গে পান্তুয়াও নিয়ে এসেছি। এখানকার বিখ্যাত। আর আপনার জন্য টোটো বলে এলাম। কাল সাড়ে সাতটার সময় চলে আসবে। আটটা দশের লেডিস স্পেশাল পেয়ে যাবেন।”
