প্রত্যেক যুদ্ধের যেমন পরিকল্পনা থাকে, প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তেমনি ২৫শে মার্চে পাকিস্তানের এই অঘোষিত যুদ্ধেরও পরিকল্পনা ছিল, প্রস্তুতি ছিল। এই প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয় ফেব্রুয়ারীরও আগে থেকে, যখন আকাশ পথে সৈন্য আনার কাজ শুরু হয়। এই প্রস্তুতির কথা আর যাদেরই অগোচরে থাকুক, মার্কিন সরকারের ছিল না। কিসিঞ্জার ১৬ই ফেব্রুয়ারীতে মার্কিন প্রশাসনের এক আন্তঃসংস্থা সমীক্ষা প্রণয়নের ব্যবস্থা করেন ‘পাছে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে। যে সময় কার্যত সমগ্র আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের বৈঠকে যোগদানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিল, ঠিক সে সময় কিসিঞ্জারের পক্ষে ‘পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হওয়ার চেষ্টা করতে পারে’ এহেন অনুমানে প্রবৃত্ত হওয়ার চেষ্টা বিশেষ তাৎপর্যময়। যে কোন সামরিক অভিযান পরিকল্পনার জন্য সত্যিকারের বিপদ যদি নাও থাকে, তবে কল্পিত বিপদ একটি দরকারই। পাকিস্তানী জান্তা পূর্ব বাংলায় সামরিক আক্রমণ চালানোর জন্য যে কল্পিত বিপদের আশ্রয় নেয় কিসিঞ্জারের পক্ষে সেই কল্পনাকে সত্যের মর্যাদায় উন্নীত করার এই অশোভন ব্যগ্রতার পিছনে একটিই মূল কারণ থাকতে পারত–মার্কিন প্রশাসন কেবল পাকিস্তানের সামরিক প্রস্তুতির খবরই রাখতেন না, অধিকন্তু এই আসন্ন অভিযানের পক্ষে তাদের অন্তত পরোক্ষ সমর্থন ছিল। এই কারণেই ৬ই মার্চে অর্থাৎ পাকিস্তানের গণহত্যা কার্যক্রম শুরু হওয়ার উনিশ দিন আগে হোয়াইট হাউসে সিনিয়র রিভিউ গ্রুপ (SRG)-এর বৈঠকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারী এলেক্সি জনসন যখন সকল কার্যকরণ বিশেষণ করে ‘পূর্ব পাকিস্তানে শক্তি প্রয়োগ থেকে ইয়াহিয়াকে নিরুৎসাহিত করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন, তখন কিসিঞ্জার ইয়াহিয়াকে সমর্থন করার পক্ষে পেসিডেন্ট নিক্সনের অভিপ্রায়ের কথা প্রকাশ করেন। ফলে SRG এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, পাকিস্তানী জান্তার আসন্ন আক্রমণ সম্পর্কে ‘প্রকাণ্ড নিষ্ক্রিয়তার’ (massive inaction) নীতি অনুসরণই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সর্বোত্তম পন্থা। মার্কিন প্রশাসনের অন্তত পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া পাকিস্তানী জান্তার পক্ষে এত বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু করা আদৌ সম্ভব হত কি না, তা অত্যন্ত সন্দেহজনক। অন্যান্য কারণ ছাড়াও সম্ভবত এই ‘নৈতিক দায়িত্ব’ বোধের কারণে পাকিস্তানের অমানুষিক বর্বরতার বিরুদ্ধে নিক্সন বা কিসিঞ্জারের পক্ষে পরবর্তী ন’ মাসে কোনরূপ নিন্দা, প্রতিবাদ বা সমালোচনা একবারও উচ্চারিত হয়নি।
সামরিক জান্তার ‘বাহাত্তর ঘণ্টার’ পরিকল্পিত সার্জারী যখন মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণহত্যা ও শরণার্থী স্রোত শুরু করে এবং আক্রান্ত, তাড়িত, পলায়নপর মানুষের মনে প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে, তখন থেকে মার্কিন প্রশাসনের তথাকথিত ‘প্রকাণ্ড নিষ্ক্রিয়তার’ নীতি ধাপে ধাপে কিভাবে পাকিস্তানের সাহায্যার্থে সক্রিয় ও সহযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা ইতিপূর্বে আলোচিত। এই সহযোগিতার চরম প্রকাশ ঘটে ২২শে নভেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে। ২৩শে নভেম্বরে ইয়াহিয়া খান চীনা মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দশ দিন বাদে স্বয়ং যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সময়সূচী ঘোষণা