এমনিভাবে বয়রা চৌরাস্তা সীমান্ত সংঘর্ষের দিন থেকে সীমান্ত অঞ্চলে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালেও এই সব ঘটনাকে ভারতীয় আক্রমণের নিদর্শন হিসাবে খাড়া করে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আয়োজন করা এবং সেখানে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ ও চীনের সম্মিলিত ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য কিসিঞ্জারের সকল উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ফলে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে সপ্তম নৌবহরের যাত্রাও বিলম্বিত হতে থাকে। এদিকে ইয়াহিয়া ঘোষিত সময়সূচীর ‘দশ দিন’ নিঃশেষিত হতে থাকে। পূর্বাঞ্চলে ভারত বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর সীমান্ত চাপ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে, দেশের ভিতরে নিয়াজীর তথাকথিত মজবুত ঘাঁটি’ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা ক্রমশই পরিবৃত হয়ে পড়তে থাকে, দীর্ঘ আট মাসের একটানা অভিযানে বিশেষত মুক্তিবাহিনীর আঘাতে আঘাতে পরিশ্রান্ত পাকিস্তানী সেনাদের মনোবল দ্রুত ভাঙ্গনের দিকে এগুতে থাকে এবং শীত এগিয়ে আসার ফলে উত্তরের গিরিপথগুলি বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে। অথচ তখনও সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে পাকিস্তানের দুই মিত্রই অনড়, অচল। সপ্তম নৌবহরের নোঙ্গর তোলার কোন লক্ষণ নেই। এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মাঝে পাকিস্তান সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর হাতে ধীরে ধীরে নিশ্চিত পরাজয় বরণের পরিবর্তে তার নিজের মিত্রদ্বয়কে সক্রিয় করে তোলার জন্য ৩রা ডিসেম্বরে ভারতের পশ্চিম সীমান্তবর্তী বিমানবন্দরসমূহে (একমাত্র আগ্রাই অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী শহর ছিল) বিমান আক্রমণ চালায় এবং সেই রাত্রিতেই পূর্ব পাঞ্জাব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করে।
এই আক্রমণ শুরু করার আগের দিন পাকিস্তান পূর্বোল্লেখিত পাক-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রথম ধারা অনুযায়ী ‘আক্রান্ত দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ দাবী করে। প্রায় এক মাস আগে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত বেঞ্জামিন ওয়েলার্ট ১৯৫৯ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ দায়িত্বের কথা সর্বপ্রথম উদঘাটিত করার পর, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষে এই বিশেষ উদঘাটনের কারণ সম্ভবত ভালোভাবেই জানা ছিল; কাজেই তখন থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্ট একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এহেন দায়িত্বের কথা অস্বীকার করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের অস্বীকৃতি ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও কার ভরসায় পাকিস্তান ২রা ডিসেম্বরে এই চুক্তির প্রয়োগ দাবী করে পরদিনই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্প্রসারণে প্রবৃত্ত হয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ৩রা ডিসেম্বর WSAG-এর বৈঠকে কিসিঞ্জারের বক্তব্য থেকে। পাকিস্তান। পশ্চিম ভারতে বিমান আক্রমণ শুরু করার মাত্র ছ’ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ এই আক্রমণ সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধীর বেতার বক্তৃতারও আগে, এই বিষয় আলোচনার জন্য হোয়াইট হাউসে WSAG-এর বৈঠক শুরু হয়। এই বৈঠকে যথাশীঘ্র নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ছাড়াও ১৯৫৯ সালের পাক-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব অন্বেষণের ব্যাপারে যোগদানকারী সদস্যদের মধ্যে একমাত্র কিসিঞ্জারই ব্যগ্রতা প্রকাশ করেন। তখন থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের প্রচেষ্টা ছিল: (১) নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েট ভেটোর আশঙ্কা সত্ত্বেও উপমহাদেশে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য জাতিসংঘকে যতদূর সম্ভব ব্যবহার করা; এবং (২) ১৯৫৯ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির নব উদ্ভাবিত ব্যাখ্যার অধীনে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশের উপকূলভাগের উদ্দেশে সপ্তম নৌবহরের যাত্রা শুরু করা। একমাত্র প্রথম লক্ষ্য অর্জনের পরেই দ্বিতীয় ও মূল পদক্ষেপ গ্রহণ করা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে সম্ভব ছিল। এর পরেও সপ্তম নৌবহরের কার্যকর প্রয়োগ নির্ভরশীল ছিল দু’টি সামরিক শর্তের উপর, যার মধ্যে প্রথমটি ছিল অপরিহার্য: (১) পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তত ঢাকা ও উপকূলভাগে নিজ শক্তিতে পাকিস্তানী বাহিনীর কমপক্ষে তিন সপ্তাহকাল লড়াই করার ক্ষমতা; এবং (২) উত্তর সীমান্তে সীমিত আকারে হলেও চীনের যুগপৎ তৎপরতা।
