এই বৈঠক সম্পর্কে কিছু বর্ণনা আবশ্যক। পাকিস্তানের সঙ্গে নিকটভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠার পর দ্রুতগতিতে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী দখল থেকে মুক্ত করা সম্ভব–এই অনুমানের উপর নির্ভর করে বর্তমান ও সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশেষণ এবং এর মাধ্যমে মূল সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সেগুলি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কাজের পরিসীমা নির্ধারণই এই সব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে উচ্চতর রাজনৈতিক অনুমোদনের পর বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রোগ্রাম প্রণয়ন সম্ভব হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে ঐ সন্ধ্যায় যে আলোচনা হয়, তাতে দ্বিমতের অবকাশ ছিল না। প্রায় আট মাস ধরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের স্থানীয় অনুচরবৃন্দ বর্ণনাতীত হত্যা, নির্যাতন ও বিভীষিকার রাজত্ব চালিয়ে এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণবিহীন বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র তরুণের দল মরণপণ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ফলে গোটা সমাজ সর্বাংশে আলোড়িত হয়েছে। তারই উপর এক সর্বাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হতে চলেছে। এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক জীবনে যে অকল্পনীয় তোলপাড় অবধারিত, তা নিয়ন্ত্রণ করা যে কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই দুঃসাধ্য ব্যাপার। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র তরুণদের নিয়োগের ফলে পূর্ববর্তী ছমাস কার্যত এক ধরনের সমাজবিপ্লবের সূচনা ঘটে। শত্রুসেনা ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই সশস্ত্র তরুণদের ক্রমবর্ধিত তৎপরতা পুরাতন ব্যবস্থার সুবিধাভোগী শ্রেণীর দুর্গতির সৃষ্টি করা ছাড়াও পুরাতন সমাজের খোদ কাঠামোকেই আঘাত করতে শুরু করে। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তরুণ যোদ্ধাদের কোন নতুন সামাজিক মূল্যবোধে ও বিকল্প সমাজব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকারে উদ্বুদ্ধ করে তোলা, অথবা কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে তাদের সংহত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলা সম্ভব না হওয়ায় প্রত্যাসন্ন স্বাধীনতার পর সামাজিক পুনর্গঠনের ঐক্যবদ্ধ শক্তির পরিবর্তে বহুধা বিভক্ত সশস্ত্র গ্রুপ ও সামাজিক অরাজকতার শক্তির অভ্যুদয়ের আশঙ্কা ছিল অপেক্ষাকৃত প্রবল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রচারযন্ত্রের ব্যর্থতা স্বীকার্য কিন্তু তা আর তখন সংশোধনযোগ্য নয়। এই অবস্থায় প্রত্যাশিত স্বাধীনতাকে সম্ভাব্য সামাজিক অরাজকতা ও সশস্ত্র হানাহানির আবর্ত থেকে রক্ষা করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র ফেরত নেওয়ার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ সর্বাপেক্ষা জরুরী বিষয় বলে চিহ্নিত করা হয়। যেহেতু বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল ছিল, সেহেতু দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের যে অংশ সততা, সাহস ও কর্তব্যবোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তাদের সকলকে স্বাধীনতা সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলির মিলিত কমান্ডব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের সহায়তায় অস্ত্র পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা চালানো অপেক্ষাকৃত যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। পরবর্তী কয়েক দিন তাজউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনার ফলে এই চিন্তার আরও সম্প্রসারণ ঘটে এবং বহুদলীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে সকল মুক্তিযোদ্ধার সমবায়ে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে প্রয়োজনীয় স্ক্রীনিং-এর পর নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন গঠনমূলক প্রয়োজনে তাদের সদ্ব্যবহার করার পক্ষে এক পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরী হতে থাকে। তবে ১৯শে নভেম্বরের ঐ বৈঠকে বহুদলীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অস্ত্র পুনরুদ্ধারের কর্মসূচী কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি ও পরোক্ষ সহায়তার প্রশ্ন নির্দিষ্টভাবেই উত্থাপিত হয়।
ডি. পি. ধর পূর্ববর্তী তিন মাসে বাংলাদেশের সর্বস্তরের সর্বাধিক সংখ্যক প্রতিনিধির সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা চালানোর ফলে একটি বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী হন এবং দু’একবার তা তিনি আমার কাছে ব্যক্তও করেন: বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী সেখানে যত অল্প সময় অবস্থান করবে, মিত্র হিসাবে ভারতের অর্জিত সুনাম ততবেশী অক্ষুণ্ণ থাকবে। কাজেই ডি. পি. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আমার কাছে জানতে চান, সর্বাধিক কতদিন ভারতীয় সৈন্যকে বাংলাদেশে থাকতে হতে পারে বলে আমাদের ধারণা? এ প্রশ্নের উত্তর অংশত নির্ভরশীল ছিল, পলায়ন বা পরাজয় বরণের আগে পাকিস্তানী বাহিনী অধিকৃত প্রশাসন ও অবকাঠামোর কতখানি ধ্বংসসাধন করবে এবং অংশত পরাজয়ের পর পাকিস্তান তার হৃত উপনিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে কোন নতুন সামরিক উদ্যোগ গ্রহণ করবে কিনা তার উপর। পাকিস্তান যদি পরাজয় বরণের আগে কোন ‘পোড়ামাটির নীতি’ (scorched earth policy) অবলম্বনের সুযোগ না পায় এবং পরাজয়ের পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা হারায়, তবে আশা করা যায়, তিন-চার মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীকে ন্যূনতম কর্মদক্ষতার মানে উন্নীত করা সম্ভব; এরই পাশাপাশি সম্মিলিত রাজনৈতিক কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অস্ত্রশস্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য বহুলাংশেই অর্জন করা সম্ভব। আর যদি শেখ মুজিব তার বিরাট জনপ্রিয়তা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সক্ষম হন, এবং সরকারের দায়িত্ব তুলে নেবার পরেও জাতির ঐক্যবোধ এবং সম্মিলিত আস্থার প্রতীক বহুদলীয় কমান্ডকাঠামোকে কার্যকর রাখেন, তবে আরো আগে বা অধিকতর সাফল্যের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ততদিন পর্যন্ত ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি বাংলাদেশের সম্ভাব্য অরাজক পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য আমাদের বিবেচনায় অপরহার্য বলে আমি উল্লেখ করি।