করেছিলেন। ইয়াহিয়ার ঘোষণার দশম দিনে সূর্যাস্তের কিছু আগে পাকিস্তানী জঙ্গীবিমান প্রধানত ভারতীয় জম্মু ও কাশ্মীরের আশেপাশে একযোগে সাতটি বিমানক্ষেত্র আক্রমণ করে এবং রাত্রিতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে। তার পরদিন পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনে সর্বাত্মক ভারতীয় প্রত্যাঘাতের মধ্য দিয়েই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের শুরু হয়। ফলে, বাংলাদেশের মানুষ ২৫শে মার্চকেই। পাকিস্তানের যুদ্ধারম্ভের দিন বলে গণ্য করলেও, বিশ্বের চোখে ৩রা ডিসেম্বরই পাক-ভারত যুদ্ধ আরম্ভের দিন। এর আগে মূলত পূর্ব বাংলার সীমান্তে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বাহিনীর মধ্যে যেসব সশস্ত্র সংঘর্ষ চলে আসছিল, তা সীমান্ত সংঘর্ষ হিসাবেই পরিগণিত। কিন্তু কিসিঞ্জারের রায় অনুযায়ী ২১-২২শে নভেম্বর বয়রা-চৌগাছা সীমান্তে উভয়পক্ষের ট্যাঙ্ক, বিমান ও গোলন্দাজ সংঘর্ষের দিনই যুদ্ধ শুরুর দিন।
তদনুযায়ী ২২শে নভেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সর্বক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যনির্বাহী উপসংস্থা ‘ওয়াশিংটন স্পেশাল এ্যাকশন গ্রুপ (WSAG)-এর বৈঠকে কিসিঞ্জার ‘যুদ্ধ আরম্ভের’ জন্য ভারতকে দোষারোপ করেন এবং অবিলম্বে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কিসিঞ্জারের দুর্ভাগ্য যে, মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্র দফতরই তার রায় এবং প্রস্তাবিত পদক্ষেপের সঙ্গে রাজী হতে পারেননি, বরং তারা আরও কিছু রাজনৈতিক দাবী-দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের উপর। চাপ প্রয়োগের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু পাকিস্তানী জান্তাকে তার হতদ্দশা থেকে উদ্ধার করার নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই হোক, এবং/অথবা তাদের দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক স্বার্থ যে কোন প্রকারে রক্ষা করার শক্তিদর্পী সিদ্ধান্ত থেকেই হোক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহকারী অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তার ফলে উপমহাদেশের সঙ্কট অচিরেই দুই বৃহৎ শক্তির বিশ্ব ভূরাজনৈতিক (global geopolitical) প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাতের অন্যতম প্রধান পাদপীঠে পরিণত হয়। ২২শে নভেম্বর নিক্সন ভারতকে সমরাস্ত্র সরবরাহ করার জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রতি সতর্কবাণী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বহুধাবিভক্ত করতে না পারার ব্যর্থতাজনিত জ্বালা, মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য প্রদান থেকে ভারতকে নিবৃত্ত করার অক্ষমতাজনিত ক্রোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতির মুখে পাকিস্তানের ভরাডুবির আশঙ্কা–এই সমস্ত কিছুর ফলে পুঞ্জীভূত মার্কিনী উত্তাপ অংশত নির্গত হয় সোভিয়েট নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। ফলে সূচনায় যা ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট, তা পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বলদর্পী বুদ্ধিভ্রংশতায় উপমহাদেশীয় সঙ্কটে পরিণত হয় এবং মার্কিন প্রশাসনের ন্যায়নীতি বিবর্জিত পৃষ্ঠপোষকতা ও ভ্রান্ত পরামর্শের ফলে এই সঙ্কটের জটিলতা ও পরিসর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মার্কিন প্রশাসনের চিরাচরিত বিশ্ব পাহারাদারীর মনোবৃত্তির প্রভাবে পাকিস্তানের আট মাস আগের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট বিশ্ব সংঘাতের রূপ ধারণ করে।
