চিত্রলেখা বলল, “থাক। আমি আর কিছু বলব না। তুমি বসে থাকো। সেটাই ভালো। অন্তত কিছুক্ষণ তো থাকবে। সেটাই অনেক।”
দীপ কিছু বলল না। গম্ভীর মুখে বসে রইল।
৩৪
সকাল সাড়ে দশটায় ঘুম ভাঙল মানালির। রাতটা দুঃস্বপ্নের মতো গেছে।
সৌরভ সারারাত ফেরেনি। বিতস্তার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। সামান্য শব্দেই বিতস্তা ভেঙে পড়ছিল। ভোর নাগাদ চেক আউট করেছে বিতস্তা। হোটেলে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছে। আই কার্ড দেখিয়েছে। সৌরভের আই কার্ড হোটেলেই আছে। সৌরভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানালি সকাল সাড়ে ছটার পরে আর জাগতে পারেনি। যখন জানতে পেরেছিল বিতস্তা ট্যাক্সিতে উঠে গেছে, তারপরেই ফোন অফ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ঘুম ভাঙলেও গা হাত পা ব্যথা করছিল। রাত জাগলে এই সমস্যাগুলো হয়। উঠে ফোন অন করে বসার ঘরে গিয়ে বসল। বাবা টিভি দেখছিল। তাকে দেখে বলল, “কোনও প্রবলেম?”
মানালি দেখল মা একটু দূরত্বে আছে, গলা নামিয়ে বলল, “মাইনর। বড়ো কিছু না।”
বাবা বলল, “তোর?”
মানালি মাথা নাড়ল ঘুম গলায়, “না না, আমার না। এক কলিগের। মিটেছে পার্শিয়ালি। দেখছি কী করা যায়।”
বাবা বলল, “এখন বেরোবি?”
মানালি বলল, “ফোন করতে হবে। ইচ্ছা করছে না বেরোতে।”
বাবা বলল, “তাহলে ডুব মেরে দে।”
মানালি মাথা নাড়ল, “খেপেছ? অফিস যেতেই হবে।”
ফোনটা সবে অন হয়েছিল। বাজতে শুরু করে দিল। মানালি দেখল বিতস্তা ফোন করছে, ধরল তাড়াতাড়ি, “বল। সৌরভের খোঁজ পেলি?”
বিতস্তা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “না রে, থানা পুলিশে যেতেও কেমন কেমন লাগছে।”
মানালি বলল, “অফিসে আয়। কথা বলে দেখি কী করা যায়।”
বিতস্তা বলল, “বিশ্বরূপদাকে বলবি না তো?”
মানালি আড়চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে উঠে নিজের ঘরে এল, “দ্যাখ, ব্যাপারটা যথেষ্ট সিরিয়াস মনে হচ্ছে। বিশ্বরূপদাকে না বললে মনে হয় না কিছু হবে। শোন না, একটা কথা বলবি?”
বিতস্তা বলল, “বল।”
মানালি বলল, “কাল রাতে কি তোদের মধ্যে কোনও ব্যাপারে ঝগড়া হয়েছিল? সিরিয়াসলি বলবি।”
বিতস্তা একটু চুপ করে থেকে বলল, “একটা ব্যাপার নিয়ে চলছিল। তবে এর আগেও এসব হয়েছে। একেবারে হাওয়া হয়ে যাবার ছেলে তো নয়!”
মানালি বলল, “কোনওভাবে ওর বাড়ির লোকেদের খবর দেওয়া যায় না?”
বিতস্তা আঁতকে উঠল, “তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওর বাড়ির লোকেরা জানলে কী হবে ভাবতেও গায়ে জ্বর চলে আসছে আমার। বললে তো সবই বলতে হয়। তা ছাড়া আজ দুপুর বারোটার পরে যদি সৌরভ ওর আই কার্ড না নেয় হোটেল থেকে, তাহলে তো পুলিশ কেস হতে পারে। নির্ঘাত আমি ফাঁসব। তখন থেকে আমার মাথায় এইসবই ঘুরছে শুধু।”
মানালির গলা থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এল, “শিট!” বলল, “বিশ্বরূপদা ছাড়া গতি নেই।”
বিতস্তা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “হুঁ। বল।”
মানালি বলল, “তুই বলবি না আমি বলব?”