মরিয়া হয়েই হোক এবং/অথবা মার্কিন হস্তক্ষেপ ত্বরান্বিত করার চিন্তাভাবনা থেকেই হোক, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে প্রবত্ত হওয়ার আগে পাকিস্তানও তার নিজস্ব সামরিক সামর্থ্য সম্পর্কে, তথা তার একক শক্তিতে অন্তত কিছু সময়ের প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করে রাখার মত ক্ষমতা সম্পর্কে, নিশ্চয়ই কিছু হিসেব-নিকেশ করে দেখেছিল। পাকিস্তানের সৈন্য সমাবেশের ধরন দৃষ্টে মনে হয়, পশ্চিমাঞ্চলে ভারতীয় জম্মু ও কাশ্মীরের একাংশ দখল করে নেওয়াই তাদের রণপরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল; পূর্বাঞ্চলে কোন ভূখণ্ড যদি হারাতে হয় তবে তা পুনরুদ্ধারের কাজে লাগানো সম্ভব মনে করেই। দ্বিতীয়ত, পূর্বাঞ্চলে সীমান্তের বিভিন্ন অংশে ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্য সমবেত হওয়ার খবর থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্ভবত এই আত্মবিশ্বাস ছিল যে নদীনালা পরিকীর্ণ ভূভাগ অতিক্রম করে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার মত পরিবহন ও ইঞ্জিনিয়ারিং উপকরণে ভারতের সীমাবদ্ধতাহেতু এবং তার বিরুদ্ধে সীমান্তের এপারের সুরক্ষিত ‘দুর্গ’ ও বাঙ্কার থেকে ভারতীয় সৈন্যের তুলনায় বহুগুণ শৌর্যের অধিকারী পাকিস্তানী জওয়ানদের’ মূলত প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সুবিধাহেতু ভারতীয় বাহিনীর অগ্রাভিযান বেশী গভীরে এগুনো সম্ভব নয়, বড় জোর কিছু এলাকা তারা দখল করে নিতে পারে। কিন্তু ৪ঠা ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে অধিকৃত এলাকার সর্বত্র একযোগে মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত সাধারণ মানুষ পাকিস্তানী অবস্থানের বিরুদ্ধে সমুখিত হয়। এর ফলে মুক্তি অভিযান যে অসামান্য গতিবেগ অর্জন করে, তা পাকিস্তানের আশঙ্কা ও ভারতের প্রত্যাশা উভয়কেই ছাড়িয়ে যায়। প্রচলিত যুদ্ধরীতিতে অভ্যস্ত পাকিস্তান যে সমস্ত যুক্তি থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বল্প কিছু ভূখণ্ডের বেশী হারাবার কথা কল্পনা করতে পারেনি, সেই একই প্রচলিত যুদ্ধরীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সমর পরিকল্পনাবিদগণের পক্ষেও ঢাকাকে মুক্ত করা নিশ্চিত সামরিক লক্ষ্য হিসাবে গণ্য করে ওঠা সম্ভব হয়নি। বৈপ্লবিক রাজনৈতিক উপাদান ও জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের ফলে মুক্তিযুদ্ধ যে অকল্পনীয় গতিময়তা ও শক্তি অর্জন করতে পারে, তা সম্ভবত পাকিস্তান বা ভারত কোন দেশেরই স্টাফ কলেজের পাঠ্য বিষয়ের অন্তর্গত ছিল না।
অধ্যায় ২১: ডিসেম্বর
৩রা ডিসেম্বর বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতার এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতাদানকালে ভারতের বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তানের বিমান-আক্রমণ শুরু হয়। অবিলম্বে তিনি দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। মন্ত্রিসভার জরুরী বৈঠকের পর মধ্যরাত্রির কিছু পরে বেতার বক্তৃতায় তিনি ঘোষণা করেন, এতদিন ধরে “বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।” ২৩শে নভেম্বর দশ দিনের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ইয়াহিয়ার যে বাসনা ব্যক্ত হয়েছিল এবং ঐ একই দিনে তাজউদ্দিন তার বেতার বক্তৃতায় ঘটনা-বিকাশের যদ্রুপ সম্ভাবনা উল্লেখ করেছিলেন, অবশেষে সেইভাবেই মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংকের শুরু হয়। ৪ঠা ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এক জরুরী লিপিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের সর্বশেষ আক্রমণের সমুচিত জবাব প্রদানে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মিলিত ভূমিকা সফলতর হতে পারে, যদি এই দুটি দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত ও বাংলাদেশ স্থলবাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত, ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও নৌবাহিনীর অবরোধের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধের চরিত্র ৪ঠা ডিসেম্বর থেকেই আমূল পরিবর্তিত হয়।
