২৩শে নভেম্বর WSAG-এর বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ‘অসহযোগী ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকে। কাজেই কিসিঞ্জার তাঁর বিশ্ব ভূরাজনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর করার প্রথম ধাপ হিসাবে বেছে নেন জাতিসংঘে সদ্য নিযুক্ত চীনা প্রতিনিধি হুয়াং হুয়াকে এবং গোপনে নিউইয়র্কে যান হুয়াং হুয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। কিসিঞ্জারের নিজেরই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী তার এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল, পিকিংকে মার্কিনী উদ্যোগের খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে অবহিত রাখা, ‘সম্প্রসারণবাদ রোধকল্পে’ মার্কিনী সরকারের ‘সংকল্পের দৃঢ়তা’ ব্যাখ্যা করা এবং এক্ষেত্রে বিরাজমান ‘বাস্তব সম্ভাবনা’ সদ্ব্যবহারের অসুবিধাগুলি চিহ্নিত করা। তিনি হুয়াং হুয়াকে উপমহাদেশের বিরাজমান সামরিক পরিস্থিতির বর্ণনা দেন এবং মার্কিন সরকার পাকিস্তানের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে যে প্রস্তাব উত্থাপন করতে চান তার খসড়া দেখান। দুর্ভাগ্য পুনরায় কিসিঞ্জারের; হুয়াং হুয়া তাকে জানান চীন নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানকে সমর্থন করবে বটে, তবে বিষয়টি কবে নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যাওয়া হবে সে ব্যাপারে চীন বরং পাকিস্তানের পরামর্শ অনুসরণ করবে। কিন্তু পাকিস্তান গণহত্যা ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের জন্য সমালোচিত ও নিন্দিত হওয়ার আশঙ্কায় তখন অবধি নিরাপত্তা পরিষদ অধিবেশনের পক্ষপাতী ছিল না।
কাজেই ২৪শে নভেম্বর কিসিঞ্জার পুনরায় WSAG-এর দ্বারস্থ হন ভারতকে আক্রমণকারী হিসাবে প্রতিপন্ন করার জন্য। ইন্দিরা গান্ধী ঐ দিনই ভারতীয় পার্লামেন্টে ব্যাখ্যা করেন, কোন পরিস্থিতিতে ভারতীয় বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে চৌগাছার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। WSAG বৈঠকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি কিসিঞ্জারের অভিযোগকে অমীমাংসিত বলে গণ্য করেন এবং রাজনৈতিক আপোসের জন্য পাকিস্তানকে চাপ দেওয়ার পক্ষে পুনরায় অভিমত প্রকাশ করেন।
নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের পক্ষে কিসিঞ্জার যখন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে সম্মত করানোর চেষ্টায় লিপ্ত, প্রায় সে সময়েই-অর্থাৎ ৩রা ডিসেম্বরের সপ্তাহাধিক কাল আগে-ভারত সরকার গোপনসূত্রে অবগত হন যে, ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন উপকূলে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সপ্তম নৌবহরের গতিবিধির এখতিয়ার বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে। হঠাৎ বঙ্গোপসাগর অবধি মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতার এখতিয়ার সম্প্রসারিত হওয়ায় ভারত সরকারের সন্দেহের উদ্রেক ঘটে। কিন্তু এ সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে প্রশ্ন উত্থাপনের পরেও তাদের কাছ থেকে কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা লাভে ভারত সরকার অসমর্থ হন। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের এখতিয়ার বঙ্গোপসাগর অবধি সম্প্রসারিত করার পূর্বেই এর সম্ভাব্য তৎপরতার পরিকল্পনা যথারীতি সম্পন্ন হয়েছিল বলে অনুমান করা যুক্তিসঙ্গত। বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে যাত্রার জন্য সতর্ক অবস্থা জারী করা সত্ত্বেও সপ্তম নৌবহরকে। পূর্ব বাংলার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার পথে রাজনৈতিক বাধা নিক্সন প্রশাসনের জন্য তখনও প্রবল। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকার ক্রমবর্ধিত সংঘর্ষকে ‘নগ্ন ভারতীয় আক্রমণ’ হিসাবে প্রতিপন্ন করা এবং তজ্জন্য নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য শক্তিসমূহ ও চীনের সম্মিলিত নিন্দাজ্ঞাপন অত্যাবশ্যক ছিল। একমাত্র এই উপায়েই মার্কিন ও বিশ্ব জনমতকে পরিবর্তিত করা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব ছিল এবং তার আগে সামরিক হস্তক্ষেপ রাজনৈতিক দিক থেকে দুরূহ হত। নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ব্যাপারে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আপত্তি মার্কিন জনমতের তীব্রতাকেই প্রতিফলিত করে মাত্র। অবশ্য এই বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া নিক্সনের জন্য দুর্লংঘ্য অসুবিধার ছিল না। অসুবিধা ছিল অন্যত্র। ২৩শে নভেম্বর কিসিঞ্জার অবিলম্বে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ব্যাপারে সম্মত হওয়ার জন্য চীনকে যথাসাধ্য উৎসাহিত করার পরেও হুয়াং হুয়া অনুত্তেজিত থাকায় মার্কিন প্রশাসনের অবশিষ্ট ভরসার স্থল ছিল ব্রিটেন। কেননা ইন্দিরা গান্ধীর ফ্রান্স সফরকালে ফরাসী সরকারের সহানুভূতি ভারতের পক্ষে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হওয়ার পর নিরাপত্তা পরিষদে ফ্রান্সের সহযোগিতার উপর মার্কিন ভরসা ছিল নিতান্ত কম। সোভিয়েট সহযোগিতার কোন প্রশ্নই ছিল না। কাজেই নিরাপত্তা পরিষদের অবশিষ্ট ও পঞ্চম স্থায়ী সদস্য ব্রিটেনকে পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ব্যাপারে সম্মত করানো এতই জরুরী ছিল যে স্বয়ং নিক্সন ২৬শে নভেম্বরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী হীথ নিক্সন বর্ণিত পরিস্থিতির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়েও, প্রস্তাবিত উদ্যোগ থেকে ব্রিটেনের আলাদা থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেন। স্পষ্টতই পাকিস্তানের পাপের ভার তখন এতই পূর্ণ যে পাশ্চাত্য ত্রিশক্তিও এই প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। আমেরিকার শেষ ভরসার স্থল তখন পুনরায় চীন। ২৯শে নভেম্বর কিসিঞ্জার তাই পুনরায় চীনা নেতৃত্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেন; এবারে অবশ্য হুয়াং হুয়ার মাধ্যমে নয়, প্যারিসের অন্য আর এক মাধ্যমের সহায়তায়। এবারের অনুরোধের বিষয়বস্তু ও ফলাফল কিসিঞ্জার গোপন রাখেন।
