মানালি হাসল, “ওকে। বলে যান।”
দীপ বলল, “দেখুন আমি এককালে ভীষণ ভালো ছেলে ছিলাম। বয়েজ স্কুলে পড়েছি, পড়াশুনায় ভালো ছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং কো-এড ছিল যদিও, কিন্তু কোনও দিন এইসব প্রেম-ট্রেম নিয়ে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। চাকরি পাবার পর শেয়ার মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ইত্যাদি নিয়ে ভালোই ছিলাম। গোল বাধল একটা বিয়েবাড়িতে গিয়ে।”
মানালি বলল, “বিয়েবাড়ি একটা ইন্টারেস্টিং জায়গা বটে। বেশিরভাগ বাঙালির প্রেম শুরু হয় কোনও না কোনও বিয়েবাড়ি থেকে।”
দীপ বলল, “আপনার হয়েছিল?”
মানালি বলল, “ছোটোখাটো। কিন্তু সে ছেলে এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। আপনি বলে যান।”
দীপ বলল, “ওকে। যা বলছিলাম। এই বিয়েবাড়িতে গিয়েই চিত্রলেখার সঙ্গে আমার আলাপ। বেশ পছন্দ হয়েছিল ওকে। সুন্দরী। কিন্তু ওই যে, আমার ঠাকুরদা বলত, কারও সঙ্গে এক ছাদের তলায় না থাকলে বোঝা যায় না সে মানুষটা আসলে কেমন। কারও সঙ্গে দু ঘণ্টা দেখা হওয়া, আর চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। যদিও চিত্রলেখার সঙ্গে আমি একসঙ্গে থাকিনি, কিন্তু বিশ্বাস করুন, খানিকক্ষণ কথাবার্তা চলার পরে আমি বুঝতে পারলাম যতই ওকে আমি আলাদা আলাদা ভাবি না কেন, ভেতরে ভেতরে মেয়েটা অদ্ভুত ন্যাগিং নেচারের একটা মেয়ে। একটু অল্পতেই আমি হাঁফিয়ে উঠলাম।”
মানালি বলল, “সো ইউ ডিসাইডেড টু ব্রেক আপ?”
দীপ বলল, “না। একেবারেই না। মাথায় যে একেবারে আসেনি তা নয়, কিন্তু তখনও অতটা দূরে ভাবতে পারিনি।”
মানালি বলল, “তবে? সমস্যাটা কখন শুরু হল?”
দীপ একটু ইতস্তত করে বলল, “সমস্যাটা আসলে চিত্রলেখা শুরু করেনি। সমস্যাটা শুরু করেছিল আমার সন্দিগ্ধ মন। কথায় কথায় ওর এক্সের নম্বর আমি পেয়ে গেছিলাম। ওই নাম্বারে ফোন করে আমি জানতে পারলাম ওই ছেলেটার সঙ্গে চিত্রলেখার ফিজিক্যাল রিলেশন হয়েছে। এদিকে চিত্রলেখা আমাকে বলেছিল ওর তেমন কিছুই হয়নি। ছেলেটার গলায় একটা অদ্ভুত কনফিডেন্স লক্ষ করেছিলাম। চিত্রলেখা ভার্জিন কি না সেটা আমার মাথায় ঘুরছিল না, আমার শুধু মনে হচ্ছিল যে সম্পর্কের ভিত্তিই মিথ্যে দিয়ে তৈরি, সে সম্পর্কের আদৌ কোনও ভবিষ্যৎ থাকে কি? আমি কনফিউজড হয়ে পড়লাম। আর এমন আয়রনিক ব্যাপারটা, আমি চিত্রলেখার সত্যি মিথ্যা নিয়ে ভাবছিলাম, আর এর পরেই সবথেকে বড়ো মিথ্যাবাদীর মতো কাজগুলো আমি করতে শুরু করলাম। ঋতির সঙ্গে আলাপ হল, আর… বাকিটা ইতিহাস।”
দীপ পেন দিয়ে দুটো নামই অনেকক্ষণ ধরে কাটল।
মানালি সেদিকে তাকিয়ে বলল, “এই মুহূর্তে ঠিক কী অবস্থা?”
