ঘটনা-উত্তাল নভেম্বরে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে শহর-বন্দর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম, আর এই সংগ্রামেরই সাফল্যজনক পরিসমাপ্তির জন্য আসন্ন শীতে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর সংঘবদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি, এবং অন্যদিকে শীতের পূর্বেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করে বৃহৎ মিত্রদের হস্তক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক তদারকিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে অবলুপ্ত করার জন্য পাকিস্তানী সামরিক চক্রের প্রয়াস-এই দুই পরস্পরবিরোধী ঘটনাস্রোতের মাঝে বাংলাদেশের বিঘোষিত স্বাধীনতা যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, তা তাজউদ্দিন ২৩শে নভেম্বরের বেতার ভাষণে সুনির্দিষ্টভাবে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেন:
“মুক্তিবাহিনী এখন যে কোন সময়ে, যে কোন জায়গায় শত্রুকে আঘাত করতে পারে; এমনকি শত্রুর নিরাপদ অবস্থানের কেন্দ্রে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে তাকে বিমূঢ় করে দিতে পারে।… নদীপথে হানাদাররা বিপর্যস্ত, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় অকেজো, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত। ক্রমেই অধিক জায়গায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর প্রশাসন চালু হচ্ছে। আর সৈন্য সামগ্রী ও মনোবল হারিয়ে শত্রুপক্ষ ততই হতাশায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে।… এখন তারা চায় ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সঙ্কট সৃষ্টি করতে। তারা আশা করে যে, এমন একটা যুদ্ধ হলে, বাংলাদেশের রক্ষক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের থেকে পৃথিবীর দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ হবে, মুক্তিবাহিনীর হাতে তাদের পরাজয়ের গ্লানি গোপন করা যাবে এবং এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যাতে তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে। কিন্তু আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি যে, এর একটি উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে না।… সামরিক শাসকচক্র আত্মহত্যার যে ব্যবস্থাই করে থাকুক না কেন আর এই উপমহাদেশের জন্য যে ব্যবস্থাই বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রের মনঃপুত হোক না কেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা একটিই আর তা হল পূর্ণ স্বাধীনতা। ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রতিদিন প্রমাণিত হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সংকল্প এবং সে স্বাধীনতা রক্ষার শক্তি। দখলদার বাহিনীর বিনাশ অথবা সম্পূর্ণ অপসারণের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। ইতিহাস মানুষকে অন্তত এই শিক্ষা দিয়েছে যে, জনসাধারণের ইচ্ছাশক্তির পরাজয় নেই-এমনকি এক বিশ্ব শক্তির সমরসম্ভার দিয়েও জনগণের মুক্তিসংগ্রাম দমন করা যায় না।
“অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়ছি, সে স্বাধীনতা লাভের দিনটি নিকটতম হয়েছে। কিন্তু তার জন্যে আরো আত্মত্যাগ, কষ্ট স্বীকার ও জীবন দানের প্রয়োজন হবে। স্বাধীনতার ধারণা অশেষ অর্থগভ। স্বাধীনতার তাৎপর্য নির্ভর করে যুদ্ধ অবস্থায় আমরা কি মূল্য দিই এবং শান্তির সময়ে এর কি ব্যবহার করি তার উপর। শত্ৰু সংহারের প্রতিজ্ঞা সঙ্গে সঙ্গে তাই শহীদের রক্তের উপযুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিজ্ঞাও আমাদেরকে নতুন করে নিতে হবে। বাংলাদেশের শহরে ও গ্রামে তরুণেরা যে যুদ্ধে লিপ্ত তা বিদেশী দখলদারদের বিতাড়িত করার সংগ্রাম এবং অসাম্য ও সুবিধাভোগের অবসান ঘটানোর সংগ্রাম।…
“বাংলাদেশের জনসাধারণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজও পাকিস্তানের সামরিকচক্রের হাতে বন্দী হয়ে রয়েছেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তাকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে হানাদার সৈন্যদের নিষ্ক্রমণের সকল পথ রুদ্ধ করে দেওয়া। তা করবার শক্তি আমাদের আছে এবং আমরা তা-ই করতে যাচ্ছি ।”…
তাজউদ্দিনের এই বেতার ঘোষণায় কোন অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির আড়ম্বর ছিল না, ছিল কঠোর প্রস্তুতির শেষে আসন্ন ঘটনাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করার অটল আত্মবিশ্বাস।
অধ্যায় ২০: নভেম্বর – ডিসেম্বর
১৯৭১ সালে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় ২৫শে মার্চের মধ্যরাত্রিতে–পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র, অসহায়, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কোনরূপ সতর্কবাণী ছাড়াই, সম্পূর্ণ অতর্কিতে আক্রমণ করে। যুদ্ধই–কেননা আক্রমণ চলে ট্যাঙ্ক, কামান, মর্টার, মেশিনগান, রাইফেল, আরও নানা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে। আক্রমণ চলতে থাকে সমগ্র স্থলভূমিতে, বিমান থেকে, জলযান থেকে। যুদ্ধই–কেননা কেউই সে আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি–ছাত্রাবাসের ছাত্র, বস্তিবাসী শ্রমিক, পল্লীবাসী কৃষক, শিক্ষক, মধ্যবিত্ত, বেকার যুবক, নারী, শিশু অথবা বৃদ্ধ। কখনো কারফিউয়ের মাঝে পেট্রোলে আগুন লাগানো বস্তিবসত থেকে ভীতসন্ত্রস্ত, পলায়নপর মানুষের উপর মেশিনগানের আক্রমণ চালানো হয়েছে, কখনো হাঁটুজলে দাঁড় করিয়ে দড়িতে বাঁধা মানুষের সারি গুলি করে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে মৃতের সাথে মুমূর্মুকে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ রেখে; তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করা হয়েছে এ দেশের কৃতি পুরুষদের, বন্দী শিবিরে অমানুষিক নির্যাতনের পর তাদের ক্ষতবিক্ষত নিস্পন্দ দেহ গোপনে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে; নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অসংখ্য মানুষকে শান্তি কমিটির ঠিকাদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের প্রাণ সংহারের উদ্দেশ্যে, পথ থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যুবকদের সমস্ত রক্ত আর্মি ব্লাড ব্যাংকে সংগ্রহ করে নেবার পর তাদের প্রাণহীন দেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে খানাখন্দকে; বসতবাটি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া অসংখ্য নিষ্পাপ কিশোরী, স্নেহশীলা তরুণীমাতা, গৃহবধূদের পাশবিক ভোগের উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে মাসের পর মাস; প্রাণের ভয়ে প্রায় এক কোটির মত লোক দেশছাড়া হয়েছে; যারা দেশান্তরিত হতে পারেনি তারা ভয়ার্ত উদ্বেগে শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছে বিনিদ্র আর উৎকণ্ঠার নারকীয় যন্ত্রণার মাঝে দেশবাসীর মনে কোন শান্তি ছিল না, প্রাণের নিরাপত্তা ছিল না, সম্ভ্রম তো নয়ই। যদিও অঘোষিত, এত কিছুর পর একে যুদ্ধ ছাড়া আর কি নামে অভিহিত করা যায়?