বিতস্তা বলল, “তুই-ই বল। আমি ছড়িয়ে ফেলব। এমনিতেই বিশ্বরূপদা আমায় বেশি দেখতে পারে না।”
মানালি বলল, “জানতাম তুই এটাই বলবি। ঠিক আছে। রাখ এখন। আমি বিশ্বরূপদাকে ফোন করি।”
ফোনটা কেটে মানালি বিশ্বরূপদাকে ফোন করল। বিশ্বরূপদা ধরল, “অফিসে এসে গেছি কোন সকালে। তুই কি আজও ডুব মারার প্ল্যান করছিস?”
মানালি বলল, “একটা ব্লান্ডার হয়ে গেছে। তোমার একটু হেল্প চাই।”
বিশ্বরূপদা বলল, “সে তো তুই মানেই ব্লান্ডার। মানালি আর ব্লান্ডার ওয়ার্ড দুটো সিনোনিম। বল শিগগিরি কী হয়েছে।”
মানালি সবটা বলল। বিশ্বরূপদা পুরোটা শুনে বলল, “বিতস্তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মিনিমাম বোধ বুদ্ধি কিছুই নেই? কী রে!”
মানালি বলল, “কী করে ঝামেলাটা থেকে বেরোবে সেটা আগে বলো তো!”
বিশ্বরূপদা বলল, “সেই! মরণকালে হরির নাম। ওকে, আমাকে ছেলের নাম, চেহারার ডেস্ক্রিপশন আর হোটেলের নামটা হোয়াটসঅ্যাপ কর। দেখছি কী করা যায়।”
ফোনটা কেটে গেল। বিতস্তা বিশ্বরূপদাকে সব কিছু পাঠিয়ে স্নানে ঢুকল। বেশ খানিকক্ষণ ঠান্ডা জলে স্নান করে অফিসের জন্য তৈরি হতে শুরু করল। মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল শুধু। সৌরভকে না পাওয়া গেলে কী কী হতে পারে। ফোনটা বেজে উঠল আবার। মানালি দেখল ধ্রুব বাগচী ফোন করছেন। ধরবে না ধরবে না করেও ধরল, “বলুন স্যার।”
“মানালি, আপনাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন করলাম।”
ওপাশের গলাটা শান্ত।
মানালি বলল, “হ্যাঁ, বলুন স্যার।”
ধ্রুব বললেন, “আমি এটা বলার জন্যই ফোন করেছিলাম, আজকের কোনও কাগজেই ধ্রুব বাগচী নেই। এর মানেটা বুঝলেন?”
মানালি কিছুই বুঝল না, “না স্যার, আমি তো ঠিক…!”
ধ্রুব বললেন, “বুঝবেন না। অত বুদ্ধি থাকলে সাংবাদিক হতেন না। এর মানে হল আপনার কালকের নিউজটা আজকে বাসি হয়ে গেছে। টয়লেট পেপার হয়ে গেছে। নতুন কাগজ এসে গেছে। পড়ে নিন।”
ফোনটা কেটে গেল। মানালি উঠে বাবার সামনে গিয়ে বসল। তিন চার রকম কাগজ রাখে তারা। অবাক হয়ে দেখল কোনও কাগজেই ধ্রুব সংক্রান্ত কোনও খবর নেই।
মানালি অবাক হল। ধ্রুব কি তার মানে তাঁর ক্ষমতা দেখালেন? খবরের কাগজগুলোকে ক্ষমতা বা অর্থবলে কিনে নিলেন? কয়েক সেকেন্ড ভেবেই তার বিতস্তার কথা মনে পড়ল।
মানালি বিশ্বরূপদাকে ফোন করল। বিশ্বরূপদা বলল, “কী হল আবার?”
