মধ্যরাত্রির পর ডি. পি. ধর যখন আমাকে বিদায় জ্ঞাপনের জন্য হোটেলের লিফটের দিকে এগিয়ে চলেন, তখন পরবর্তী বৈঠকের আলোচ্য বিষয় হিসাবে প্রথমবারের মত আমি উল্লেখ করি, আমাদের বিবেচনায়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের চূড়ান্ত পতন বন্ধ করার জন্য সপ্তম রণতরী বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে ঢাকার উপর বিমান-আচ্ছাদন বিস্তার এবং নৌসেনা অবতরণের চেষ্টা চালাতে পারে। ডি. পি. ধর পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কংগ্রেসের উভয় পরিষদ এবং সংবাদমাধ্যমসমূহের প্রবল সমালোচনার পটভূমিতে এহেন হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা ‘রাজনৈতিকভাবে খুবই দুরবর্তী’ বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু যে সহজ ও আপাতসিদ্ধ যুক্তি উল্লেখমাত্র তিনি তৎক্ষণাৎ ব্যক্ত আশঙ্কার বিশেষণে প্রবৃত্ত হন তা ছিল: দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে জোট-বহির্ভূত ভারতের প্রভাব ও শক্তিকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সতের বছর যাবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মুসলিম পাকিস্তানকে সবল করার জন্য সাহায্য করে এসেছে, সেখানে সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের মত ঔদ্ধত্য দেখাবার পর, সেই ভারত যদি বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসে উদ্যোগী হয়, তবে কেবল জনমতের ভয়েই কি যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার আঞ্চলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবে? জনমতই যদি মার্কিন প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্তের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হয়, তবে অনেক আগেই কি ভিয়েতনামে শান্তি ঘোষিত হওয়া সম্ভব ছিল না? এরপর এক ঘণ্টারও অধিক সময় ধরে এই হস্তক্ষেপ সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক, সমগ্র অভিযানের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব, পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ ও পরিসর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আমাদের দু’জনার মধ্যে আলোচনা চলে।
ডি. পি. ধরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরবর্তী তিনটি বৈঠকে বিভি বিষয়ের মধ্যে অস্ত্র পুনরুদ্ধার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে স্বাধীনতা সমর্থক পাঁচটি রাজনৈতিক দলের অভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ এবং জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিকে একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সম্ভাবনা সংক্রান্ত আলোচনা প্রাধান্য পায়। এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্র অধিকৃত প্রশাসনের সমস্ত বাঙালী অফিসার এবং সর্বস্তরের বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার এক পরিকল্পনা পাকিস্তানীদের রয়েছে বলে অক্টোবরে আমাদের ঢাকা গ্রুপ থেকে যে তথ্য এসে পৌঁছায়, তার তাৎপর্য এবং তা মোকাবিলার্থ বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতির বিষয় আলোচিত হয়। এই সব আলোচনা যখন চলছিল, তখন যশোর শহরের অদুরে চৌগাছায় একটি মুক্তিবাহিনী ইউনিটের অবস্থানের উপর ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ ইউনিটসহ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের ফলে সীমান্ত সংঘাত সহসা বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানী গোলার আঘাত ভারতীয় ভূখণ্ডে এসে পড়ায় যথাযোগ্য শক্তিতে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে এগিয়ে আসে। ভারত ও পাকিস্তানের উভয় পক্ষের পদাতিক ব্রিগেড, ট্যাঙ্ক, গোলন্দাজ ও বিমানবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আবহাওয়া নিকটতর হয়ে ওঠে।
একই সময়ে পরিকল্পনা সেল ও বিভাগীয় সচিবদের পর্যায়ে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর পুনর্বাসন, আইন ও শৃঙ্খলা প্রবর্তন, খাদ্য ও জরুরী পণ্য সরবরাহ, বাসস্থান, জনস্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে যে সব খসড়া পরিকল্পনা ও কার্যক্রম প্রণয়নের কাজ চলছিল, তাকে সমন্বিত করার জন্য ২২শে নভেম্বরে বাংলাদেশে মন্ত্রিসভার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং এই উদ্দেশ্যে সেক্রেটারীদের সমবায়ে এক সাবকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত করা হয়। দেশ মুক্ত হওয়ার পর বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রিসভা এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, অধিকৃত অঞ্চলে সরকারী অফিসার ও কর্মচারী যারা দৃশ্যত পাকিস্তানীদের সাথে সহযোগিতা করে চলেছেন, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই প্রাণের ভয়ে তা করতে বাধ্য হয়েছেন এবং প্রকৃতপক্ষে তারা স্বাধীনতাযুদ্ধের গোপন সমর্থক।
স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত অভিযান এবং বিশেষ করে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও কর্মসূচী প্রণয়নের এই প্রচেষ্টার মূল্যায়নকালে একটি কথা স্মরণ রাখা বোধ হয় বাঞ্ছনীয়। ২৬শে মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের দিন থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর তাদের আত্মসমর্পণের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলে নয় মাসেরও কম সময়। চীন, ভিয়েতনাম, আলজিরিয়া, সাইপ্রাসের বা এঙ্গোলার তুলনায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সমগ্র মেয়াদ ছিল সব চাইতে কম। মুক্তিসংগ্রামের নয় মাসের প্রথম অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয়দানের ফলে ভারতের জন্য যে বৈদেশিক আক্রমণের বিপদ দেখা দেয় তার বিরুদ্ধে ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার কাজে। আগস্টে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির মাধ্যমে ভারতের নিরাপত্তাবোধ উন্নত হওয়ার পরেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভারতীয় সহায়তার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য নিশ্চিতকরণ ব্যতীত শরণার্থী সমস্যার কোন প্রকৃত সমাধান যে একেবারেই নেই, ভারতের এই উপলব্ধির প্রতি সোভিয়েট ইউনিয়নের পরোক্ষ সম্মতি আদায় করতে আরো দু’মাস অতিবাহিত হয়। পাকিস্তানের সঙ্কটের একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সোভিয়েট প্রচেষ্টা নিঃশেষিত হওয়ার পর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের এক সম্ভাব্য সময়সূচী সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে প্রথম ইঙ্গিত দেন। ঐ সময় থেকে ৩রা ডিসেম্বরে পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার দিন পর্যন্ত মোট সময় পাওয়া যায় ছয় সপ্তাহের কম এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দিন পর্যন্ত আট সপ্তাহের কম। এই ছয় থেকে আট সপ্তাহের স্বল্প সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তুলনাহীন বর্বরতার ফলে সর্বাংশে ছিন্ন ভিন্ন এক সমাজকে একত্রিত করার জন্য, বিচ্ছিন্ন বিপর্যস্ত ও লুষ্ঠিত এক অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করার জন্য এবং এই দুই বিশাল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নতুন এক রাষ্ট্রের সংগঠনকে দাঁড় করানোর জন্য যে সুবিপুল প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল তা আয়ত্ত করা কোন উপায়েই সম্ভব ছিল না। সময় ছাড়াও অভাব ছিল সংগঠনের উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন, কর্মদক্ষ, নিষ্ঠাবান মানুষের। এই অর্থে নভেম্বর ছিল প্রয়োজন ও আয়োজনের মাঝে দুস্তর ব্যবধান উপলব্ধি করার মাস। এই ব্যবধান দুরতিক্রম্য জেনেও যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন স্বাধীনতার তীরভূমির দিকে পাড়ি জমাবার মাস।