দীপ বলল, “এমন কপাল, ঠিক করলাম এসবের থেকে আমি বেরিয়ে আসব। বাড়িতে বললাম মেয়ে দেখতে। এত কিছুর পরে মা সেই চিত্রলেখার বাড়িতেই নিয়ে গেল আমাকে। প্রথমে খুব রাগ হল। পরে কেন জানি না চিত্রলেখার কথা ভেবে একটা অপরাধবোধ এল। ঠিক করলাম চিত্রলেখাকে বিয়ে করব।”
মানালি বড়ো বড়ো চোখ করে দীপের দিকে তাকাল, “কিন্তু আপনি ওর নামটা কেটে দিলেন যে?”
দীপ বলল, “সে তো আমি ঋতির নামও কাটলাম। কিন্তু আসলে তো আমি ওকেই ভালোবাসি।”
মানালি কয়েক সেকেন্ড দীপের দিকে তাকিয়ে বলল, “অসাধারণ তো!”
দীপ দাঁত দিয়ে ডান হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, “চিত্রলেখা আর ঋতি খুব ভালো বন্ধুও বটে।”
মানালি বলল, “বাহ। তাহলে তো সোনায় সোহাগা।”
দীপ বলল, “তবে সুখের খবর হল ঋতি পরের মাসে বাইরে চলে যাচ্ছে।”
কফি এসে গেছিল। মানালি কফিতে চিনি মেশাতে মেশাতে বলল, “আপনার সঙ্গে কথা বলার একটা ভালো ব্যাপার হল, এই সময়টাতে আমি ভুলে গেছিলাম পৃথিবীর বাকি মানুষেরা, কিংবা আমি, ঠিক কতটা সমস্যায় আছি। আমার এক বন্ধুর বয়ফ্রেন্ড মারা গেছে, এক সেলিব্রিটি আমার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পেপারের ওপর ডিফেমেশন চার্জ এনেছেন, একটা নতুন চাকরির অফার এসেছে, সেটায় যাব না যাব না কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছি না, বিশ্বাস করুন আমি সব ভুলে যাচ্ছিলাম।”
দীপ অধৈর্য হয়ে বলল, “আমাকে একটা সলিউশন বলুন প্লিজ।”
মানালি বলল, “কেমন সলিউশন?”
দীপ বলল, “আমি এসবের থেকে বেরোতে চাই। এরকম আর কটা দিন চললে আমি জাস্ট পাগল হয়ে যাব।”
মানালি বলল, “আপনি টস করতে পারেন। যার নাম আসবে…”
দীপ বলল, “মজা করছেন?”
মানালি বলল, “একেবারেই না।”
দীপ বলল, “কিন্তু যদি চিত্রলেখা জেতে? ও ভীষণ অ্যানোয়িং।”
মানালি বলল, “তাহলে ঋতি।”
দীপ বলল, “ঋতি আমাকে দেখলেই কেমন রেগে যায়। আমাকে ঠিক সহ্য করতে পারে না। নিশ্চয়ই চিত্রলেখাকেও আমার নামে অনেক কিছু বলেছে। দেখুন আমি চাই ঋতি আর চিত্রলেখার বন্ধুত্বটা কেটে যাক। ওইজন্যই তো আমি চিত্রলেখাকে বিয়ে করার কথা বলেছি।”
মানালি একটু হেসে নিয়ে বলল, “আমার এক বন্ধু ক্লাস টুয়েলভ ফেল করেছিল, বাবার মারের ভয়ে পাড়ার একটা বখাটে ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছিল। এখনও আপশোশ করে। ঝোঁকের মাথায় কোনও রকম সিদ্ধান্তই বোধহয় নেওয়া উচিত না।”
দীপ মাথা চুলকে বলল, “তাহলে আমার গেম প্ল্যান কী হওয়া উচিত?”
মানালি বলল, “অফিস করুন। আর কোনও দিকে তাকাবেন না। সময়মতো বিয়ে থা করে তারপরে সংসার করুন। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি এটাই বলব।”
